অবাক হবার ভান করছেন কেন! : সাইফুদ্দিন আহম্মেদ নান্নু

70

ওপেন মেসেজ

লিখাটি লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত মতামত।

অবাক হবার ভান করছেন কেন!

সাইফুদ্দিন আহম্মেদ নান্নু

“গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না”লেখা টি-শার্টের ছবিতে ফটোশপের হাত পরেছে।
এই শ্লোগানের সাথে জুড়ে দেয়া হচ্ছে, নতুন শব্দ-বাক্য। যাতে এই টি-শার্ট মুভমেন্টকে বিতর্কিত করা যায়,মানুষের সহমর্মীতাকে ক্ষোভে বদলে ফেলা যায়।

ফোটোশপের এই নোংরামী দেখে অনেকেই চমকে উঠছেন,ছিছি করছেন।
যারা চমকাচ্ছেন তারা কি ভুলে গেছেন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ের কথা।

সে সময় আমাদের জীবন বাঁচানোর দাবিতে পথে নামা শিশুদের হাতে হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড,পোস্টারেও এমন ফটোশপ আগ্রাসন চলেছিল। অশ্লীল গালি,ভাষা জুড়ে দেয়া হয়েছিল তাতে।
তখন অনেকই বলবার,উদাহরণ দিয়ে প্রমান করবার চেষ্টা করেছেন এগুলো শিশু,ছাত্র,ছাত্রীদের লেখা নয়, ফটোশপের কাজ।
আমি নিজেও চেষ্টা করেছি,তর্কও করেছি অনেকের সাথে। কেউ বুঝেছেন, কেউ বুঝতেই চাননি।
একই ঘটনা ঘটেছিল কোটাসংস্কার আন্দোলনের সময়ও।
যারা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় ফটোশপের জালিয়াতি ধরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন,তাদেরকে সইতে হয়েছে নানা বিড়ম্বনা। ।

অতএব,অবাক হবার ভান না করাই ভাল। এমনটা নতুন কিছু না। অতিতে ঘটেছে, এখন ঘটছে,ভবিষ্যতে আরও ঘটবে। আমাদের চরিত্রই এমন। প্রতিবাদের সাবজেক্ট পছন্দ না হলেই আমরা হামলে পরি,হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করি, শেয়ার,লাইক,কমেন্টের প্রতিযোগিতায় ঝাঁপিয়ে পরি।

চোখকান খোলা রেখে ফেসবুকের এমন ইস্যুভিত্তিক মুভমেন্টের ছবিগুলোর,ছবির ভাষাগুলোর প্রাসঙ্গিকতা,যৌক্তিকতা খুঁজবেন। সন্দেহ করবেন। চট করে বিশ্বাসের বৃত্তে ঢুকবেন না। সেটা করতে পারলে ফটোশপ না বুঝলেও টের পাবেন,সামথিং রং।
ফটোশপের অপকর্ম বোঝার কিছু সহজ,সাধারণ টেকনিক আছে,এই টেকনিক যারা বুঝেন তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।

দুদিন ধরে”গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না।” ইস্যুটিকে দেখছি। পক্ষে-বিপক্ষে নানা তর্ক,যুক্তি চলছে। এই প্রতিবাদ নারীর সঙ্গত অধিকার। বাস্তবতাজাত। তবে এটি লঘুতর প্রতিবাদ। লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি ফলহীন চেষ্টা মাত্র।
কারণ,
ধর্ষণ,নারী লঞ্ছনা,নারীর প্রতি অশোভন আচরণের সাথে বিচারহীনতা, প্রতিকারহীনতার একটা গভীর সম্পর্ক আছে। বিচারহীনতাই মূলত এসব অপরাধের উর্বর জমিন।

