পত্রিকার নিবন্ধন ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা !

66
লেখক, সাংবাদিক।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ২৭৭৩ টি পত্রিকা নিবন্ধিত হয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক ও বাৎসরিক পত্রিকা। তথ্য মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীর বার্ষিক প্রতিবেদন নামক গ্রন্থে বিচিত্র নামের পত্রিকাকে নিবন্ধন দিতে দেখা যায়। আরও দেখা গেছে একই জেলায় একই নামে দুই পত্রিকা। দেখা গেছে সম্পাদকের নামে নামকরণকৃত পত্রিকা। আরও রয়েছে অবাক করার মতো বেশ কিছু পত্রিকার নাম। যেমন, বাঁশ পত্র, দুর্নীতির আখড়া, রঙ্গিলা, আলাপ সিংহ, টু-লেট, মাঝের বাড়ি, আপনার বাড়ি, মৌবাজার, কৃষি ও আমিষ, টাকা বাজার, চাওয়া পাওয়া ও we!, মাটির পুতুল, ঘুমান্তের ডাক প্রভৃতি।

চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের এই বার্ষিক প্রতিবেদন পড়লে যে কেউ চমৎকৃত হবেন। রংপুর জেলার একটি দৈনিক পত্রিকার নাম দৈনিক সাইফ। যার সম্পাদক সাইফ উদ্দীন আহমেদ। সম্পাদক তার নিজের নামেই পত্রিকার নামকরণ করেছেন। টাঙ্গাইল জেলার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার নাম সাপ্তাহিক পাপিয়া। পত্রিকাটির সম্পাদক মাজহারুন নেছা পাপিয়া। সম্পাদিকা তার নিজের নামেই পত্রিকাটির নামকরণ করেছেন। কিশোরগঞ্জ জেলার একটি পাক্ষিক পত্রিকার নাম আল হাসান। এটিও সম্পাদকের নিজের নামে। যার সম্পাদক মতিউল হাসান। ময়মনসিংহ জেলার একটি দৈনিক পত্রিকার নাম বিশ্বের মুখপাত্র, রাজশাহী জেলার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার নাম অপরাধমালা। গ্রন্থটি পড়লে সত্যিই চমৎকৃত হতে হয়। নিবন্ধন নিয়েছে বাংলাদেশ হতে কিন্তু পত্রিকার নাম বিবিসি পোস্ট। পত্রিকার নিবন্ধন বাংলা পত্রিকা হিসেবে কিন্তু নাম রেখেছে ইংরেজীতে। যেমন দি ইস্টার্ন মিডিয়া, দি ইস্টার্ন এক্সামিনার, ইস্টার্ন এক্সপ্রেস, ফ্রন্টিয়ার প্রভৃতি।

নরসিংদী জেলার একই নামে দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। পত্রিকাটির নাম ‘খোরাক’। অধ্যক্ষ শেখ সাদি একটির সম্পাদক ও অন্যটির প্রকাশক। এক জেলায় এক নামে দুব্যক্তির পত্রিকাকে কিভাবে নিবন্ধন দিল জেলা প্রশাসক? নিবন্ধন যে কেউ যে কোন নামে চাইতে পারে কিন্তু নিবন্ধনগুলো কি যাচাই বাছাই করে দেয়া উচিত নয়? সংবাদপত্রের নিবন্ধন কোন সংস্থা কিংবা স্রেফ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। সাংবাদিকতা পেশাটিও স্রেফ অন্য পেশার মতো গতানুগতিক কোন পেশা নয়। সিরাজগঞ্জ জেলার একটি পত্রিকার নাম চাঁদ তারা। পত্রিকাটি বের হয় বাংলাদেশ হতে অথচ ব্যবহার করছে পাকিস্তানী জাতীয় পতাকার প্রতীক। এবিষয়ে বাংলাদেশের নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কী বক্তব্য থাকতে পারে?

