গারো সম্পত্তি ও প্রথাগত আইন: মা কি ছেলেকে সম্পত্তি দান করতে পারে?

40

মিকরাক সোহেল ম্রং

কিছুদিন আগে এক ভাই আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, মা তার ছেলেকে সম্পত্তি দান বা উইল করতে পারে কিনা এবং করতে পারলে কিভাবে। তার জানতে চাওয়া থেকেই দান ও উইল সম্পর্কে জানার জন্য অধিকতর অনুসন্ধান করেছি। অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে যা পেয়েছি তা আজকে আলোচনা করব। তবে আজকে শুধু দান নিয়ে লিখছি।

সরি যাওয়ার আগে একটি বিষয়ে সামান্য আলোকাপাত করতে হবে। গারো প্রথাগত আইন অনুযায়ী একজন ছেলে কোন সম্পত্তির মালিক বা অধিকারী হতে পারে কিনা- এই বিষয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। প্লেফেয়ার তাঁর The Garos বইয়ে বলেন, কোন পুরুষ সম্পত্তির মালিক হতে পারবে না, যদি না সে নিজে অর্জন করে। অর্থাৎ, নিজের অর্জিত সম্পত্তির মালিক হতে পুরুষের বাধা নেই। ক্রয়ের মাধ্যমে বা অন্য কোন মাধ্যমে গারো ছেলে সম্পত্তির মালিক হতে পারে। ছেলেরা অর্জিত সম্পত্তি ছাড়াও পারিবারিক বা পিতা-মাতার সম্পত্তির মালিক বা অধিকারী হতে পারে। বাবা-মা তাদের অর্জিত সম্পত্তি তাদের ছেলে-মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারে। এই ক্ষেত্রে চ্রা বা মাহারীর কোন সম্মতির প্রয়োজন নেই। তবে ঐতিহ্যগত মাতৃসম্পত্তি বা মায়ের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি কোন ছেলে সন্তানকে দিতে হলে অবশ্যই মেয়ে সন্তান, চ্রা ও মাহারীর পরামর্শ ও সম্মতি নিয়ে দিতে হবে। অতএব, এটি পরিষ্কার যে, একজন ছেলে অবশ্যই সম্পত্তির মালিক হতে পারে। এখন দেখা যাক, ছেলে দানের মাধ্যমে মা’র কাছ থেকে সম্পত্তি প্রাপ্ত হতে পারে কিনা।

গারো প্রথায় তিন ধরনের দান এর প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। A.tot, জীবনস্বত্বে দান ও চিরস্থায়ী দান। ব্যক্তিগত ব্যয় নির্বাহের জন্য ছেলেকে মা কিছু ভূমি প্রদান করতে পারে। তবে ছেলের বিয়ের পরই সেই সম্পত্তি মায়ের কাছে চলে যাবে। এটিকে A.tot বলে। মা তার ছেলেকে জীবনস্বত্বে সম্পত্তি দান করতে পারে। অর্থাৎ, মা তার ছেলেকে মেয়ে সন্তান, চ্রা ও মাহারীর সম্মতি নিয়ে কিছু সম্পত্তি দান করতে পারে ছেলের জীবনস্বত্বের জন্য। জীবিত অবস্থায় ছেলে সেই সম্পত্তি ভোগ করতে পারে। তার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি আবার তার মায়ের কাছে চলে আসবে। এছাড়াও মা তার সম্পত্তি চিরস্থায়ীভাবে ছেলেকে দান করতে পারে। এই ক্ষেত্রে ছেলের মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি তার কাছে ফিরে আসবে না, সেই সম্পত্তি ছেলের স্ত্রী ও সন্তানরা প্রাপ্ত হবেন।

যদি পরিবারে কোন মেয়ে সন্তান বাবা-মা’র যত্ন না নেয়, তাহলে মেয়েরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হারাবে। এই অবস্থায় যদি পরিবারের ছেলে সন্তান মা-বাবার যত্ন নেয় এবং বাবা-মা’র মৃত্যুর সময় দাফন-কার্য সম্পাদন করে, তাহলে সেই ছেলে বাবা-মায়ের সম্পত্তি জীবনস্বত্বে ভোগ করতে পারে। চ্রা-মাহারী চাইলে কিছু সম্পত্তি তার জন্য চিরস্থায়ীভাবেও দিতে পারে। এই বিষয়ে একটি মামলায় ভারতীয় উচ্চ আদালত একটি রায় প্রদান করেছিলেন। একটি পরিবারে মেয়ে সন্তান ছিল না, ছেলে সন্তানই মা-বাবাকে দেখাশুনা করে। মা-বাবার মৃত্যুর পর ছেলেটি দাফন-কার্য সম্পাদন করে। পরবর্তীতে সেই মা-বাবার সম্পত্তির দাবি করে মায়ের আত্মীয়-স্বজন মামলা করে। উচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে, যে ব্যক্তি দাফন-কার্য সম্পাদন করেছে, মা-বাবার সম্পত্তির উপর তারই অগ্রাধিকার রয়েছে।

যদি কোন পরিবারে মেয়ে সন্তান না থাকে, নকনা রাখার জন্য যদি কাউকে না পাওয়া যায়, তাহলে চ্রা-মাহারীরা ছেলে সন্তানের উপর মা-বাবার সম্পত্তির দায়িত্ব অর্পণ করতে পারে।
অতএব, দেখা যায়, মা তার ছেলের জন্য সম্পত্তি দান করতে পারে। যদি মা-বাবার অর্জিত সম্পত্তি হয়, তাহলে চ্রা-মাহারীর সম্মতির প্রয়োজন নেই, ঐতিহ্যবাহী মাতৃসম্পত্তি হলে মেয়ে সন্তান, চ্রা-মাহারীর সম্মতির প্রয়োজন।

তিন ধরনের দানের প্রচলন থাকলেও চিরস্থায়ী দানকেই সাধারণভাবে প্রকৃত দান হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে দান করার সময় রাষ্ট্রীয় আইন-কানুনও মাথায় রাখতে হবে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ এর ১২৩ ধারা ও নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ এর ১৭ ধারার বিধান অনুযায়ী লিখিত ও নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান করতে হবে। অনিবন্ধিত ও অলিখিত উপায়ে দান করলে কারও স্বত্ব সৃষ্টি হবে না।

মিকরাক সোহেল ম্রং, সিনিয়র সহকারী জাজ, বাংলাদেশ

তথ্যসূত্র:
1. Garo Customary Laws Traditions and Practices
2. Customary Law and Justice in the Tribal Areas of Meghalaya by PM Bakshi and Kusum
3. The Garos by Playfair
4. The Garo Code of Law by G. Costa
5. জানিরা, ৭ম সংখ্যা, উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী, বিরিশিরি, দুর্গাপুর, নেত্রকোনা।
6. Principles of Garo Law by Adv. Jangsan Sangma
7. সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২
8. নিবন্ধন আইন, ১৯০৮