একজন নারীকে প্রতিকার পেতে অভিযোগ দায়ের থেকে শুরু করে বিচারের রায় পর্যন্ত অনেকগুলো ধাপ পেরুতে হয়। প্রতিটি ধাপেই বসে অাছে একেকটা অজগর। 
১। টাকার অজগর,
২। টাকা লোভী অজগর,
৩। রাজনৈতিক,সামাজিক,
পারিবারিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার অজগর।
৪। কট্টর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অজগর।
৫। উগ্র ধর্মান্ধতার অজগর।
৬। দুর্নীতিবাজ ও নৈতিকতাহীন পুলিশ,ডাক্তার,উকিল,বিচারক নামের অজগর।
৭। নিস্পৃহ,দলান্ধ,বুদ্ধিজীবি ও নারীনেতৃত্বের অজগর।

এই অজগরেরা সব অভিযোগ, প্রতিবিধান একটা একটা করে গিলে খায়। এই অজগরগুলিই হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌনহয়রানির,ধর্ষণের মত অপরাধের রক্ষক, পৃষ্ঠপোষক, উৎপাদক।

বাড়ি যদি মারতেই হয় এসব অজগরের মাথাতেই মারতে হবে। লেজ চুলকে কিচ্ছু হবে না।

এই ফেসবুকে অনেকবার লিখেছি। এই ঢাকা শহরে প্রায় ২ কোটি মানুষের বাস। তার অর্ধেক নারী। ১ কোটি নারী। এই ১ কোটির প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৫০ লক্ষ আবার শিক্ষিত নারী। যারা হয় কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করেছেন,নয়তো পড়ছেন।

বেশী না,এদের মধ্য থেকে মাত্র ১০ হাজার নারীও যদি রাস্তায় নেমে একটি নারী লাঞ্ছনা,একটি ধর্ষণ ঘটনার প্রতিবাদ করতো তাহলেই ম্যাজিক রেজাল্ট পাওয়া যেতো।
আজন্ম বদ চরিত্রের মানুষ এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের মনে অাতঙ্ক,ভয় ঢুকিয়ে দেয়া যেতো ।

এরা যদি একবার বুঝতে পারে,আমি যেই হই না কেন,ছাড় পাওয়া যাবে না,নারীরা ছাড়বে না। তাহলেই থামতো । ট্রেনে বাসে লঞ্চে নারীদের ত্যক্তকরার, যৌন হয়রানির শখ উড়ে যেতো এক ঝটকায়। কারণ এরা এই জগতের ছ্যাঁচরা খেলোয়াড়, শিক্ষানবিস। ধর্ষকরাও পা ফেলতো গুণে গুণে।

১০ হাজার কেন মাত্র ১ হাজার নারীর রাজপথের প্রতিবাদকে উপেক্ষা করার সাধ্য কারও নেই। এক কোটি নারীর শহরে ১ হাজার নারীও কি নেই যারা রাস্তায় নামতে পারেন! ঢাকা শহর নামুক,দেখবেন সারা দেশ জেগেছে।
এটিই একমাত্র পথ। নারী নিরাপত্তার সমাধান। অজগরের জন্য একমাত্র ঔষধ। আপাতত অার কোন ওষুধে কাজ হবে না।

“গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না ” টিশার্ট ক্যাম্পেইন চলুক, পাশাপাশি রাজনৈতিক পক্ষপাতকে লাথি মেরে অন্তত ১ হাজার নারীকে সংগঠিত করার টার্গেট নিন,যারা ফেসবুকের একটি পোস্ট দেখেই প্রতিবাদী হয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে দুসেকেণ্ড সময়ও নেবেন না।
এটাই আমাদের বাস্তবতায় আসল কাজ। আবার বলি আর কোন পথ আপাতত নেই।

“গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না,নারীদের গায়ে হাত দেবেন না। ”
আমার অঢেল পয়সা থাকলে কয়েক হাজার স্টিকার,ব্যানার বানিয়ে বাসে,ট্রেনে,মার্কেটে,স্টেশনে, মেলায় টাঙাতাম।  বেশী করে টাঙিয়ে দিতাম মিডিয়া হাউসের গেটে গেটে,সেঁটে দিতাম তাদের প্রতিটি দেয়ালে। বাদ পরতো না বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসাও।