জীবনে পরম শান্তির জন্য যা প্রয়োজন : ব্রিগেডিয়ার নাসির উদ্দিন

51

# লেখাটি লিখেছেন : সাফওয়ান
#সম্পাদনায় -ব্রিগেডিয়ার নাসির

জীবন সরল রেখায় চলে না! কখনও সুন্দর আর আনন্দময়, আর কখনও কষ্টকর! আমাদের জীবনটাই য এমন! কেউ তো জানিনা আমার যতি চিহ্ন কোথায়… কী নিয়ে দুঃখ করবো আমি? আজ হয়ত আমি অনেক সুখী, যদি আজই চলে যেতে হয় এই জগত ছেড়ে, তবে আমি কি প্রস্তুত যাওয়ার জন্য?

আমি যতটুকু সুখে আছি, অনেকেই তো তার চাইতে খারাপ আছেন, তাইনা? জীবনটাই তো এমন! অনেক পাওয়া আর না পাওয়া দিয়ে ঘেরা… অনেক তৃপ্তি আর অতৃপ্তি মাখানো… তাকে তো আপন করে নিলে চলেনা! তাকে সাথে করে চলতে হতে হয়। এলোমেলো হয়ে গেলেও প্রস্তুত হতে হবে আখিরাতের জন্য… সেটাতে ভুলে গেলে চলবেই না! একটা কথা শুনেছিলাম :

★★★জীবনে যা ঘটেছে, তা ভালো হয়েছে। যা হচ্ছে, তা-ও ভালো হচ্ছে। আর ভবিষ্যতে যা ঘটবে, তা-ও ভালোই হবে।

★★★ছেলেবেলায় শোনা সেই গল্পের কথা মনে পড়ে গেলোঃ
এক লোক মসজিদ থেকে বের হয়ে দেখেন তার জুতো জোড়া হারিয়ে গেছে। ভীষণ মন খারাপ করে তিনি পথ চলতে শুরু করলেন খালি পায়ে।
কিছুদূর যাবার পর তিনি দেখলেন একজন ভিক্ষুককে যার দু’টো পা-ই নেই…
তখন তার নিজের জুতো হারাবার দুঃখ ঘুচে গেলো… আমার তো অন্ততঃ দু’টো পা অক্ষত আছে! এ গল্পের মোরাল সব সময় আপনার চেয়ে যে কষ্টে আছে তার দিকে দৃষ্টিপাত করুন।আপনি তখন স্রষ্টার অনুগ্রহ বুঝতে পারবেন।

★★★যা হারিয়ে গেছে আমার, তার চাইতে অনেক বেশি কিছু আমার কাছেই আছে। অনেকের কাছে সেটুকুও তো নেই! এটাই হয়ত আত্মিক শান্তি অর্জনের ভাবনা হওয়া উচিত। আর সেই শান্তির খোজেই তো আমরা ছুটে চলেছি জগতময়! যদি মনেই শান্তি পাওয়া যায়, তবে আর ক্ষতি কী?

আজ কিছু টিপস পেলাম ইন্টারনেটে, কীভাবে ভালো থাকা যায় সে বিষয়ে কিছু কথা, কীভাবে মনটাকে ভালো রাখা যাবে সে বিষয়ে কিছু কথা…

★নিজেকে কখনও অন্যের সাথে তুলনা করবেন না।

★নেতিবাচক চিন্তা ভাবনা থেকে বিরত থাকুন। সবকিছুকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহন করতে চেষ্টা করুন।

★নিজেকে নিয়ে এবং কাছের মানুষদেরকে নিয়ে অনর্থক বেশি দুঃচিন্তা করবেন না। মনে রাখবেন,অতিরিক্ত দুঃশ্চিন্তা কখনোই সমস্যার সমাধান করবেনা।

★নিছক আড্ডা ও অপ্রয়োজনীয় লোকদের সাথে মিশে সময়ের অপচয় করবেন না।

★শত্রুতা এবং অন্যের প্রতি বিদ্বেষ ভাব বজায় রাখবেন না। এতে কেবল দুঃশ্চিন্তা বাড়ে এবং মানসিক শান্তি নষ্ট হয়, যা আপনার স্বাস্থ্যে ও পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

★নিজের এবং অন্যের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিন।

★অতীতের শিক্ষাকে মনে রাখুন, ভুলকে ভুলে যান। অতীতের ভুল নিয়ে অতিরিক্ত ঘাটাঘাটি করে তিক্ততা বাড়িয়ে বর্তমানের সুন্দর সময়কে নষ্ট করবেন না।

★মনে রাখবেন, জীবনে কোন কিছুই অপরিহার্য নয়।সময়ের ও আপনার সামাজিক পজিশন এর সাথে সব কিছু বদলে যায়।আপনিই আপনার জীবনের অশান্তির জন্য দায়ী।

★সংসার, পরিবার, স্বজন,আত্মীয়, বাবা মা,বন্ধু, কর্মক্ষেত্র এ সম্পর্ক গুলো আপনি আত্মত্যাগ বেশি করলে আপনার সাথে সবাই সুসম্পর্ক রাখবে। মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর।কেউ তার কমফোর্ট জোন কে নষ্ট করে আপনাকে সাহায্য করবে না।তাই সব ক্ষেত্রে ব্যালেন্স করতে না পারলে শান্তি নষ্ট হবে।

★প্রচুর পরিমাণে হাসুন এবং সবসময় হাসিখুশী থাকার অভ্যাস করুন। সেই সাথে অন্যদেরকেও হাসিখুশী রাখতে চেষ্টা করুন।

★জীবনের সব ক্ষেত্রে জয় লাভ করা অসম্ভব। তাই হার মেনে নিতে প্রস্তুত থাকুন। এটাও আপনার একটা মানসিক বিজয়।

★অন্যের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা-সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করুন।এবং এটা যেন আর না ঘটে সে ব্যাপারে সাবধানী হবেন।

★অন্যেরা আপনাকে নিয়ে কি ভাববে তা নিয়ে চিন্তিত হবার কিছু নেই। নিজের কাজ করে যান আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

★সময়ের কাজ সময়ে করুন, কিছুতেই এখনকার কাজ পরে করার জন্যে ফেলে রাখবেন না।

★যেসব জিনিস চিত্তাকর্ষক ও আকর্ষণীয়, কিন্তু উপকারী নয়, তা থেকে দূরে থাকুন।

★সুসময় বা দুঃসময় যাই হোক না কেন, সবই বদলাবে, এটাই চিরন্তন নিয়ম, তাই কোনো কিছুতেই অতিরিক্ত উৎফুল্ল বা অতিরিক্ত দুঃখিত হবেন না।

অনেক তো শুনলাম… এবার শুধু একটা কথা বলতে চাই… মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে বলেছেনঃ

তোমরা ধৈর্য্য ও সালাতের সাহায্যে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে আছেন। (সূরা বাকারা: ১৫৩)

আর আরেকটা কথা বলেই শেষ করতে চাই আজকের মতন… এটাও পবিত্র কুরআন থেকে নেয়া। আমরা মানুষ। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ চেষ্টার পর আর কিছুই করার থাকেনা আমাদের… হৃদয়ে একটা শূণ্যতা সৃষ্টি হয় চাওয়া-পাওয়া নিয়ে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সেই জায়গায় কত সুন্দর করে তার অভিভাবকত্বের নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন!

… এতদ্দ্বারা যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন। (সূরা তালাক: ২)

এই স্বল্প সময়ের পৃথিবীতে যেন আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে বিদায় নিতে পারি সেই প্রার্থনা আমার সবার জন্য রইলো। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। সঠিক পথ তো সে-ই পায়, যে তার জন্য স্বপ্ন দেখে, চেষ্টা করে, হৃদয় যার লালায়িত থাকে মুক্তির প্রত্যাশায়।

ব্রিগেডিয়ার নাসির উদ্দিন স্যার আরো বলেন :

জীবনের মধ্যবয়সে এসে যে উপলব্ধিগুলো…

★★স্ত্রী, সন্তান, স্বজন কেউই আপনার অসুস্থতার বোঝা বহন করে না।আর্থিক সাহায্য মিলে না যদি আপনি নিঃস্ব হয়ে যান।সময় বা সান্নিধ্য মিলে না অসুস্থতার সময় দু একটি ব্যতিক্রম বাদে।এর জন্য দায়ী আমাদের শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধ।

★★নিজের সব দায়িত্ব নিজকেই বহন করতে হয়।ধর্মের বুনিয়াদ ও পারিবারিক সুশিক্ষা, নীতিবোধের শিক্ষা,বিনয়ী আচরণ, অসহায় মানুষের প্রতি মমত্ব বোধের শিক্ষা,অল্পে তুষ্টি,সততাএবং কষ্ট করে বড় হলে মানুষ সত্যিকার শিক্ষার আলো নিয়ে বড় হয়।

তরুণ প্রজন্ম ভেবে দেখবেঃ  

★যা আয় কর বিপদের দিনের জন্য কষ্ট করে হলেও সঞ্চয় কর।

★জীবনে কোন স্বার্থহীন সম্পর্ক নেই আমাদের মত মানুষ যারা।

★বিলাসিতায় টাকা খরচ করলে একদিন তুমি মুখাপেক্ষী হবে।খুব কম মানুষকে পাবে সাহায্যের জন্য।

★অন্যের কথায় সিদ্ধান্ত নিও না, আলোচনা করবে

★সক্ষম ব্যাক্তি কে ভিক্ষা দিবে না।

★বছরে একজন কে সাহায্য কর যাতে তার সমস্যার সমাধান হয়ে যায়,নির্ভরশীল করে রেখ না।

★ভাগ্য তাদেরকে সাহায্য করে যারা বুদ্ধিদীপ্ত পরিশ্রম করে।

★সুযোগ সন্ধনী হয়ো না।উদ্দেশ্যে নিয়ে কারো সাথে বন্ধুত্ব করবে না।

★তোমাকে যারা খারাপ রাস্তায় নিতে চায় তাদের সাথে মিশবে না।

★পরিবার কে যুক্তসংগত ভাবে লালন পালন করবে।যাতে ছোট রা বড়দের সাথে নীচু স্বরে কথা বলে এবং আদপ রক্ষা করে।

★বাবা মার দু ধরনের মানসিকতায় সন্তান রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এক্ষেত্রে অনুশাসন গুলো ছোট বেলা থেকে শিখাতে হবে।

★তুমি যাদের (সন্তান,ভাই বোন,ভাগীনা ভাগ্নী,ভাতিজা ও অন্যান্যকে ভাল রাখার জন্য সব কষ্ট মুখ বুঝে সহ্য করবে তারাই তোমাকে সাবালক হয়ে বলবে তুমি কিছুই কর নি।এটা হয় তখনই যখন বাবা মার সম্পর্কে আস্থা ও বিশ্বাস এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা বোধের অভাব থাকে।

★নীতিহীন জীবন প্রচন্ড কষ্টের কারণ হয়।

★শিক্ষিত হওয়া আর ডিগ্রি অর্জন করা এক নয়।

★মানুষের প্রতি বিনয়ী ও দয়াদ্র হও।তুমি আজ যে অবস্থানে তা সৃষ্টিকর্তার দয়া।ঐ মানুষ টিও তোমার অবস্থানে থাকতে পারত, আল্লাহ চাইলে।

