Tuesday, July 16, 2019

বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী

152

 

বাংলা অঞ্চল তো বটেই, সমগ্র বিশ্বের প্রেক্ষাপটে এমন সাহিত্যিকের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য, যাঁদের জীবন নিয়ে রচিত হয়েছে আরেক সাহিত্য। ‘ক্ষুধা, প্রেম, আগুনের সেঁক’ আর ‘হাঙরের ঢেউয়ে লুটোপুটি’ খাওয়া জীবনেরই হয়তো ঘটে এমন প্রাপ্তি— আস্বাদনযোগ্য গৌরবে উপস্থাপিত হয় আরেক লেখকের সৃষ্টিতে। বাংলা সাহিত্যে বিরল এ সম্মানের সূত্রপাত ঘটেছে কবি চন্দ্রাবতীকে (জন্ম আনুমানিক ১৫৫০ খ্রি.) ঘিরে। বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের ‘একমাত্র নারী কবি’ হিসেবে পরিচিত চন্দ্রাবতীর মর্মন্তুদ জীবন-আখ্যানকে কাব্যে রূপ দিয়েছিলেন মধ্যযুগের আরেক কবি নয়নচাঁদ ঘোষ। তাঁর কাব্যের নাম ‘চন্দ্রাবতী’। এমন বিরল ও ব্যতিক্রমী ঘটনা সত্ত্বেও এবং মধ্যযুগের সুদীর্ঘ কালপর্বে ‘একমাত্র নারী কবি’র সম্মাননার পরও চন্দ্রাবতী কিন্তু এখনো প্রায়-অপরিচিত, তাঁর সাহিত্যও মূল্যায়িত হয়নি যথার্থভাবে। নিঃসন্দেহে বলা চলে, এ অবহেলা ও উপেক্ষার কারণ আমাদের সমাজ-কাঠামোর মর্মমূলেই গাঁথা।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও পুরুষতন্ত্রের প্রবল আধিপত্যের কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলা অঞ্চলেও নারীর অবস্থান ক্ষমতাকেন্দ্রের বহির্মহলে, প্রান্তিক সীমানায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগে নারীর এ নির্বাসিত পরিস্থিতি ছিল আরো করুণতর। এ সময়ের সাহিত্যক্ষেত্রে নারীর অনুপস্থিতি তাই বিশেষভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য। বস্তুত, বাংলা সাহিত্যে উনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত নারী সাহিত্যিকের তেমন একটা সন্ধান পাওয়া যায় না। প্রবাদের ক্ষেত্রে খনার নাম আমরা জানি। কবি হিসেবে চণ্ডীদাসের দয়িতা রামীর নাম শোনা গেলেও তার সাহিত্যকীর্তির পরিচয় অপ্রতুল। এসব বিবেচনায় বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের বিস্তৃত কালখণ্ডে ‘একমাত্র নারী কবি’ হিসেবে চন্দ্রাবতী স্বীকৃত। ‘মলুয়া’, ‘দস্যু কেনারামের পালা’, ‘রামায়ণ’ ও ‘পদ্মপুরাণ’-এর অংশবিশেষসহ অসংখ্য গানের রচয়িতা তিনি। এতসব কাব্য রচনার পরও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসবিদ ও সমালোচকদের যথার্থ মনোযোগ পাননি তিনি। চন্দ্রাবতীকে ঘিরে যতটুকু বা আলোচনা হয়েছে, তার সিংহভাগ ব্যয় হয়েছে চন্দ্রাবতীর পিতৃপরিচয় প্রদান ও তাঁর প্রেম-প্রত্যাখ্যাত জীবনকে অবলম্বন করে। তাঁর সৃষ্টির শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য বিষয়ে সমালোচকরা ছিলেন দীর্ঘদিন নিশ্চুপ। এভাবে ‘আধুনিক’কালের সাহিত্য-সমালোচকদের ঔপনিবেশিক নন্দনভাবনা ও পুরুষতান্ত্রিক সাহিত্য বিচার চন্দ্রাবতীর প্রাতিস্বিক মূল্যায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করেনি। মাত্র কয়েক বছর হলো চন্দ্রাবতীর সাহিত্য নিয়ে কিছু মূল্যায়নধর্মী কাজ শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন নবনীতা দেব সেন, বরুণকুমার চক্রবর্তী, সুস্মিতা চক্রবর্তী, কোয়েল চক্রবর্তী, সেলিনা হোসেন, বিশ্বজিত্ ঘোষ, শাহীন আখতার, অপু দাস, সাইমন জাকারিয়া প্রমুখ। লক্ষণীয়, চন্দ্রাবতীর সাহিত্য মূল্যায়নে যাঁরা এগিয়ে এসেছেন, তাঁদের অধিকাংশই কিন্তু নারী।

চন্দ্রাবতীর কাব্য সংগ্রহে সর্বপ্রথম যাঁর নাম উচ্চারিত হয়, তিনি চন্দ্রকুমার দে (১৮৮১-১৯৪৫)। সাহিত্যিক, গবেষক ও লোকসাহিত্য সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে ‘সৌরভ’ পত্রিকায় প্রবন্ধের মাধ্যমে চন্দ্রাবতীর কাব্য সম্পর্কে প্রথম সুধী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর ওই প্রবন্ধ পড়ে দীনেশচন্দ্র সেন তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতনভুক্ত সংগ্রাহক পদে নিযুক্ত করেন। এর পর চন্দ্রকুমার দের সংগৃহীত কাব্য নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৩-৩২ সালে চার খণ্ডে প্রকাশ করেন ‘পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা’। এ সংকলনে চন্দ্রাবতীর তিনটি কাব্য স্থান পেয়েছে— ‘মলুয়া’, ‘দস্যু কেনারামের পালা’ ও ‘চন্দ্রাবতীর রামায়ণ’। পরবর্তীকালে ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক দীর্ঘ ৩৬ বছর অনুসন্ধানের পর অনেক পালার অসম্পূর্ণ অংশ উদ্ধার করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি সাত খণ্ডে ‘প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ সম্পাদনা করেন। দীনেশচন্দ্র সেন ও ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক সম্পাদিত এ দুই সংগ্রহে যথেষ্ট পার্থক্যও পরিলক্ষিত হয়। চন্দ্রকুমার দে তাঁর প্রবন্ধে উল্লিখিত তিনটি কাব্য ছাড়াও চন্দ্রাবতীর অনেক গানের কথা আমাদের জানিয়েছেন। কিন্তু গবেষকদের অনাগ্রহে সেসব গান এখন লুপ্তপ্রায়।