গ্রন্থটিতে এমনও দেখা গেছে। এতে শুধু পত্রিকা ও সম্পাদকের নাম রয়েছে। কোন ঠিকানা নেই। কুষ্টিয়া জেলা হতে প্রকাশিত হচ্ছে সাগর খালি নামের দুটি পত্রিকা। সম্পাদক হিসেবে একই ব্যক্তি নামের বানান বদল করে দুটি পত্রিকার নিবন্ধন নিয়েছেন।এক সাগর খালিতে নামের বানান লিখেছেন মহাম্মদ আলী জোয়ার্দ্দার ও আরেক সাগর খালিতে নামের বানান লিখেছেন মোহাম্মদ আলী জোয়ার্দ্দার। অনেক ক্ষেত্রেই পত্রিকার কোন পরিচালনা কাঠামো নেই। নেই কোন বিধিমালা ও বেতন কাঠামো। সম্পাদক হতে গেলে তেমন কোন যোগ্যতারও দরকার নেই যেন। লবিং করে যে কোন একটি পত্রিকার নিবন্ধন নিয়ে অনেকেই বনে যাচ্ছেন সম্পাদক। সরকারি ডিক্লারেশন নিয়ে অনেককে আবার দেখা যায় বিত্তবানদের কাছে পত্রিকা বেচে দিতে। বেচাবিক্রি হয় সম্পাদক পদও। এমনভাবে পদ বিক্রি আর কোথাও আছে কি?

নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের যাচাই বাছাইয়ে ত্রুটির কারণেই অপসাংবাদিকতার সৃষ্টি নয় কি? জঙ্গি মদদদাতারাও পায় পত্রিকা প্রকাশের সুযোগ। জঙ্গি মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতার দায়ে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি আসাদুল্লাহ গালিবও একটি পত্রিকার নিবন্ধন নিয়েছিল। এমন অনেকেই আরও পত্রিকার নিবন্ধন নিয়েছে। যেগুলোর মাধ্যমে তারা জঙ্গিবাদে উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে। যার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠছে জঙ্গিবাদী প্রজন্ম। সংবাদপত্রের নামকরণেও পত্রিকার মর্যাদার দিক ফুটে ওঠে। সাংবাদিকতা একটি মেধাসম্পন্ন সত্যসন্ধানী পেশা। এটি কেবলই কোন নেশার বিষয় নয়। অধিকাংশ পত্রিকা মৌলিক সৃজনশীলতা ও বস্তুনিষ্ঠতা বাদ দিয়ে ব্যস্ত থাকে কপিপেস্ট সাংবাদিকতায়। এতে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদপত্র কর্মী হয়ে ওঠায় চরম ব্যাঘাত ঘটছে। বিষয়টা অবিকল ভিনদেশীয় ছবি নকলের মতো। অন্য পত্রিকার সংবাদ হুবহু কপিপেস্ট করে নিজেদের বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের এব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন উচিত নয় কি?

সংবাদপত্রের মর্যাদার আসনটিকে ধরে রাখতে প্রয়োজন স্বাধীন ও স্বকীয় সংবাদ চর্চা। এজন্য প্রয়োজন প্রতিটি সংবাদপত্রের স্বাধীন ও শৃঙ্খলার সহিত সংবাদ পরিবেশন।পাঠকদের নিকট এ মর্যাদা ধরে রাখতে প্রতিটি সংবাদপত্রের নিজেদের ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষকেই এগিয়ে আসা উচিত। নিবন্ধন দেয়ার আগে যেসব নামকরণ অর্থহীন ও হাস্যকর সেগুলোকে নিবন্ধন না দেয়া কিংবা তাদেরকে নাম পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়া উচিত। একজন সম্পাদক ও প্রকাশক কয়টি পত্রিকার নিবন্ধন নিতে পারে? তার কি কোন সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত নয়? বর্তমানে এমনও দেখা যায়, একজনের নামে ৫/৬ টি পত্রিকার নিবন্ধন রয়েছে। একজন ৫টি পত্রিকার সম্পাদক কিভাবে হয়? এগুলোর কোনটি বের হয় আবার কোনটি বের হয় না। এগুলোকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয় কি? আরও নজর দেয়া উচিত পত্রিকার অর্থপূর্ণ নামকরণের ব্যাপারে। কোন নামকরণ পাঠকদের মাঝে হাস্যকর হয়ে উঠলে তা গোটা সংবাদপত্র জগতের জন্যই বিড়ম্বনার নয় কি?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।অনিন্দ্যবাংলা’র সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)