নাক : যে ৮ কারণে ঘ্রাণ অনুভূতি হারাতে পারেন !

59
অনিন্দ্যবাংলা ডেক্স :
জগতে কত রকমের গন্ধ আর সুবাস। কোনোটি মন ভরিয়ে দেয়। আবার কোনোটা দম বন্ধ করে দেয়। যেমন ঢাকা শহরের ডাস্টবিন বা পুঁতিগন্ধময় বুড়িগঙ্গার তীর। কিন্তু কেউ কেউ আছেন, যাঁরা এসব গন্ধের কোনোটাই টের পান না। হ্যাঁ, এটা একটা রোগ বটে। কেননা দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তির মতো ঘ্রাণশক্তিও মানুষের এক বিশেষ ক্ষমতা বা চেতনা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জটিল স্নায়বিক ও শারীরবৃত্তীয় ঘটনা।
আমরা কেন গন্ধ পাই? ঘ্রাণ নিয়ে পৃথিবীর বিখ্যাত ছবি পারফিউম কি দেখেছেন ?
আমাদের নাক, মুখ ও গলার সামনের দিকে আছে অনুভূতি উদ্দীপক অজস্র কোষ বা সেনসরি সেল। চারপাশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গন্ধ উৎপাদনকারী পদার্থ এই কোষগুলোকে উদ্দীপ্ত করে তোলে। তারপর তা সরাসরি স্নায়ুবাহিত হয়ে চলে যায় মস্তিষ্কে। এই কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুটি হলো অলফ্যাকটরি। এটি থাকে নাকের পেছন দিকে। এটির যোগাযোগ সরাসরি মস্তিষ্কের সঙ্গে। ঘ্রাণশক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে স্বাদের অনুভুতিও। বলা হয়, আলাদা আলাদা খাবারের আলাদা স্বাদ ও গন্ধ মিলে সৃষ্টি হয় ফ্লেভার। অলফ্যাকটরি কোষ আর স্নায়ু না থাকলে বোঝাই মুশকিল হতো, কমলার রস খাচ্ছেন নাকি কফি খাচ্ছেন।

কারও ঘ্রাণ পাওয়ার অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যেতে পারে। সমস্যাটির নাম হাইপোসমিয়া। কেউ কেউ একেবারেই গন্ধ টের পান না। একে বলে অ্যানোসমিয়া। আবার কেউ ঠিক জিনিসের ঠিক গন্ধ না পেয়ে অন্য কোনো গন্ধ পান, যা অস্বাভাবিক। নানা কারণেই গন্ধের অনুভূতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে স্বাভাবিক বিষয়টি হলো ভাইরাস সংক্রমণ বা সাধারণ ঠান্ডা ও সর্দি-জ্বর। সাময়িকভাবে সর্দি-জ্বর আপনার স্বাদ ও গন্ধ দুই রকমের অনুভূতিই কমিয়ে দিতে পারে। যেকোনো কারণে মাথায় আঘাত পেলে ঘ্রাণের অনুভূতি স্থায়ীভাবে চলে যেতে পারে। এ ছাড়া নাকের পলিপ, সাইনোসাইটিস, হরমোনজনিত কয়েকটি রোগ, নাক বা মাথায় রেডিওথেরাপির পর গন্ধের অনুভূতি নষ্ট হতে পারে। মস্তিষ্কের আঘাত ছাড়াও মস্তিষ্কের কিছু রোগ—যেমন পারকিনসনস, আলঝেইমারস, মালটিপল স্কে¬রসিস ইত্যাদিতে এবং কিছু মানসিক রোগের প্রভাবে গন্ধের অনুভূতি ভ্রান্ত হয়। এমনকি স্থূলতা ও ডায়াবেটিসও নাকি খানিকটা সমস্যার জন্য দায়ী।

কিন্তু অ্যানসমিয়া হলে অর্থাৎ ঘ্রাণ অনুভূতি লোপ পেলে আপনার ক্ষতি হতে পারে। এ অবস্থা শ্রবণশক্তি বা দৃষ্টিশক্তি হারানোর তুলনায় বেশি ধীরে মানুষের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে। এর কারণ হল ঘ্রাণ অনুভূতি নাকের সেন্সর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় যা মস্তিষ্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। বিভিন্ন কারণে ঘ্রাণ অনুভূতি লোপ পেতে পারে। এ লোপ স্বল্পস্থায়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ী হতে পারে।