সাহিত্যের ইতিহাসে কবি চন্দ্রাবতীর যে জীবনবৃত্তান্ত আমরা পাই, তা আসলে গড়ে উঠেছে গীতিকা ও জনশ্রুতি অবলম্বন পথ করে। চন্দ্রকুমার দে ‘সৌরভ’ পত্রিকায় (২য় বর্ষ) ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ শীর্ষক প্রবন্ধে চন্দ্রাবতীকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা চারণকবি নয়নচাঁদ ঘোষের গাথাকাব্যেরই [‘চন্দ্রাবতী’] বর্ণনানুসারী। এ জীবনবৃত্ত থেকেই আমরা জানতে পারি চন্দ্রাবতীর পিতার পরিচয়, চন্দ্রাবতীর নিবাস, তাঁর বাল্যজীবন, রক্তাক্ত প্রেম, তাঁর রচনা-পরিচিতি প্রসঙ্গে। কবি নয়নচাঁদ খুব সুন্দরভাবে কয়েকটি স্তরপরম্পরায় চন্দ্রাবতীর জীবনবৃত্তকে পাঠকসমাজে উপস্থাপন করেছেন। চন্দ্রাবতী হলেন মনসামঙ্গল রচয়িতা প্রখ্যাত দ্বিজবংশী দাসের কন্যা। চন্দ্রাবতীর জননীর নাম সুলোচনা। তাঁর নিবাস ‘চাইর কোনা পুস্কুনির পারে’ ‘চম্পানাগেশ্বর’ শোভিত অঞ্চলে অর্থাত্ কিশোরগঞ্জ জেলার পাতুয়ারী গ্রামে। চন্দ্রাবতীর বাল্যজীবনে প্রেম এসেছিল। এ বয়সেই চন্দ্রাবতীর সঙ্গে জয়ানন্দের প্রণয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়। নয়নচাঁদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, জয়ানন্দ ছিলেন ব্রাহ্মণসন্তান। দুজনের মধ্যকার সম্পর্ক সফল পরিণতির দিকেই এগোয়। পিতা দ্বিজবংশীর সম্মতিতেই দুজনের বিয়ে স্থির হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ বিয়ে প্রস্তুতি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপস্থিত, সেই সময়ে জয়ানন্দের সঙ্গে আসমানী নামের এক মুসলমান কন্যার সম্পর্ক তৈরি হয়। জয়ানন্দ ধর্ম পরিবর্তন করে আসমানীকে বিয়ে করলে প্রতীক্ষারতা চন্দ্রাবতী আশাহত হন।

জয়ানন্দের এ বিশ্বাসঘাতকতায় চন্দ্রাবতী যেমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, তেমনি পিতা দ্বিজবংশীও হয়ে ওঠেন দুঃখ-জর্জরিত। চন্দ্রাবতী এ মর্মান্তিক ঘটনায় আক্ষরিক অর্থেই ‘পাষাণী’ হয়ে উঠলেও নিজস্ব ধর্মাচরণের পথ থেকে কিন্তু বিচ্যুত হননি। বরং এ আঘাত তাঁর ধর্মাচরণকে আরও সুদৃঢ় করেছে। এ ঘটনার আঘাতে চন্দ্রাবতী আর বিয়ে করতে রাজি হননি। পুরুষ প্রতারিত অবিবাহিত চন্দ্রাবতীর জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক খাতে প্রবাহিত হয়। দ্বিজবংশীর আদেশেই চন্দ্রাবতী শিবপূজা ও রামায়ণ রচনাকেই জীবনের অবলম্বন হিসেবে বেছে নেন। ঘটনাচক্রে শোকসন্তপ্ত জয়ানন্দ তার ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসতে চায় চন্দ্রাবতীর কাছে। কিন্তু মুসলমান রমণীকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বেছে নেয়া এ ধর্মান্তরিত জয়ানন্দকে চন্দ্রাবতী মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। নয়নচাঁদ জানিয়েছেন, বৈশাখ মাসে একদিন জয়ানন্দ চন্দ্রাবতীর সাক্ষাত্প্রার্থী হয়ে একটি পত্র চন্দ্রাবতীর কাছে রেখে যায়। সে চিঠি ছিল ভুল কৃতকর্মের স্বীকারোক্তিতে পূর্ণ। সে পত্রপাঠে চন্দ্রাবতী জয়ানন্দের প্রতি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও পিতা দ্বিজবংশীর পরামর্শে নিজের মনকে পুনরায় শক্ত করে তোলেন তিনি। শোকসন্তপ্ত জয়ানন্দ দ্বিতীয়বার চন্দ্রাবতীর সাক্ষাতে এলেও বিফল হয়। কেননা মন্দিরে ঈশ্বর আরাধনায় রত তখন চন্দ্রাবতী। চন্দ্রাবতীর দর্শনে বিফল জয়ানন্দ শক্তিশেলের ব্যথা বুকে নিয়ে আত্মহননের পথই বেছে নেয় শেষ পর্যন্ত। জয়ানন্দের দ্বিতীয়বার মন্দিরে আসার চিহ্ন প্রত্যক্ষ করে ধর্মনিষ্ঠ চন্দ্রাবতীর মনে হয়, সেই বিধর্মীর স্পর্শে মন্দির অপবিত্র হয়েছে। তাই নদীর জলে স্নানাদি তর্পণ করতে গেলে চন্দ্রাবতী প্রত্যক্ষ করেন সেই মর্মান্তিক দৃশ্য— ‘একেলা জলের ঘাটে সঙ্গে নাহি কেহ।/ জলের উপরে ভাসে জয়ানন্দের দেহ ’ এই অসহ আঘাতই চন্দ্রাবতীকে ‘উমেদাকামিনী’ অর্থাত্ পাগল, উন্মত্ত করে তোলে। জনশ্রুতিতে মেলে, এ ঘটনার পর কবি চন্দ্রাবতী খুব বেশিদিন জীবিত ছিলেন না।