★ধৈর্যশীল হওয়া কষ্টের কিন্তু এটা শান্তি পূর্ন জীবনের জন্য অপরিহার্য।

★রাগ কে নিয়নন্ত্রন করতে শিখবে।

★দীর্ঘ দিন যারা রোগে ভূগে তাদের কে অন্য দশজন স্বাভাবিক মানুষের মত মনে করবে না।তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে।

★পরকালের কথা মনে রেখে পৃথিবীতে সব কাজ কর।

জীবন সুখী হবার উপায় :

★আপনাকে স্রস্টা একটা উদ্দেশ্যে নিয়ে সৃষ্টি করেছেন।প্রথমতঃ তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা।দ্বিতীয় মানবতার কল্যানে নিজকে নিয়োজিত করা।

★ জীবনের লক্ষ্য হতে হবে সুখী হওয়ার জন্য চেষ্টা করা। এটা পাওয়া সম্ভব তখনই যখন অল্পতে তুষ্ট থাকা শিখবেন এবং,যশ, খ্যাতির, ক্ষমতার লোভী হবেন না। এটা করা সম্ভব ছোট বেলা থেকে সকল সুন্দর অনুশাসন মেনে চললে ও কষ্ট করতে শিখলে।

★ প্রত্যাশার আর এক নাম, নির্ভরতা, স্বীকৃতি চাওয়া বা বিনিময় চাওয়া। এটা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

★ কারো সাথে নিজকে তুলনা করতে যাবেন না। কৃতজ্ঞ থাকুন আল্লাহর প্রতি। ধৈর্য্য ধরা কঠিন কিন্তু এর বিকল্প নেই।

★ পৃথিবীর কোন প্রাপ্তি বা সম্পর্ক অপরিহার্য নয়। বাবা মার স্নেহ বিহীন মানুষ পৃথিবীর বোঝা হয় নি।
★ বিয়ে না করে অনেক মানুষ জীবন পার করছে।
★ নিঃসন্তান অনেক দম্পতি আছেন।

★অন্ধ অনেক মানুষ সাচ্ছন্দ্য নিয়ে বেঁচে থাকেন।

★★একটা সুস্থ শরীর অনেক বড় সম্পদ।

★★ মানুষের চিন্তার ধরনের জন্য মানুষ অসুখী হয়।

★★এটিটিউড খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা পেতেই হবে এ মনোভাব ক্ষতিকর।

★★ভাল চিন্তার অভ্যাস করতে হবে। শেষ কথা।নিজের জীবনের সহজ স্বীকারোক্তি।

★★মানুষ মাত্রই পাপী। ঐ পাপী মানুষ ভাল যিনি অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসেন আলোর পথে।

★★আমার আপনার সবার আয়ে হারাম ঢুকে গেছে। অফিসে বসে যতক্ষণ নিজের ব্যক্তিগত কাজ করলেন তার আয় হারাম । আমরা দূর্বল নৈতিকতার কারনে এবং আমাদের সংগী নির্বাচনে ভুল করি বলেই আমরা হারাম উপার্জন করি। এ দায় আমার আপনার নিজস্ব।স্ত্রী, সন্তান মা,বাবা এর দায় নিবে না পরকালে।

★★আমি যখন ক্যাপ্টেন ছিলাম অনেক ভাল মানুষ ছিলাম।এখন অনেক খারাপ হয়ে গেছি।অনেক কমপ্রোমাইজ করে চাকুরী করি ;নিজের দূর্বল ইমানের কারনে।

★★এরকম হওয়ার কারন আমি আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারিনি জাগতিক জিনিসের পিছনে ছুটছি বলেই।

★★সুতরাং নির্দিধায় স্বীকার করি আমি অনেক পাপী একজন মানুষ।সাধারণ একজন মানুষ। সৎ মানুষ নই।আপনাদের ধারণা আমার সমপর্কে সঠিক নয়।

★★আমি ফিরে আসতে চেষ্টা করছি সত্য ও আলোর পথে।সবার দোয়া প্রার্থী।