ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী: দায় ও দায়িত্ব ?

122
ভালোবাসা, স্মৃতি ও দায়িত্বের কারণে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সাবেক ছাত্র ভুটানের প্রধানমন্ত্রী গতকাল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এসেছিলেন। দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহপাঠীদের সাথে আড্ডাসহ শিক্ষা জীবনের স্মৃতিকথা ও একজন ডাক্তারের দায়িত্ব সম্পর্কে বিবৃতি দেন।
 
ফেসবুকে বা ইন্টারনেটে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর কিছু ছবি ও ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেলেও ময়মনসিংহ মেডিকলে কলেজ কতৃপক্ষের পক্ষের কাছে কোন ছবি নেই।
 
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে আগমন উপলক্ষে পত্রিকায় প্রতিবেদনের নিমিত্তে কয়েকটি ভালো ছবির জন্য কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়ের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে, তিনি জানান, ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষ্যে কলেজের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের গুরুত্বপুর্ণ ছবি -ফুটেজ বা ডকুমেন্টেসন সংগ্রহের কোন উদ্যোগ নেয়া হয় নি। আগতরা যে, যেমনভাবে পেরেছেন তেমনভাবে তারা সংগ্রহ করেছেন।
 
বিদেশের একজন প্রধানমন্ত্রী যখন দেশের কোন প্রতিষ্ঠান সফর করেন, অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তাঁর সমুদয় ডকুমেন্টেসন খুব গুরুত্বের সাথে সংগ্রহ করা অবশ্যই কর্তব্য বলে মনে করেন সংবাদ ও মিডিয়া বিশেষজ্ঞরা। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর আগমন ও সংবর্ধণা অনুষ্ঠানের ডকুমেন্টেসন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার দায় ও দায়িত্ব আসলে কার ?
 
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ত্রান ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ সচিব জি. এম সালেহ উদ্দিনসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন। এ সময় ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডা. টান্ডি দরজি, স্বাস্থ্য মন্ত্রী লায়োনপু দিহেন ওয়াংমু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সহর্ধমিনী ডা. উগেন ডেমা, জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, পুলিশ সুপার শাহ আবিদ হোসেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. লক্ষ্মী নারায়ন মজুমদার, ময়মনসিংহ বিএমএ সভাপতি ডা. মতিউর রহমান ভুইয়াসহ সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসন ও বিভিন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন ।
 
সংবর্ধনা শেষে কলেজ অডিটরিয়ামে ২৮তম ব্যাচের ছাত্র/ছাত্রীদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং অন্তরঙ্গ আড্ডায় বসে একে অপরের সাথে কুশলাদি বিনিময় করেন।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্ততায় বলেন, ভালো চিকিৎসক হতে হলে প্রথমে ভালো মানুষ হতে হবে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত আমি ও আমার সহপাঠী ভুটানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. টান্ডি দরজি ময়মনসিংহ শহরের বাঘমারা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের ২০ নম্বর কক্ষে থেকেছি’ সাবেক এই শিক্ষার্থী বলেন, এ থেকে শিক্ষাটা হলো: আমরা যদি শিখতে চাই সেটা পড়িয়ে নয়, আলোচনা করতে হবে। শেখার সেরা উপায় হলো আলোচনা করা। নিজের অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, চতুর্থ বর্ষে থাকার সময় তাঁর পেটে ব্যথা ও অনেক বমি হচ্ছিলো। পরে হাসপাতালের আউটডোরে গিয়েও কাজ হয়নি এবং এক পর্যায়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিলো। কিন্তু তাতেও লাভ হচ্ছিলো না।
 
“দিন দিনে অবস্থা খারাপ হচ্ছিলো। একদিন বিকেলে একজন এলেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘আরে এ ছেলেটাকে এভাবে রাখার কোন মানে হলো! এটাতো অ্যাপেন্ডিসাইটিস। আমাদের বললেই হতো।’ এরপর আমাকে তিনি বললেন ‘প্লিজ ডোন্ট অরি। আমি অপারেশন করবো। কোনো সমস্যা হবেনা। তোমার বাবা-মা দুরে। রাতে অপারেশন হলো এবং দু’সপ্তাহ পর সব ঠিক হলো”।
 
তিনি বলেন নিজের এ অভিজ্ঞতা থেকে যা তাঁর মাথায় এলো, তা হলো রোগী দেখতে হলে ভালো করেই দেখতে হবে। “হুট করে প্রেসক্রিপশন দিলে ডায়াগনোসিস মিস হতে পারে এবং আমরা আমাদের কাজ হালকা ভাবে নিলে আরেকজনের জীবনের ক্ষতি হতে পারে। রোগীর সাথে সকাল-সন্ধ্যা, রাত-দিন ডিল করি। আমরা মানিয়ে নিই, কারণ এটা আমাদের কাজ”।
 
পুরো বক্তৃতায় নানা উদাহরণ তুলে ধরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী চিকিৎকদের উদ্দেশ্যে আরও যেসব পরামর্শ দেন তাহলো:
 
১. সার্জন হওয়া বা না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালো সার্জন হওয়া।
 
২. আর ভালো সার্জন হতে হলে প্রথমে ভালো মানুষ হতে হবে।
 
৩. আমাদের সবার মতামত দেয়ার অধিকার আছে। কোন বক্তব্য ভুল বা সঠিক বলে চুড়ান্ত রায় দেয়ার কিছু নেই, যেকোন বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে।
 
৪. আমরা রোগীর সাথে সব সময় থাকি, কিন্তু রোগীরা সব সময় আমাদের সাথে থাকে না। হয়তো একজন রোগী একবারই আসেন। সেজন্য প্রত্যেক রোগীর প্রতি সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।
 
৫. আমরা শুধু মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে কাজ করি। এটা মনে রাখতে পারলে তা হবে সেরা অর্জন।
 
৬. শিক্ষকেরা সবসময়ই শিক্ষার্থীদের জন্য আছেন। শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষকদের জানতে ও বুঝতে হবে।
 
৭. উচ্চাভিলাষী হওয়ার দরকার নেই।
 
৮. নিজের সেরাটা দিন, বাকীটা আল্লাহই আপনাকে দেবেন।
 
তিনি বলেন, “আমি রাজনীতিতে এসেছি আমার পেশাকে ছেড়ে নয়। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমি চাকরি না করে, বিদেশে না গিয়ে ভুটানের মানুষকে নিয়ে ভেবেছি। তাদের নিয়ে কাজ করেছি। আজ আমি সে দেশের প্রধানমন্ত্রী”।
 
এর আগে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং রবিবার সকালে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে ময়মনসিংহে পৌঁছালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা তাকে স্বাগত জানান। এসময় তার সাবেক সহপাঠীরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করেন। পরে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন।
 
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ২৮তম ব্যাচের ছাত্র লোটে শেরিং ১৯৯১ সালে বিদেশি কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হন। ১৯৯৯ সালে এমবিবিএস পাশ করে তিনি ঢাকায় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন।
 
লোটে শেরিং ২০১৩ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটি তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। বন্ধুদের সাথে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের লক্ষ্যে ২০ বছর পর তিনি ময়মনসিংহে আসেন।
 
—–ছবিগুলো বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়া থেকে সংগৃহীত।