এবার তাকানো যাক চন্দ্রাবতীর সৃষ্টিকর্মের দিকে। মধ্যযুগের পটভূমিতে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের কারণে চন্দ্রাবতী রচিত ‘রামায়ণ’ পাঠকসমাজে আলোচিত হলেও, তাঁর অন্য দুটি গীতিকার গুরুত্বও কম নয়। ‘মলুয়া’ কাব্যে চন্দ্রাবতী নারীর সংগ্রামশীল জীবনকে চিত্রিত করেছেন। মলুয়া চরিত্রটিকে তিনি এঁকেছেন রামায়ণের সীতা ও মনসামঙ্গলের বেহুলা চরিত্রের আদলে। কাজীর প্রলোভনকে মলুয়া যেভাবে ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাতে তার তেজস্বিতার উত্কৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায়। মলুয়ার আরেকটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, স্বামী ও গৃহের প্রতি তার একনিষ্ঠ ভক্তি। ধনী ভাইদের সনির্বন্ধ অনুরোধ সত্ত্বেও সে স্বামীর ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি যেতে রাজি হয়নি। স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেছে, তবু সে স্বামীর ঘর ছাড়েনি, দাসীর কাজ করে সেখানে পড়ে থেকেছে। শেষ পর্যন্ত মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে না পেরে সতী মলুয়া এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। ‘মলুয়া’ পালার শেষ অংশের কাব্যসৌন্দর্যও অতুলনীয়। আত্মবিসর্জনের লক্ষ্যে মলুয়ার নৌকা ডুবিয়ে অতল জলে হারিয়ে যাওয়ার বিবরণ চন্দ্রাবতীর হাতে পেয়েছে প্রাণস্পর্শী ভাষা—

উঠুক উঠুক উঠুক জল ডুবুক ভাঙা নাও।

মলুয়ারে রাইখ্যা তোমরা আপন ঘরে যাও …

ডুবুক ডুবুক ডুবুক নাও আর বা কত দূর।

ডুইব্যা দেখি কত দূরে আছে পাতালপুর …

পুবেতে গর্জিত দেয়া ছুটল বিষম বাও।

কইবা গেল সুন্দর কন্যা মন-পবনের নাও

‘দস্যু কেনারামের পালা’ চন্দ্রাবতীর আরেক উল্লেখযোগ্য রচনা। ‘মৈমনসিং গীতিকা’র মধ্যে কেবল এ পালাটিই প্রণয় সংস্পর্শশূন্য ও নারী ভূমিকা বর্জিত। চন্দ্রাবতীর পিতা দ্বিজবংশী দাস কর্তৃক দস্যু কেনারামের সংশোধনের কাহিনী এ পালায় বর্ণিত হয়েছে। এ কাহিনী দস্যু রত্নাকর (বাল্মীকি), দস্যু অঙ্গুলিমাল ও পাপী জগাই-মাধাইয়ের সংশোধনের কাহিনীকে স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু রত্নাকর, অঙ্গুলিমাল ও জগাই-মাধাইকে সংশোধন করেছেন মহাপুরুষেরা— সযত্ন প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে তাদের পাপের সম্বন্ধে অবহিত করিয়ে। পক্ষান্তরে কেনারামের পরিবর্তন এনেছে দ্বিজবংশী দাসের ব্যক্তিত্ব ও অপূর্ব গান করার শক্তি, যে গান তিনি কেনারামকে শুনিয়েছেন, সেই মনসামঙ্গলের মধ্যে এমন কোনো তত্ত্ব নেই, যা কেনারামকে তার পাপ সম্বন্ধে অবহিত করতে সক্ষম। কাজেই কেনারামের পরিবর্তন যেন একজন জাদুকরের কীর্তি। এ পালায় দুটি চরিত্র— দ্বিজবংশী দাস ও কেনারাম। দ্বিজবংশী আদর্শায়িত চরিত্র, মহান ব্যক্তি। দস্যু কেনারামকে তিনি শুধু সংশোধিত করেননি, তার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে তাকে আত্মহত্যা থেকে বিরত করেছেন। কবি চন্দ্রাবতী কেনারামের চরিত্র ও তার মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন চিত্রণে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সংগীত ও মাঙ্গলিক পথের আহ্বান সমস্ত অসাধ্যকে যে সাধন করতে পারে, ‘দস্যু কেনারামের পালা’য় তা-ই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। দ্বিজবংশী দাসের নির্লোভ ও নিঃশঙ্কচিত্তের পরিচয় যেমন এ কাব্যে সত্য-সাধকের ভাস্বর মূর্তিতে চিত্রিত, তেমনি দ্বন্দ্বরক্তিম বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের উদ্বর্তনের সম্ভাবনাকে বিজয়সূচিত করেছে এককালের দস্যু কেনারাম।

চন্দ্রাবতীর সবচেয়ে আলোচিত সৃষ্টি ‘রামায়ণ’। রাম নয়, এ কাব্যের কেন্দ্রে স্থাপিত হয়েছে সীতা। চন্দ্রাবতীর বিশেষত্ব এখানেই যে, তিনি রামায়ণের কাহিনীকে দেখেছেন নারীর চোখ দিয়ে এবং লিখেছেন সীতার মর্মসহোদরার একাত্মতা নিয়ে। জন্মমুহূর্তের মতো বিয়েমুহূর্তেও দুঃখ গ্রাস করেছে সীতাকে। বিয়ের অব্যবহিতপরই কৈকেয়ীর চক্রান্তে রামের সঙ্গে বনবাসজীবনে প্রবেশ করতে হয়েছে সীতাকে। রাবণ অপহরণ করেছে সীতাকে। রাবণের হাত থেকে রাম সীতাকে মুক্ত করেছে দীর্ঘ এক বছর পর। অযোধ্যায় ফিরে এসে রাম-সীতা পুনর্বার সুখেই দাম্পত্য জীবন যাপন করতে শুরু করেছে, কিন্তু কুকুয়ার চক্রান্তে আবার দুঃখ ভরিয়ে দিয়েছে সীতার জীবন। সীতার আঁকা রাবণের ছবি রামকে দেখিয়ে সীতার প্রতি রামকে সন্দেহপরায়ণ করে তোলে কুকুয়া। এর ফলস্বরূপ সন্দেহপ্রবণ রাম সীতাকে পরিত্যাগ করে। পুনর্বার রাম তাকে বনবাসে পাঠায়। বাল্মীকির আশ্রম হয় অভাগিনী সীতার ঠিকানা। এভাবে সমগ্র রামায়ণজুড়ে কবি চন্দ্রাবতী গড়ে তুলেছেন সীতার দুঃখময় জীবনবৃত্তটি।

সেখানে শুধুই স্থান পেয়েছে সীতার প্রতি রাবণ, রাম— একাধিক পুরুষের অত্যাচার-অবিচার। কিন্তু কবি অদ্ভুত রকমভাবে এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সীতাকে শান্ত, নিরুত্তাপ করেই চিত্রিত করেছেন। চন্দ্রাবতীর সীতা বারবার বলেছে, ‘না জানি কে পিতা-মাতা গো, কে গর্ভসোদর ভাই।/ সোতের শেওলা আমি গো, ঘাটে ঘাটে ভাইস্যা বেড়াই ’

আগেই বলা হয়েছে, জনমদুঃখিনী সীতার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে কবি এ রামায়ণ রচনা করেছেন। তাই কখনো কখনো তিনি রামের কঠোর সমালোচকও হয়ে উঠেছেন, ‘চন্দ্রাবতী কহে, রাম গো তোমার বুদ্ধি হইল নাশ।’ তাঁর সমস্ত সহানুভূতির ধারা আবর্তিত হয়েছে সীতাকে কেন্দ্র করেই, ‘সীতার বারোমাসি কথা গো, দুঃখের ভারতী।/ বারো মাসের দুঃখের কথা গো, ভণে চন্দ্রাবতী ’

‘বাংলার লোকসাহিত্য’ গ্রন্থে আশুতোষ ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন, ‘মধ্যযুগের সাহিত্যে, বিশেষত মঙ্গলকাব্যে, ধর্ম-চিন্তাচ্ছন্নতা প্রবল থাকায়, সেখানে ব্যক্তিজীবনের স্পন্দন আছে, কিন্তু ব্যক্তিত্বের জাগরণ নেই, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু বিবেচিত হওয়া ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যচিন্তা বিকাশের অবকাশ পায়নি। কিন্তু মৈমনসিং গীতিকার রচয়িতাগণ ধর্মবুদ্ধি দ্বারা তাড়িত না হওয়ায় এখানে ব্যক্তিত্বের জাগরণ স্পষ্ট। স্মরণীয় যে, গীতিকাসমূহে ধর্ম আছে, ধর্মকৃত্য আছে, নেই শুধু ধর্মাচ্ছন্নতা। ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যচেতনার উন্মেষ ও বিকাশের ফলে ব্যক্তিজীবন-আশ্রয়ী নীতিবোধের বিকাশও মৈমনসিং গীতিকাসমূহে পরিলক্ষিত হয়।’ মৈমনসিং গীতিকার স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত এ লক্ষণের প্রকাশ চন্দ্রাবতীর কাব্যেও সুস্পষ্ট। বিশেষত ‘মলুয়া’ কাব্যে চন্দ্রাবতী মলুয়া চরিত্রের মাধ্যমে বিধর্মী শাসকগোষ্ঠীর লালসা ও ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রতিপক্ষে সোচ্চার ভাষ্য উপস্থাপন করেছেন। মলুয়ার আত্মবিসর্জন এখানে গোষ্ঠীচেতনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিসত্তার প্রত্যাখ্যান ও প্রতিবাদের প্রতীকে মুদ্রিত। ‘দস্যু কেনারামের পালা’য় মনসা ভাসানের গান শুনে দস্যু কেনারামের শুভবোধে উদ্বর্তনের পেছনে ধর্মীয় প্রণোদনা থাকলেও, ব্যক্তি দ্বিজবংশী দাসের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও নির্লোভ মানসিকতাই এর সক্রিয় কারণ। এভাবে ‘দস্যু কেনারামের পালা’তেও চন্দ্রাবতী মানবমহিমাকেই উচ্চে স্থান দিয়েছেন। চন্দ্রাবতীর আরেক কাব্য ‘রামায়ণে’ও আমরা লক্ষ করি, ধর্মতন্ত্রে পুরুষাধিপত্যের বিরুদ্ধে চন্দ্রাবতীর বলিষ্ঠ অবস্থান। প্রচলিত ‘রামায়ণে’র রামকেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে সীতাকে কেন্দ্রে স্থাপন করে চন্দ্রাবতী বস্তুত রচনা করেছেন ‘সীতায়ন’। নিজের জীবনের লাঞ্ছিত, অবমানিত ও স্বেচ্ছানির্বাসনের দাহ তিনি সীতা চরিত্রেও খুঁজে পেয়েছেন। ফলে সীতার মর্মতাপকে তিনি নিজস্ব বেদনায় আর্দ্র করে ছড়িয়ে দিয়েছেন পাঠকের সামনে।

এভাবে মধ্যযুগের শক্তিমান কবি হিসেবে চন্দ্রাবতী তাঁর কাব্যগুলোয় প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রতিবাদী মানবিক স্বর ও নারীর প্রাতিস্বিক মূল্যবোধ। কিন্তু আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে, চন্দ্রাবতীর এ স্বাতন্ত্র্যিক মহিমা এখনো আমাদের সমালোচনা-সাহিত্য দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে চন্দ্রাবতী এখনো অনালোকিত, তাঁর সৃষ্টি এখনো অপরিচিত। তবে সম্প্রতি চন্দ্রাবতীকে নিয়ে পাঠকসমাজে যে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আশা করা যায়, মধ্যযুগের ‘একমাত্র নারী কবি’ আর মর্মন্তুদ এক জীবনের অধিকারী হিসেবেই কেবল চন্দ্রাবতী চিহ্নিত হবেন না, তাঁর সৃষ্টির শক্তিতেই তিনি সব উপেক্ষার কুয়াশা সরিয়ে চন্দ্রালোক ছড়াবেন। আগামীর পাঠক চিনবেন প্রকৃত চন্দ্রাবতীকে।

হিমেল বরকত

সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।। সৌজন্যে : বণিক বার্তা

আরো কিছু চন্দ্রাবতী :

চন্দ্রাবতী ষোড়শ শতাব্দীর কবি এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম বাঙালি মহিলা কবি৷ এই বিদূষী নারী অন্যান্য কাব্য ছাড়াও পিতার আদেশে বাংলা ভাষায় রামায়ণ রচনা করেছিলেন। পরবর্তীকালে, মৈমনসিংহ গীতিকার এক কবি নয়ানচাঁদ ঘোষ চন্দ্রাবতী চরিতকথা রচনা করেন।

জন্ম ও পরিবার

তাঁর পিতা মনসা মঙ্গল কাব্যের অন্যতম রচয়িতা বংশীদাস ভট্টাচার্য এবং মাতার নাম সুলোচনা/অঞ্জনা৷ তাঁর জন্ম ষোড়শ শতাব্দীতে। নিবাস অধুনা বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার পাতুয়ার/পাটোয়ারী গ্রামে৷ জীবনকাল ষোড়শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ। স্বরচিত রামায়ণের ভূমিকায় চন্দ্রাবতী আত্মপরিচয় দিয়েছেন:

“ধারাস্রোতে ফুলেশ্বরী নদী বহি যায়।
বসতি যাদবানন্দ করেন তথায়।।
ভট্টাচার্য্য বংশে জন্ম অঞ্জনা ঘরণী।
বাঁশের পাল্লায় তাল-পাতার ছাউনী।।
… … … ….. …. …… …… … …. …
বাড়াতে দারিদ্র-জ্বালা কষ্টের কাহিনী।
তার ঘরে জন্ম নিলা চন্দ্রা অভাগিনী।।
সদাই মনসা-পদ পূজি ভক্তিভরে।
চাল-কড়ি কিছু পাই মনসার বরে।।
… … … … … … …. … …. …. ….
শিব-শিবা বন্দি গাই ফুলেশ্বরী নদী।
যার জলে তৃষ্ণা দূর করি নিরবধি।।
বিধিমতে প্রণাম করি সকলের পায়।
পিতার আদেশে চন্দ্রা রামায়ণ গায়।।”

সাহিত্যকর্ম

মৈমনসিংহ গীতিকায় তাঁর নিজের রচিত ‘মলুয়া’ গীতিকাব্যে এবং তাঁর জীবনী অবলম্বনে পরবর্তী সময়কার কবি নয়ানচাঁদ ঘোষ রচিত ‘চন্দ্রাবতী’ পালায় তাঁর কথা পাওয়া যায়৷ তাঁর জীবনের ট্র্যাজেডি নিয়ে রচিত লোকগাঁথা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবিভক্ত ময়মনসিংহ জেলার মানুষের মুখে মুখে ফিরে এসেছে৷ তাঁর রচিত রামায়ণ কিছুকাল আগেও ময়মনসিংহ অঞ্চলের মেয়েরা বিবাহোপলক্ষে গান করত। চন্দ্রাবতী নিজের কাব্য ছাড়াও পিতা বংশীদাসের মনসামঙ্গল কাব্যের অনেকাংশ রচনা করেছিলেন।

চন্দ্রাবতীর রচিত কাব্যগুলি হল;

  • মলুয়া,
  • দস্যু কেনারামের পালা (মনসার ভাসান, রচনাকাল: ১৫৭৫ শকাব্দ),
  • রামায়ণ

ড. দীনেশচন্দ্র সেন ১৯৩২ সালে চন্দ্রাবতীর রামায়ণ প্রকাশ করেন। লৌকিক মানবিক ও কিছু মৌলিক উপাদান সংযোগের ফলে এই রামায়ণ কাব্যটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। দীনেশচন্দ্রের মতে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যের সীতা-সরমার কথোপকথনের অংশটি ‘চন্দ্রাবতীর রামায়ণ’ থেকে গ্রহণ করেছিলেন।

চন্দ্রাবতীর লোকগাঁথা

বাল্যকালে চন্দ্রাবতীর বন্ধু ও খেলার সাথী ছিলেন জয়চন্দ্র চক্রবর্তী নামের এক অনাথ বালক৷ ফুলেশ্বরী নদীর এপারে পাডুড়িয়া পল্লীতে চন্দ্রাবতীর বাস আর জয়চন্দ্রের নিবাস ওপারের সুন্ধা গ্রামে৷ জয়চন্দ্র তাঁর মাতুলগৃহে পালিত৷ দ্বিজ বংশীদাসের অনেক রচনায় এই দুজনার রচিত ছোট ছোট অনেক পদ রয়েছে৷ পুষ্পবনে শিবপূজার ফুল তোলার সময় চন্দ্রার সঙ্গে জয়চন্দ্রের পরিচয় ও সখ্যতা ঘটে। ক্র্রমশ কৈশোর উত্তীর্ণ হলে দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন বলে স্থির করেন। বিবাহের দিনও স্থির হয়৷ শাস্ত্রবিৎ পণ্ডিত জয়চন্দ্র ইতোমধ্যে অন্য এক রমনীর প্রেমে পড়ে যান৷ স্থানীয় মুসলমান শাসনকর্তা বা কাজীর মেয়ে আসমানীর অসামান্য রূপে মুগ্ধ হয়ে ব্রাহ্মণ জয়চন্দ্র আসমানীকে একাধিক প্রেমপত্র লেখেন৷ এই ত্রিকোণ প্রেমের ফলাফল হয় মারাত্মক৷

জয়চন্দ্রের সাথে চন্দ্রাবতীর প্রেমের কথা জেনেও আসমানী তার পিতাকে জানান তিনি জয়চন্দ্রকে বিবাহ করতে চান৷ কাজী জয়চন্দ্রকে বলপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে আসমানীর সঙ্গে তার বিবাহ দেন৷ ঘটনাটি ঘটে যেদিন জয়চন্দ্র ও চন্দ্রাবতীর বিবাহের দিন স্থির হয়েছিল সেই দিন৷ সেদিন সন্ধ্যাবেলা চন্দ্রাবতী বিবাহের সাজে পিত্রালয়ে বসে ছিলেন৷ তখনই সংবাদ পেলেন জয়চন্দ্র ধর্মান্তরিত হয়ে অন্যত্র বিবাহ করেছেন৷ ঘটনার আকস্মিকতায় চন্দ্রা হতভম্ব হয়ে পড়েন–

“না কাঁদে না হাসে চন্দ্রা নাহি কহে বাণী।
আছিল সুন্দরী কন্যা হইল পাষাণী।।
মনেতে ঢাকিয়া রাখে মনের আগুনে।
জানিতে না দেয় কন্যা জ্বলি মরে মনে।।”

এরপর শুরু হয় চন্দ্রাবতীর বিরহ-বিধুর জীবন৷ শোকবিহ্বলতা কাটাতে তিনি পিতার কাছে অনুমতি নেন যে সারা জীবন অবিবাহিত থেকে তিনি শিবের সাধনায় আত্মনিবেদন করবেন ৷ তাঁর পিতা তাঁর জন্য ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি শিব মন্দির নির্মাণ করিয়ে দেন৷ সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ শাস্ত্রজ্ঞানী চন্দ্রাবতীর কৈশোরকাল থেকেই ছিল ৷ তিনি বাকী জীবন বীতস্পৃহভাবে শান্তমনে শিবের উপাসনা ও সাহিত্যচর্চা করে কাটাবেন বলে স্থির করেন৷ ইতোমধ্যে বেশ কিছুকাল পরে জয়চন্দ্র বুঝতে পারেন যে, আসমানীর প্রতি তার টানটা ছিল মোহ মাত্র ৷ মনের থেকে তিনি চন্দ্রাবতীকেই প্রকৃত ভালবাসেন৷ অনুতপ্ত জয়চন্দ্র স্থির করেন যে চন্দ্রাবতীকে তাঁর মনের কথা জানাবেন৷ তিনি চন্দ্রাবতীকে একটি পত্র লিখে পাঠান,