১. নাকের কনজেশন বা নাক বন্ধ
দীর্ঘস্থায়ী নাকের কনজেশন বা নাক বন্ধ সমস্যার কারণ সম্পর্কে স্নায়ুবিশারদ কুলরীত চৌধরী বলেন, ‘নাকের কনজেশনের সবচেয়ে কমন কারণ হচ্ছে, সাইনাস ব্লকেজ বা সাইনাস প্রতিবন্ধকতা এবং সাইনাস কনজেশন বা সাইনাস বন্ধ যা সাইনাসে প্রদাহ এবং টক্সিন জমার কারণে হয়ে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘মন্দ কনজেশন বহু পরত বিশিষ্ট এবং তা অতিরিক্ত স্ট্রেস বা চাপ, অতিভোজন, নিম্নমানের আহার অভ্যাস, অতি ক্ষুদ্র অণুজীবের ভারসাম্যহীনতা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার অত্যধিক গ্রহণের সঙ্গে জড়িত।’ আপনার যদি ঠান্ডা বা অ্যালার্জির উপসর্গ না থাকে তাহলে পাচন সমস্যা বা স্ট্রেসের কারণে কনজেশন হতে পারে এবং ঘ্রাণশক্তি লোপ পেতে পারে। কুলরীত চৌধরী বলেন, ‘সাইনাসের প্রদাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা পাচনতন্ত্র বা পরিপাক প্রক্রিয়ার উন্নয়নসাধনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।’ উপযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং সাইনাস সমস্যাকে নিস্তেজ করতে চিকিৎসক বা ডায়েটেশিয়ানের সঙ্গে কথা বলুন।

২. ধূমপান
সাধারণত ধূমপান অ্যানসমিয়ার জন্য কালপ্রিট। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ওটোল্যারিঙ্গোলজি-হেড অ্যান্ড নেক সার্জারির মতে, ‘তামাক ধূমপান হচ্ছে, সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত দূষণ যা বেশিরভাগ মানুষ নির্গত করে।’ এ অভ্যাস ঘ্রাণ নির্ণয় ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয় এবং স্বাদ অনুভূতি কমিয়ে ফেলে। সুখবর হল যে এ ফলাফল স্থায়ী হবে না, যদি আপনি এ বদভ্যাস ত্যাগ করেন।

৩. কেমিক্যাল
বিষাক্ত কেমিক্যাল, যেমন- কীটনাশক বা দ্রাবক, নির্গত করলে আপনার নাকের ভেতর দগ্ধ হয়ে ঘ্রাণশক্তি বিনাশ হতে পারে। কেমিক্যাল আপনার নাকের টিস্যু এবং ঘ্রাণশক্তিকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে। কিছু বড় কেমিক্যাল কালপ্রিট হল: মিথাক্রাইলেট ভ্যাপারস, অ্যামোনিয়া, বেনজিন, ক্যাডমিয়াম ডাস্ট, ক্রোমেট, ফরমালডিহাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড, নিকেল ডাস্ট এবং সালফিউরিক অ্যাসিড। যেকোনো কেমিক্যাল স্প্রে ব্যবহারের পূর্বে লেবেল দেখে নিন এবং ঘরে কিংবা কর্মক্ষেত্রে কেমিক্যাল ব্যবহারে সবসময় রেস্পিরেটর ডিভাইস বা শ্বাসমুখোশ পরিধান করুন।

৪. ওষুধ
কুলরীত চৌধরীর মতে, ‘অ্যানসমিয়া হওয়ার সবচেয়ে কমন কালপ্রিটের একটি হচ্ছে, ওষুধ এবং তা সবচেয়ে সামান্য সমস্যার একটি।’ আপনি যদি সদ্য ওষুধ গ্রহণ করে থাকেন তাহলে হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে আপনার ঘ্রাণ অনুভূতি বন্ধ হয়ে গেছে। বিভিন্ন রকম ওষুধ, যেমন- অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ এবং অ্যান্টিহিস্টামিন- এ রকম ফলাফল প্রদান করে থাকে। আপনার ওষুধের লেবেল দেখে নিশ্চত হোন এটি সেবনে অ্যানসমিয়া উপসর্গ দেখা দেবে কিনা। বিকল্প ওষুধের জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন। কুলরীত চৌধরী বলেন, ‘প্রায় ক্ষেত্রে, আপনি যদি ওষুধ সেবন বন্ধ করতে পারেন তাহলে সাধারণত অ্যানসমিয়া উপসর্গ চলে যাবে।’

