পহেলা বৈশাখ – বাংলার দরিদ্র মানুষদের সংস্কৃতি কিন্তু ঐতিহ্যময়

138

অনিন্দ্যনাংলা, ১৪ এপ্রিল, ২০১৯,
সম্পাদকীয় ।
বৈশাখ মাসের ১ তারিখে বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষজন অনেক আয়োজন করে দিনটি পালন করে । বৈশাখের ১ তারিখ দিয়ে বাংলা মাসের শুরু বিধায় বাঙ্গালিদের জন্য এই দিনটিকে নববর্ষ বা বছরের প্রথম দিন হিসেবে উৎযাপন করা হয় । রাজা – মহারাজাদের খাজনা থেকে শুরু করে ছোট বড় সকল ব্যবসায়ী তাদের হিসাবের নতুন বছরের খাতা পুনরায় বৈশাখের ১ তারিখ থেকে শুরু করতেন । এই দিনটির সাথে বাংলার অর্থনীতি-সংস্কৃতি জড়িত। এই দিনে কৃষক তার মালিকের খাজনা, মহাজনের দেনা, ব্যবসায়ীদের বাকী পরিশোধ করে বাড়ী ফিরতেন। বাড়িতে ফেরার সময় মেলা থেকে সামান্য মিষ্টান্ন খাবার ও সংসারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি কিনে নিয়ে আসতেন ।আজ আমরা যে পান্তা ভাত ও ভর্তা ভাজি , ইলিশ মাছ দিয়ে এই দিনটিকে উৎসবের দিনে রুপান্তরিত করেছি , এই দিনটি মোটেও কৃষকের জন্য উৎসবের দিন ছিল না । কৃষি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কৃষকের জন্য এই দিনটি হচ্ছে অভাবের সময় । এমনিতেই এই সময়টা বৈশাখের নতুন ধান উঠার মাস । এই ধান উঠিয়ে কৃষক তার সকল দেনা পাওনা পরিশোধ করেন ।

বৈশাখের সংস্কৃতির আয়োজনগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, খাদ্য তালিকায় পান্তা ভাত আর ভর্তা , ভাজি, তিতা জাতীয় খাবার । বৈশাখের আগের দিন চৈত্রের শেষ দিন হচ্ছে চৈত্র সংক্রান্তি । এই দিনে তিতা জাতীয় খাবার খাওয়া বাধ্যতামূলক । এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হচ্ছে , এই সময়ে বাতাসে প্রচুর পরিমানে বসন্ত/পক্স ইত্যাদি রোগের জীবানু থাকে, আর তিতা জাতীয় খাবার বিশেষ করে নাইল্লা শাক, করল্লা এই সব রোগ জিবানু থেকে শরীরকে রক্ষা করে ।
কৃষক বৈশাখের প্রথম দিন খুব সকালে হাটের উদ্দেশ্য রওনা হতো । রাতের খাবারের রান্না করা অবশিষ্ট ভাত যাতে নষ্ট হয়ে না যায় তাই ভাতে পানি দিয়ে রাখা হতো , সকালে সেই পানি ভাতকেই বলা হয় পান্তা ভাত। গরম ভাতে পানি ঢাললে তা পান্তা ভাত হয় না । পান্তা ভাতের এর সাথে পিয়াজ, কাঁচামরিচ বা ঘরে রাখা সিঁধেলের চ্যাপা সুটকী ভর্তা দিয়ে কৃষাণী খাবার পরিবেশন করতো । যেহেতু এই সময় কোন ভাল সব্জির ফলন নেই , কাজেই দুপুরে বা বিকেলে গরম ভাতের সাথে ঘরের আশেপাশের যা কিছু ফলন ছিল তাই দিয়ে ভর্তা – ভাজি করে দৈনন্দিন খাবারের ব্যবস্থা করা হতো । ইলিশ মাছ মুলত দক্ষিন অঞ্চলের মাছ । পান্তা ভাতের সাথে মাঝিরা নৌকায় রাখা ইলিশ মাছ ভাজা করে সকালের নাস্তা বা আহার শেষ করতেন । পূর্ব বঙ্গীয় ও উত্তর বঙ্গীয় খাদ্যাভ্যস হচ্ছে পান্তা ভাতের সাথে নানাম ধরনের ভর্তা বিশেষ করে চ্যাপা শুটকির ভর্তা , শুকনা মরিচ-পেজাজ দিয়ে ভর্তা ।
পহেলা বৈশাখের নববর্ষের মুল উৎযাপন ছিল গ্রামের মেলায় যাওয়া , সেখান থেকে গ্রামের মেয়েরা চুরি, ফিতা, আলতা, শাড়ি সহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় করে বাড়ী ফিরতো । বছরের এই মেলার হাট ছাড়া এই সমস্ত প্রয়োজনীয় নারী সামগ্রী আর কোথাও পাওয়া যেতো না । নারীদের এই সমস্ত পন্যের সাথে যোগ হতো ঘর গেরস্থালীর কিছু পন্য ও বাচ্চাদের কিছু খেলনা -খাবার ।
এই অভাবের বছরের বাংলা মাসের ১ তারিখের দিনটি আজ উৎসবের দিন । বাংলা সাংস্কৃতির এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আজকের আধুনিক সমাজও পান্তা ভাত, ভর্তা, ভাজি খেয়ে এই দিনটি পালন করে । এমনিতেই অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশের সাথে এই দিনটির গুরুত্ব না থাকলেও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এই দিনটির গুরুত্ব রয়েছে । তাই এই দিনটিকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের আয়োজন করা হয় তাকে পরিমণ্ডল করে গড়ে উঠেছে একটি বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র । শুধু এই পহেলা বৈশাখ উৎযাপনের সরঞ্জামাদির বাজার এখন ঈদের বাজারের প্রায় সমান । চুরি, ফিতা, জামা, জুতো, শাড়ি, দেশি গয়না, নানা ধরনের খাবারের আয়োজন, ঘর সাজানো, দাওয়াত করে খাওয়ানো এই সবই ইদ উৎসব থেকে কোন ভাবেই কম নয় , বাজেটও ঈদ উৎসবের বাজেটের সমান । তাই সরকরাও এই দিনের উৎসবের খরচ মেটানোর জন্য বৈশাখী ভাতা চালু করেছে ।