“শুন রে প্রাণের চন্দ্রা তোমারে জানাই।
মনের আগুনে দেহ পুড়্যা হৈছে ছাই।।
………………… …………………….
শিশু কালের সঙ্গী তুমি যৌবন কালের মালা।
তোমারে দেখিতে মন হৈয়াছে উতলা।
………………… …………………….
ভাল নাহি বাস কন্যা এ পাপিষ্ঠ জনে।
জন্মের মতন হইলাম বিদায় ধরিয়া চরণে।।
একবার দেখিয়া তোমা ছাড়িব সংসার।
কপালে লিখেছে বিধি মরণ আমার।।”

পত্র পড়ে চন্দ্রাবতীর সংকল্পিত ব্রহ্মচর্য, অবিচলিত সংযম ও ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। অশ্রুসিক্ত বদনে তিনি পিতার কাছে বিধান চাইলেন। কন্যার মানসিক শিথিলতা মেটাতে বংশীদাস তাকে সান্ত্বনা দিলেন,

“তুমি যা লইয়াছ মাগো সেই কাজ কর।
অন্য চিন্তা মনে স্থান নাহি দিও আর।।”

জয়চন্দ্রকে পত্রদ্বারা নিষেধ করে চন্দ্রাবতী যোগাসনে বসে মনের সমস্ত অর্গল রুদ্ধ করলেন, তাঁর চোখের জল শুকিয়ে গেল। শিব-ধ্যানে আত্মহারা হয়ে তিনি সমস্ত জাগতিক জ্ঞান লুপ্ত হলেন। [১]

এক সন্ধ্যায় জয়চন্দ্র ও চন্দ্রাবতীর বিচ্ছেদ হয়েছিল; অপর সন্ধ্যায় সেই বিচ্ছেদ মুছে গিয়ে মিলন হবে দুজনার — এই আশায় জয়চন্দ্র রওনা দিলেন পাতুয়ার/পাটোয়ারী গ্রামে৷ জয়চন্দ্র যখন গন্তব্যস্থলে পৌঁছলেন তখন সূর্য্যাস্ত হয়ে গেছে, তখন দিন ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ৷ শিব মন্দিরের ভেতর দ্বার রুদ্ধ করে সন্ধ্যারতি ও তপজপে নিজেকে নিবদ্ধ করেছেন চন্দ্রাবতী৷ জয়চন্দ্র মন্দিরের দ্বারে এসে কয়েকবার ডাকলেন চন্দ্রাবতীকে৷ কিন্তু দ্বার রুদ্ধ থাকায় এবং একাগ্রমনে ধ্যানে নিমগ্ন থাকায় সেই শব্দ প্রবেশ করল না চন্দ্রাবতীর কানে৷ ব্যর্থ প্রেমিক জয়চন্দ্র তখন লালবর্ণের সন্ধ্যামালতী ফুল দিয়ে মন্দিরের দ্বারে চারছত্রের একটি পদে চন্দ্রাবতী ও ধরাধামকে চিরবিদায় জানিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করেন৷

“শৈশব কালের সঙ্গী তুমি যৌবন কালের সাথী।
অপরাধ ক্ষমা কর তুমি চন্দ্রাবতী।।
পাপিষ্ঠ জানিয়া মোরে না হইলে সম্মত।
বিদায় মাগী চন্দ্রাবতী জনমের মত।।”

অনেক পরে মন্দির থেকে বেরিয়ে চন্দ্রাবতী বুঝতে পারেন যে দেবালয় কলুষিত হয়েছে৷ দ্বার পরিষ্কার করার জন্য তিনি কলসী কাঁখে জল আনতে যান পার্শ্ববর্তী ফুলেশ্বরী (স্থানীয় নাম ফুলিয়া) নদীতে৷ ঘাটে পৌঁছেই চন্দ্রাবতী বুঝলেন সব শেষ৷ ফুলেশ্বরীর জলে নিজেকে নিমগ্ন করে প্রাণত্যাগ করেছেন জয়চন্দ্র৷ প্রাণহীন দেহ ভাসছে ফুলেশ্বরীর জলে৷ এই অবস্থায় নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না চন্দ্রাবতী৷ তিনিও অচিরে প্রেমিকের সাথে পরলোকে চিরমিলনের কামনায় ফুলেশ্বরীর জলে ডুবে প্রাণত্যাগ করেন।

“একেলা জলের ঘাটে সঙ্গে নাই কেহ।
জলের উপরে ভাসে জয়চন্দ্রের দেহ।।
দেখিতে সুন্দর কুমার চাঁদের সমান।
ঢেউ-এর উপরে ভাসে পৌর্ণ মাসী চাঁদ।।
আঁখিতে পলক নাই! মুখে নাই বাণী।
পারেতে দাঁড়াইয়া দেখে উন্মত্তা কামিনী।।”

জয়চন্দ্রের গ্রাম সুন্ধা খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ তবে ইতিহাসের স্মৃতি বিজড়িত পাতুয়ার/পাটোয়ারী গ্রাম আজও আছে৷ কিশোরগঞ্জ শহর থেকে উত্তর-পূর্ব্ব দিকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে৷ আর আছে ফুলেশ্বরী নদীর ধারে চন্দ্রাবতীর পূজিত শিব মন্দির৷