৫. মাথায় আঘাত
নাকের সঙ্গে মস্তিষ্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে ঘ্রাণশক্তির লোপ আপনার মনে কোনো কিছু অনুপস্থিতির ভালো নির্দেশক হতে পারে। আঘাত পেলে কিংবা ব্রেইন সার্জারি হলে সতর্ক থাকবেন, কারণ মাথায় আঘাতের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ওলফ্যাক্টরি বা ঘ্রাণজ স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ফলাফল সাময়িক বা স্থায়ী হতে পারে। কুলরীত চৌধরী উল্লেখ করেন, ‘বিরল ক্ষেত্রে, আপনার ঘ্রাণশক্তির ধ্বংসপ্রাপ্ততা ব্রেইন টিউমারের লক্ষণও হতে পারে।’

৬. অ্যালঝেইমার’স রোগ
কান, নাক এবং গলা বিশেষজ্ঞ ড. ইলিয়ানা শোয়াল্টারের মতে, ‘দুর্বল ঘ্রাণ অনুভূতি অ্যালঝেইমার’স রোগের প্রাথমিক লক্ষণসমূহের একটি।’ প্রকৃতপক্ষে, মস্তিষ্ক ক্ষয় রোগের পূর্বে এ উপসর্গ (দুর্বল ঘ্রাণ অনুভূতি) দেখা দিতে পারে। গত বছরের গবেষণা অনুযায়ী, অ্যালঝেইমার’স সোসাইটি উল্লেখ করেছেন, অ্যানসমিয়া যে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের উল্লেখযোগ্য নির্দেশক তার স্বপক্ষে জোরালো প্রমাণ রয়েছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের গবেষকদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ঘ্রাণ অনুভূতি ক্ষতিগ্রস্তদের তিনগুণ বেশি স্মৃতি সমস্যা ছিল। গবেষকরা আরো দেখতে পান যে, চুইংগাম এবং পেট্রোলের গন্ধের পার্থক্য নির্ণয় অক্ষমতা অ্যালঝেইমার’স রোগ এবং ডিমেনশিয়া উদঘাটনের নতুন উপায় হতে পারে।

৭. পারকিনসন’স রোগ
অ্যালঝেইমার’স রোগের মতো পারকিনসন’স রোগও মস্তিষ্ক ক্ষয়মূলক ব্যাধি এবং অ্যালঝেইমার’স এর মতোই পারকিনসন’স এরও প্রাথমিক উপসর্গ আছে, যা সহজেই অলক্ষ্যে থেকে যেতে পারে। পারকিনসন’স রোগের একটি উপসর্গ হচ্ছে, ঘ্রাণ অনুভূতির ক্ষতিগ্রস্ততা। মাইকেল জে ফক্স ফাউন্ডেশনের মতে, যেসব লোকের অ্যানসমিয়া আছে তাদের বেশিরভাগের পারকিনসন’স রোগ হয় না, কিন্তু অধিকাংশ পারকিনসন’স রোগীরা অ্যানসমিয়া অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন এবং প্রায়ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের সময় এটি উপেক্ষিত থেকে যায়।

৮. বার্ধক্য
আপনাকে বার্ধক্য গ্রাস করতে থাকলে দৃষ্টিশক্তি এবং শ্রবণশক্তির মতো আপনার ঘ্রাণশক্তিও কমে যেতে থাকবে। গবেষকরা তথ্য উত্থাপন করেন যে, ৮০ উর্ধ্ব মানুষের মধ্যে ৭৫ শতাংশেরও বেশি মানুষের ঘ্রাণজ অবনতির লক্ষণ থাকে। অন্য একটি গবেষণায় প্রকাশ পায়, ৮০ থেকে ৯৭ বছর বয়সিদের মধ্যে ৬২.৫ শতাংশ মানুষের ঘ্রাণজ অবনতি ছিল।

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট