ডিজিটাল যুগে চাই জ্ঞানকর্মী : মোস্তাফা জব্বার

74

ডিজিটাল যুগে চাই জ্ঞানকর্মী

মোস্তাফা জব্বার

এটি এখন বহুল আলোচিত বিষয় যে, সামনের যুগটার নাম ডিজিটাল যুগ। অন্যদিকে একেবারে ন্যূনতম স্তরে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সব কটি দেশকে সামগ্রিকভাবে ডিজিটাল রূপান্তর করতে হবে। খুব সঙ্গত কারণেই এ যুগে প্রচলিত অর্থনীতিকে ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হবে। কেউ কেউ নতুন অর্থনীতিকে ডিজিটাল অর্থনীতি, সৃজনশীল অর্থনীতি, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ইত্যাদি নামেও অভিহিত করেন।

ডিজিটাল বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব ৪.০, সোসাইটি ৫.০ ইত্যাদি যে নামেই ডাকি না কেন, এসডিজি, ডব্লিওইএফ বা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম যাই বলুক, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দুনিয়াকে ঘোষণা দিয়ে সবার আগে জানিয়ে দিয়েছেন যে বিশ্ববাসীর জন্য ডিজিটাল রূপান্তর অনিবার্য। যেভাবেই ভাবুন, বিশ্বের সব দেশের আগে আমাদের পথচলা শুরু হয়েছে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ডিজিটাল ব্রিটেন ও ২০১৪ সালের আগস্টে ভারত ডিজিটাল শব্দটি তাদের দেশের নামের সঙ্গে যুক্ত করে।

ইউরোপে ডিজিটাল ধারণার বিকাশ ঘটে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ১২ সালের সম্মেলনে। তারাই ডিজিটাল বিপ্লবকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হিসেবে শনাক্ত করে। এখন সারা দুনিয়াই ডাভোসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নাম মন্ত্র জপার মতো জপ করছে। একই কারণে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের নির্বাহি সভাপতি কার্লস সোয়াবের নাম সবাই জানে। কেউ মনে রাখেনি বলেই আমি উল্লেখ করতে চাই যে, ৮০ সালে প্রকাশিত এলভিন টফলারের বই দ্য থার্ড ওয়েবই প্রথম বিশ্ব সভ্যতার নতুন ধারাটিকে শনাক্ত করে। এমনকি ২০০৩ সালে জেনেভায় ডব্লিওএসআইসিসের ঘোষণায় বিশ্বকে একটি তথ্য সমাজ বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তরের স্বপ্নও দেখা যায়।

আমি খুব স্পষ্ট করে একটি বিষয় মনে করি যে বস্তুত ডিজিটাল বিপ্লব, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা আর যাই কিছু হোক মূল পরিবর্তনটা হচ্ছে কায়িক শ্রমভিত্তিক দুনিয়া মেধাভিত্তিক দুনিয়াতে পরিণত হবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের সন্তানদের জন্য এজন্যই ভেবে দেখতে হবে যে নতুন পৃথিবীর পেশাজীবী হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে নিজেকে কায়িক শ্রমিক থেকে জ্ঞানকর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের জন্য এটি অন্য যে কোন দেশের চাইতে এ রূপান্তরটি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। একবাক্যে এটি আমাদের মানতেই হবে যে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় শিল্প বিপ্লব মিস করে এবং প্রথম শিল্প বিপ্লবে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় বসবাস করে কায়িক শ্রমিক থেকে জ্ঞানকর্মীতে পরিণত হওয়া কঠিনতম চ্যালেঞ্জ।

২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি সরকার গঠন করে শেখ হাসিনা দেশটির ডিজিটাল রূপান্তরে সরকারিভাবে কাজ করা শুরু করেন। এবার আমরা তার এক দশক পার করে দ্বিতীয় দশকে পা ফেলেছি এবং আমাদের নেত্রী আরও অন্তত প্রায় পাঁচ বছর এ বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছেন। ফলে খুব সঙ্গত কারণেই আমরা ডিজিটাল বাঙলাদেশের রূপায়নের পরিধিটা অন্তত ১৫ বছর গণ্য করতেই পারি। আমি এটিও আশা করি যে ক্রমবাহিক ১৫ বছরের ডিজিটাল রূপান্তরের প্রচেষ্টার পর আমাদের পায়ের পাতা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দেবার ক্ষমতা কারও থাকবে না। ৭৫ সালে জাতির পিতাকে হত্যা করে ২১ বছর বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা হয়েছিল সেই চেষ্টার পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশে আর হবার নয়।

২০০৮ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার পর আমরা শুধু আমাদের নিজেদের দেশটাকেই ডিজিটাল করছি না বরং আমাদের পথ ধরে সারা বিশ্ব বহমান সভ্যতাকেই ডিজিটাল করার চেষ্টা করছে এবং সারা বিশ্ব ডিজিটাল বিশ্বে রূপান্তরিত হয়েই চলেছে। বিশ্বজুড়ে এখন এ বিষয়টি সর্বোচ্চ আলোচ্য বিষয় হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামেও ডিজিটাল অর্থনীতি আলোচিত হয়েছে। ওরা এখন অনুভব করছে যে দুনিয়া চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে হাঁটছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই বিপ্লবের হাতিয়ার এবং সারা দুনিয়াতেই ডিজিটাল অর্থনীতি এখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে।

আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতি বলতে কি বোঝায় এটি আগে পরিষ্কার করে বুঝতে হবে। এ বিষয়ে অনেকেরই ভুল ধারণা আছে। ডিজিটাল অর্থনীতি যদি বোঝায় বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাইজড হয়ে গেছে; তফসিলি ব্যাংকগুলো ডিজিটাইজড সেবা দিচ্ছে; মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ মানুষের কাছে টাকা পৌঁছে যাচ্ছে; এটিএম ব্যবহার করে টাকা তোলা যাচ্ছে; অনলাইন ব্যাংকিং চালু হয়েছে, ডিজিটাল কমার্স ব্যাপকভাবে প্রসারিত হচ্ছে; এমন সব ধরনের কার্যক্রম, তাহলে হতাশ হওয়া ছাড়া বলার কিছু নেই। এগুলো হচ্ছে ডিজিটাল অর্থনীতির এক ধরনের প্রদর্শন প্রভাব। বরং এগুলোকে ডিজিটাল অর্থনীতির মুখোশ বলা যাবে। ডিজিটাল অর্থনীতি বুঝতে হলে আমাদের অর্থনীতির রূপান্তর সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। একসময় আমাদের এ পৃথিবীর সব দেশই ছিল কৃষিভিত্তিক। তারপর কৃষিভিত্তিক সমাজ ভেঙে হলো শিল্পভিত্তিক সমাজ। শিল্পভিত্তিক সমাজ থেকে সেবা ও তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ হলো।

সমাজ বিকাশের ধারায় উৎপাদনশীলতা হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। উৎপাদনশীলতার কারণে সমাজ ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন এসেছে। প্রথমে যন্ত্র, তারপরে বিদ্যুৎ এবং তারও পরে ইন্টারনেট উৎপাদন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেছে। এরপর উৎপাদন ব্যবস্থায় আসছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। ডিজিটাল অর্থনীতি হচ্ছে মেধাভিত্তিক উৎপাদনশীল একটি অর্থনীতি যার ভিত্তি হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। কৃষি, শিল্প-বাণিজ্য, সেবা খাতকে বাদ দিয়ে কাগজে কলমে ডিজিটাল প্রযুক্তিভিত্তিক সমাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নাম ডিজিটাল অর্থনীতি নয়। ডিজিটাল অর্থনীতি হচ্ছে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে গড়ে তোলা মেধাভিত্তিক সৃজনশীল উৎপাদনমুখী অর্থনীতি। কেউ কেউ একে খুব সহজে সৃজনশীল অর্থনীতিও বলেন।

ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে আমাদের প্রথমে মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ পেতে হবে যারা প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল টুলস বা প্রযুক্তি বা উপকরণ ব্যবহার করে অতীতের সব সময়ের চাইতে বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারে। একটি গাড়ি তৈরি করতে প্রয়োজন হয় লোহার। লোহার দাম সারা বিশ্বে প্রায় একই। এই লোহা দিয়ে টয়োটা, মার্সিডিজ, লেক্সাস ব্র্যান্ডের গাড়ি তৈরির সময় প্রযুক্তিগত জ্ঞান লোহার মূল্য সংযোজন বহুগুণ বৃদ্ধি করে। এটাই হচ্ছে মেধাবী মানবসম্পদের তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের একটি দৃষ্টান্ত। এসব গাড়িতে ব্যবহৃত লোহার মূল্যের সঙ্গে যদি মেধার মূল্য সংযোজন তুলনা করেন তাহলে মেধার মূল্য অনুভব করতে পারবেন। এটি যদি এমন হয় যে কোন একটি সফটওয়্যার যাতে কোন বস্তুগত কাঁচামালেরই প্রয়োজন হলো না কিন্তু সেটির মূল্য সংযোজন বহুগুণ বেশি হলো বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বিগ ডাটা, আইওটি ইত্যাদি ব্যবহার করে পণ্যের উৎপাদন বা মূল্য সংযোজন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হলো তবে সেটি তৃতীয় শিল্প যুগের ছকটা অতিক্রম করে গেল।