বাংলা উইকিপিডিয়ার সৌজন্যে 

বাংলার প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর মন্দির

ফাহমিদুল হান্নান রূপক

 চন্দ্রাবতীর মন্দির চন্দ্রাবতীর মন্দির
কবি চন্দ্রাবতীর নাম শুনি সেই ছোটবেলাতেই। আমাদের কিশোরগঞ্জে “শুরূক” নামে একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা চালু ছিল (এখন বন্ধ)। আমার জীবনের প্রথম লেখা এই পত্রিকাতেই ছাপা হয়েছিল। যেই সংখ্যায় আমার লেখাটি ছাপা হয় সেই সংখ্যাতেই চন্দ্রাবতীর উপর একটা প্রবন্ধও ছাপা হয়েছিল। চন্দ্রাবতীর সাথে সেই আমার প্রথম পরিচয়।তারপর অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ যতই বেড়েছে, চন্দ্রাবতীর প্রতি আগ্রহও ততই বেড়েছে। চন্দ্রাবতীর লেখা কবিতা, চন্দ্রাবতীকে নিয়ে লেখা কবিতা, চন্দ্রাবতীর রামায়নের বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ পড়েছি। চন্দ্রাবতীকে নিয়ে রচিত যাত্রাপালা আর নাটক দেখেছি। সময়ের সাথে সাথে চন্দ্রাবতী আমার মনকে আন্দোলিত করেছে, তাঁর ব্যক্তিত্ব আমাকে আকর্ষণ করেছে, তাঁর ট্র্যাজিক প্রেমের অমর কাহিনী আমার মনকে বিষণ্ণ করেছে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় তাঁর সমকালীন চিন্তাধারা আমাকে বিস্মিত করেছে। লাইলি-মজনুর প্রেম কাহিনী আমরা জানি, চন্দ্রাবতী-জয়ানন্দের প্রেম কাহিনী কয়জনে জানি? আমার নিজের জেলাতেই ছিল তাঁর নিবাস। তাই মনের ভিতর তাগিদ অনুভব করছি তাকে নিয়ে লিখবার। সবাইকে নিমন্ত্রণ জানাচ্ছি ইতিহাসের এক অনুচ্চারিত সময়ে ভ্রমণ করবার।বলা হয়ে থাকে চন্দ্রাবতী বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি। সত্যিই কি তাই? বেশিরভাগ ইতিহাসবিদই চন্দ্রাবতীকে প্রথম বাঙালি মহিলা কবি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন। কিছু বিরুদ্ধমতও যে নেই তা নয়। কারও কারও মতে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি খনা, দ্বিতীয় কবি রামী বা রজকিনী, তৃতীয় মাধবী এবং চতুর্থ কবি চন্দ্রাবতী। প্রথম মহিলা কবি হিসাবে চন্দ্রাবতীর যে সম্মান, তা বাংলাদেশে। পুরো বাংলা সাহিত্যে তার অবস্থান চতুর্থ।খনা আমাদের কাছে পরিচিত খনা’র বচনের জন্য। তাঁর কাব্য জীবনের সময়কাল নিয়ে সন্দেহ আছে। রামী বা রজকিনী এবং মাধবী সত্যি সত্যি ছিলেন কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কবি চন্ডিদাসের নিষ্কামজ প্রেমের প্রেমিকা হিসাবে বিখ্যাত এই রামী ধোপানি। এই রজকবালা রামী একজন কবি ছিলেন বলে কিছু আলামত পাওয়া যায়। তবে, এগুলো কোনোটা নিরংকুশ সন্দেহ দূর করে পারে না তাঁর কবি হিসাবে অস্তিত্ব সম্পর্কে। আর তাছাড়া বাংলা সাহিত্যে এতজন চণ্ডিদাস আছে যে, ঠিক কোন চণ্ডিদাসের সাথে তিনি সম্পর্কিত ছিলেন সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় না। মাধবীর ব্যাপারেও বিস্তারিত কিছু জানা যায় নি। সে কারণেই চন্দ্রাবতীকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবির স্বীকৃতি দিতে বহু লোকেই দ্বিধাহীন, সংকোচশীতলতাবিহীন । চন্দ্রাবতী শুধু প্রথম মহিলা কবিই নন, সৃষ্টির মান এবং পরিমাণের দিক দিয়ে মধ্য যুগের সেরা মহিলা কবিও তিনিই।

চন্দ্রাবতীর বাবাও ছিলেন একজন বিখ্যাত কবি। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন পদ্মপুরাণ এবং মনসামঙ্গলের কবি তিনি, কবি দ্বিজবংশী বা বংশীবদন। তিনি ভাসান গানের দল নিয়ে গান গেয়ে বেড়াতেন। সুকুমার সেন তাঁর বাঙ্গালা সাহিত্যের কথায় লিখেছেন,

পূর্ববঙ্গে রচিত বিস্তর মনসামঙ্গল কাব্য পাওয়া গিয়াছে। সে সবগুলির মধ্যে বংশীবদনের কাব্যই শ্রেষ্ঠ। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত হইয়াও বংশীবদন কোথাও অযথা পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করিতে চেষ্টা করেন নাই। অপরদিকে, ইহার কাব্য গ্রাম্যতা দোষ হইতে একেবারে মুক্ত।

দ্বিজ বংশীদাস কিশোরগঞ্জ জেলার মাইজখাপন ইউনিয়নের খরস্রোতা ফুলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী পাতুয়ারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর লেখা মনসামঙ্গল ১৫৭৫ সালের দিকে শেষ হয়। কথিত আছে যে, মনসামঙ্গল রচনায় বংশীবদন চন্দ্রাবতীর সাহায্য পেয়েছিলেন। মনসামঙ্গল রচনার সময়ে চন্দ্রাবতীর বয়স কমপক্ষে পঁচিশ ছিল। সেই হিসাবে তিনি ১৫৫০ সালের দিকে জন্মেছিলেন বলে অনুমান করা যায়।

চন্দ্রাবতীর জীবনের ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের একটি উৎসের উপরই নির্ভর করতে হয়। সেটি হচ্ছে ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ শ্রী নয়ানচাঁদ ঘোষ রচিত ‘চন্দ্রাবতী পালা’। এই পালাতেই চন্দ্রাবতীর জীবনের করুণ ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই পালাটিই বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের চন্দ্রাবতীর জীবনীর তথ্যভিত্তিক লিখিত প্রামাণ্য দলিল। চন্দ্রাবতীর জন্মকথা বর্ণিত হয়েছে এইভাবে-

ধারাস্রোতে ফুলেশ্বরী নদী বহি যায়।

বসতি যাদবানন্দ করেন তথায়।।

ভট্টাচার্য্য বংশে জন্ম, অঞ্জনা ঘরণী।

বাঁশের পাল্লায় তালপাতার ছাউনি।।

ঘট বসাইয়া সদা পূজে মনসায়।

কোপ করি সেই হেতু লক্ষ্মী ছেড়ে যায়।।

দ্বিজবংশী পুত্র হৈল মনসার বরে।

ভাসান গাইয়া যিনি বিখ্যাত সংসারে।।

ঘরে নাই ধান-চাল, চালে নাই ছানি।

আকর ভেদিয়া পড়ে উচ্ছিলার পানি।।

ভাসান গাইয়া পিতা বেড়ান নগরে।

চাল-কড়ি যাহা পান আনি দেন ঘরে।।

বাড়ীতে দরিদ্র জালা কষ্টের কাহিনী।

তাঁর ঘরে জন্ম নিলা চন্দ্রা অভাগিনী।।

চন্দ্রাবতী নিজেকে অভাগিনী বলতেই পারেন। তাঁর জীবনের ট্র্যাজেডি গ্রিক পুরাণের ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়। রোম্যান্টিক মনের অধিকারী চন্দ্রাবতীর বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া প্রেমের বিয়োগান্তক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায় ‘চন্দ্রাবতী পালা’র ১২ টি অধ্যায়ের ৩৫৪ টি ছত্রে। নয়ানচাঁদ ঘোষের বর্ণনায় আছে,

