বাংলাদেশে ধর্ষণ বিষয়ক আইন, সংজ্ঞা ও প্রতিকার

66

অনিন্দ্যবাংলা : ধর্ষণ আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। ধর্ষণসহ নানাবিধ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটা সময় মানুষ খুব একটা সচেতন ছিলো না বললেই চলে। তাই নারীরা সবসময় বঞ্চিত হতেন ন্যায্য বিচার পাওয়া থেকে।

তবে এখন আর কেউ ঘুমিয়ে নেই। সময়ের সাথে সাথে আমরা যতটা সচেতন হয়েছি, তেমনি দেশের আইনকানুনও অনেক বদলে গেছে।

‘ধর্ষণ’ বিষয়ক আইন নিয়ে অনেকেরই অজ্ঞতা রয়েছে। অনেকে হয়তো এখনো বলতেই পারবেন না, আশেপাশে এরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেলে কি করা উচিত!

ধর্ষণের ঘটনায় কিভাবে আইনের সহায়তা নিতে হবে, তা বিস্তারিত দণ্ডবিধি ও ধারাসহ নিচে উল্লেখ করা হলো।

সঠিক নিয়মে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এই পোস্ট আপনাকে সহায়তা করবে বলে আমরা আশাবাদী !

বাংলাদেশে ধর্ষণ বিষয়ক আইন ও ব্যাখ্যা :

বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৫ নং ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে অথবা কোনো নারীর সম্মতি ছাড়া অথবা কোনো নারীকে মৃত্যু বা শারীরিক আঘাতের ভয় দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্কে সম্মতি দিতে বাধ্য করলে অথবা নাবালিকা অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়স্ক শিশু সম্মতি দিলে কিংবা না দিলে (সে যদি নিজ স্ত্রীও হয়) অথবা কোনো নারীকে বিয়ে না করেই ব্যক্তিটি তার আইনসঙ্গত স্বামী এই বিশ্বাস দিয়ে যদি কোনো পুরুষ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তাকে আইনের ভাষায় ধর্ষণ বলা হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৯ ধারা অনুযায়ী, ধর্ষণের অপরাধে যে সকল শাস্তির বিধান রয়েছে তা হলো, ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যথায় এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে তবে উক্ত দলের সকলের জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে।

ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ দশ বছর এবং সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেরও বিধান রয়েছে।

কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো বা আহত করার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

পুলিশ হেফাজতে কোনো নারী বা শিশু ধর্ষিত হলে যাদের হেফাজতে থাকাকালে এ ধর্ষণ সংগঠিত হয়েছে তারা সকলেই নারী ও শিশুর হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য সর্বোচ্চ দশ বছর ও সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে দশ হাজার টাকা অর্থদন্ডে দণ্ডিত হবেন। ধর্ষণকারী এক বা একাধিক ব্যক্তি হতে পারে। আবার ধর্ষণ না করেও কোনো ব্যক্তি ধর্ষণের ঘটনায় সাহায্য করতে পারে।

সব ক্ষেত্রে প্রত্যেকেই সমানভাবে দায়ী হবে এবং শাস্তি লাভ করবে। বিচারক শাস্তির পরিমাণ ঠিক করেন অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনাকরে। মামলার বিষয়বস্তু (ধর্ষণের শিকার নারীর জবানবন্দি, ডাক্তারি পরীক্ষার ফলাফল এবং অন্যান্য সাক্ষ্য) পর্যালোচনা করে নিজস্ব বিচার বিবেচনার ভিত্তিতে বিচারক রায় দেন এবং অপরাধীর শাস্তি নির্ধারণ করেন।

ধর্ষণের পর ধর্ষিত নারীর করণীয় বিষয়গুলো কি কি?

প্রথমেই আপনাকে প্রমাণ বা সাক্ষ্য সংরক্ষণ করতে হবে। ধর্ষণের ঘটনাটি দ্রুত কাছের কাউকে জানান। কারণ তিনি আপনাকে সব ধরণের সহায়তা প্রদান করবেন এবং মামলার সময় সাক্ষ্য দেবেন।

ধর্ষণ প্রমাণের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্ষণের শিকার নারীর শরীর। এজন্য ধর্ষণের ঘটনার পর যে অবস্থায় আছেন তেমনি থাকুন, নিজেকে পরিষ্কার বা গোসল করা যাবে না। কারণ ধর্ষণকারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীর শরীরে কিছু প্রমাণ রেখে যায়।

ডাক্তারি পরীক্ষার দ্বারা নারীর শরীর থেকে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য- প্রমাণাদি এবং আলামত সংগ্রহ করা যায়, যা ধর্ষণ প্রমাণ ও ধর্ষণকারীকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।

ঘটনার সময় যে কাপড় গায়ে ছিলো অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। কাগজের ব্যাগে করে এই কাপড় রেখে দিতে হবে। কাপড়ে রক্ত, বীর্য ইত্যাদি লেগে থাকলে তা যদি ধর্ষণকারীর রক্ত বা বীর্যের সাথে মিলে যায়, তাহলে মামলায় এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসাবে কাজ করে।

দ্রুত থানায় অভিযোগ দায়ের করতে হবে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিকটবর্তী থানায় এজাহার বা অভিযোগ দায়ের করুন। যদি সম্ভব হয় তবে একজন আইনজীবীকে সাথে নিতে পারেন।

পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে চেষ্টা করুন। ঘটনার সময়ের আপনার পড়া কাপড় ও অন্যান্য সাক্ষ্য সাথে রাখুন। কারণ এসবই পুলিশ অফিসারের তদন্তের সময় কাজে লাগবে।

আপনি চাইলে ঘটনা সম্পর্কে মহিলা পুলিশ কর্মকর্তার সাথে আলোচনা করতে পারেন।

অভিযোগের পর পুলিশ যদি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে কি করবেন?

থানায় অভিযোগ দায়েরের পর যদি পুলিশ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তবে অতি দ্রুত পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে (এস.পি অথবা ডি.সি) লিখিতভাবে অবহিত করুন। ঘটনার দিনের মধ্যে যদি তারাও কোন যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন, তাহলে পরের দিন অবশ্যই প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্টে মামলা দায়ের করুন। এ ব্যাপারে শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত  নারী নয়, তার পক্ষ থেকে যে কেউই (যিনি অপরাধ সম্পর্কে জানেন) এই অভিযোগটি দায়ের করতে পারেন।

মনে রাখবেন, আপনি যত তাড়াতাড়ি থানায় অভিযোগ দায়ের করবেন, তত তাড়াতাড়ি পুলিশ কর্মকর্তা আপনাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন।

কারণ ধর্ষণের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডাক্তারী পরীক্ষা না করালে ধর্ষণের প্রমান পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। ডাক্তারি পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে বা সরকার কর্তৃক এই ধরনের পরীক্ষার জন্য স্বীকৃত কোন বেসরকারি হাসপাতালে সম্পন্ন করা যাবে। ডাক্তারি পরীক্ষা হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার অতি দ্রুত সম্পন্ন করবেন এবং ডাক্তারি পরীক্ষা সংক্রান্ত একটি সার্টিফিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রদান করবেন।

মেডিকেল টেস্টের রিপোর্ট হাতে পেলে পুলিশ দ্রুত ঘটনার তদন্ত শুরু করতে পারবেন।

মেডিকেল টেস্টের সময় অবশ্যই চিকিৎসককে সব কথা খুলে বলতে হবে। কোনোরকম লজ্জা বা সংকোচ না করে চিকিৎসক যা যা জানতে চাইবেন তার সঠিক জবাব দিন। কারণ আপনার কথার ওপর নির্ভর করে তিনি আপনাকে সাহায্য ও সেবা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। আপনার মানসিক অবস্থার কথাও তাকে জানান। আপনার পরবর্তী পিরিয়ড যদি সময়মত না হয়, তবে অবশ্যই সাথে সাথে চিকিৎসকের সাথে দেখা করুন।