যে দেশে মেধাবী মানবসম্পদ রয়েছে তারাই অর্থনীতিকে এখন ডিজিটাল করতে সক্ষম হচ্ছে। আমাদের অর্থনীতিতে একসময় কৃষির অবদান ছিল ৮০ শতাংশ। অথচ তখন ছিল খাদ্য ঘাটতির দেশ। এখন আমাদের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান নেমে হয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশে। তারপরও বাংলাদেশ এখন খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। এই যে মেধা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে এটাই হচ্ছে ডিজিটাল অর্থনীতির প্রাথমিক রূপ। এরপর আমরা কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, আইওটি ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহার করবো এবং কৃষি অর্থনীতিকেই একটি নতুন মাত্রায় উন্নীত করব। আবার উৎপাদিত কৃষিপণ্য সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য মেধা ও প্রযুক্তির ব্যবহারই হচ্ছে ডিজিটাল অর্থনীতি। উৎপাদনশীলতাকে বাদ দিয়ে ডিজিটাল অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আধুনিক বিশ্বে মেধাভিত্তিক সম্পদ যাদের বেশি রয়েছে তারা কিন্তু কৃষি, শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবা খাতসহ সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে রয়েছে। যার কারণে অনেক শিল্পোন্নত দেশের কৃষি উৎপাদন কৃষিভিত্তিক দেশের তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। আমেরিকার অর্থনীতিতে ৩৭ ভাগ অবদান রাখছে মেধাভিত্তিক সম্পদ। চীন, ভারত এখন মেধাভিত্তিক সম্পদ গড়ে তোলার জন্য জাতীয পর্যায়ে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমান বিশ্বের অর্থনীতিতে বস্তুগত সম্পদের চেয়ে মেধাসম্পদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের অর্থনীতির প্রতিটি খাতের জন্য মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই ডিজিটাল অর্থনীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তবে এটা ঠিক আমাদের অর্থনীতি সময়ের প্রয়োজনে ক্রমেই ডিজিটাইজেশনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। নিবন্ধটির এই অংশটি শেষ করার আগে জ্ঞানকর্মীর সংজ্ঞাটা উইকপিডিয়া থেকে একটু তুলে ধরতে চাই।

Knowledge work can be differentiated from other forms of work by its emphasis on “non-routine” problem solving that requires a combination of convergent and divergent thinking.[2] But despite the amount of research and literature on knowledge work, there is no succinct definition of the term.[3]

Mosco and McKercher (2007) outline various viewpoints on the matter. They first point to the most narrow and defined definition of knowledge work, such as Florida’s view of it as specifically, “the direct manipulation of symbols to create an original knowledge product, or to add obvious value to an existing one”, which limits the definition of knowledge work to mainly creative work. They then contrast this view of knowledge work with the notably broader view which includes the handling and distribution of information, arguing that workers who play a role in the handling and distribution of information add real value to the field, despite not necessarily contributing a creative element. Thirdly, one might consider a definition of knowledge work which includes, “all workers involved in the chain of producing and distributing knowledge products”, which allows for a very broad and inclusive categorization of knowledge workers. It should thus be acknowledged that the term “knowledge worker” can be quite broad in its meaning, and is not always definitive in who it refers to.[4]

An architect is an example of a typical “knowledge worker”

Knowledge workers spend 38% of their time searching for information.[5][dubious – discuss] They are also often displaced from their bosses, working in various departments and time zones or from remote sites such as home offices and airport lounges.[6] As businesses increase their dependence on information technology, the number of fields in which knowledge workers must operate has expanded dramatically.[citation needed]

Even though they sometimes are called “gold collars”, [7] because of their high salaries, as well as because of their relative independence in controlling the process of their own work, [8] current research shows that they are also more prone to burnout, and very close normative control from organizations they work for, unlike regular workers.[9] (https://en.wikipedia.org/wiki/Knowledge_worker)

জ্ঞানকর্মীর এই সংজ্ঞাটিকে ভিত্তি করে আমাদের প্রয়োজন হবে বিশ্ব প্রেক্ষিত বিবেচনা করে জ্ঞানকর্মী গড়ে তোলার জন্য আমাদের কি করণীয় রয়েছে। বাংলাদেশ যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার ১০ বছর পার করেছি তখন জ্ঞানকর্মী গড়ে তোলার বিষয়টি বিস্তারিত না জেনে পারি না।

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কিবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক] mustafajabbar@gmail.com,

ওয়েবপেজ: www.bijoyekushe.net, www.bijoydigital.com