ফুলেশ্বর নদীর তীর ঘেষা ছোট্ট পাতোয়াইর গ্রাম, সেই গ্রামে ছিল চন্দ্রাবতী নামের অপরূপ রূপসী এক বালিকা। বালিকা প্রতিদিন পুকুরের পাড়ে যেতো ফুল তুলতে, সেখানে একদিন তার সাথে দেখা হয়ে যায় জয়ানন্দ নামের এক কিশোরের। চন্দ্রাবতীর সঙ্গে বাল্যসখা জয়ানন্দের বন্ধুত্ব গভীর প্রেমে পরিণত হয়।

জয়ানন্দ নিজেও কবি ছিলেন। দ্বিজবংশী দাসের পদ্মপুরাণে চন্দ্রাবতী ও জয়ানন্দ দুইজনের কবিতাই রয়েছে। দুই পরিবারের সম্মতিতে জয়ানন্দ ও চন্দ্রাবতীর বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু এরই মাঝে ঘটে যায় এক নাটকীয় ঘটনা। জয়ানন্দ প্রেমে পড়ে আসমানি (মতান্তরে কমলা) নামের এক মুসলমান মেয়ের। যে রাতে চন্দ্রাবতীকে জয়ানন্দের বিয়ে করবার কথা, সেই দিনই জয়ানন্দ ধর্মত্যাগ করে আসমানিকে বিয়ে করে।

জয়ানন্দের এই হঠকারী আচরণ বিশাল এক আঘাত হয়ে আসে চন্দ্রাবতীর জন্য। অল্প বয়সের কোমল হৃদয় ভেঙে খান খান হয়ে যায় তাঁর। এই আঘাত সামলাতে শিবপূজায় নিজেকে উজাড় করে দেন তিনি। বাবার কাছে দুটো প্রার্থনা জানান। ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি শিবমন্দির গড়ে দেওয়া এবং আজীবন কুমারী থাকার বাসনা। কন্যাবৎসল পিতা আদরের কন্যার দুটো আবদারই মেনে নেন।

অনুমতি দিয়া পিতা কয় কন্যার স্থানে

শিব পূজা কর আর লেখ রামায়ণে।

কিছুকাল পরে মোহ কেটে গেলে অনুতপ্ত জয়ানন্দ পুনরায় ফিরে আসে চন্দ্রাবতীর কাছে। তখন চরাচরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ করে চন্দ্রাবতী সন্ধ্যা আরতি এবং শিবের পূজায় মগ্ন। রুদ্ধদ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে জয়ানন্দ বারবার চন্দ্রাবতীকে নাম ধরে ডেকেও সাড়া পায় না। এই নীরবতাকে চন্দ্রাবতীর প্রত্যাখ্যানের ভাষা মনে করে ব্যর্থমনোরথ জয়ানন্দ লাল রঙের সন্ধ্যামালতি ফুল দিয়ে মন্দিরের দরোজায় ৪ ছত্রের একটি পদ লিখে সে স্থান ত্যাগ করে –

শৈশবকালের সঙ্গী তুমি যৌবনকালের সাথী

অপরাধ ক্ষমা কর তুমি চন্দ্রাবতী

পাপিষ্ঠ জানিয়ো মোরে না হইল সম্মত।

বিদায় মাগি চন্দ্রাবতী জনমের মতো।

পূজা শেষে মন্দিরের দরোজা খুলে চন্দ্রাবতী লেখাটি দেখতে পান। মন্দির অপবিত্র হয়েছে ভেবে মন্দির গাত্রে উৎকীর্ণ সে লেখা মুছে ফেলার জন্য তিনি নদীর ঘাটে জল আনতে গিয়ে দেখেন নদীর জলে ভাসছে জয়ানন্দের মৃতদেহ। এই ভয়াবহ শোকে পাথর হয়ে যান চন্দ্রাবতী।

আঁখিতে পলক নাহি মুখে নাই সে বাণী।

পাড়েতে খাড়াইয়া দেখে উমেদা কামিনী।।

চন্দ্রাবতীর কাহিনী এখানেই শেষ। জনশ্রুতি আছে ওই সময় তিনি রামায়ন লিখছিলেন। এই কষ্টের কারণে চন্দ্রাবতী আর কিছুই লিখতে পারেন নি। যে কারণে রামায়ন অসমাপ্ত থেকে যায়।

চন্দ্রাবতীর রামায়ণ মূলত একটি পালাবদ্ধ গীত। এ রামায়ণ ৩ খন্ডে মোট ১৯টি অধ্যায়ে রচিত হয়েছে। প্রথম খন্ড, জন্মলীলা। এখন্ডে রয়েছে ৮ টি অধ্যায়। দ্বিতীয় খন্ডের কোন নামকরণ করেননি চন্দ্রাবতী। এই খন্ডের ২ টি অধ্যায়ে যথাক্রমে সীতার বনবাসপূর্ব জীবনের কাহিনী এবং বনবাসকালীন সময়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তৃতীয় খন্ডেরও কোন নামকরণ করেননি চন্দ্রাবতী। এই খন্ডের ৯ টি অধ্যায় যথাক্রমে সীতার বনবাসের সূচনা, সীতার বিরুদ্ধে কুকুয়ার চক্রান্ত, রামের কাছে সীতার বিরুদ্ধে কুকুয়ার মিথ্যা অভিযোগ, রাম কর্তৃক সীতাকে বনবাসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত, সীতার বনবাস, মুনি বাল্মীকির আশ্রয়ে সীতা কর্তৃক লব ও কুশের জন্মদান, সীতা হনুমানের সাক্ষাৎ, রাম হনুমানের প্রবেশের বর্ননা এবং সীতার অগ্নিপরীক্ষা বর্ণিত হয়েছে।

নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণ রচনা করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মূলে প্রথম কুঠারাঘাত করেন তিনি। সেই অর্থে চন্দ্রাবতী আমাদের সাহিত্যের প্রথম নারীবাদী কবি। বিষয়বস্তুর উপস্থাপনার গুণে চন্দ্রাবতীর এই রামায়ন আমাদের চমকে দেয়। কারণ, তাঁর রচনায় সীতা চরিত্রটি প্রাধান্য পেয়ে মুখ্য চরিত্রে পরিণত হয়েছে যার পাশে রাম চরিত্রটি পুরোপুরি ম্লান। সীতার মানসিকতাকে তিনি এক কালজয়ী চিন্তার আলোকে সুনিপুণভাবে ব্যাখা করেছেন, যেখানে নারী কেবল ব্যক্তি নয়, ব্যক্তিত্ব। পুরাণের খোলস থেকে বের করে সীতাকে তিনি নবজন্ম দিয়েছেন। সীতা এখানে দেবী নন, মানবী। সীতা চরিত্র উপস্থাপনের এই নবরীতি এবং নির্মানে আধুনিক ভাবনার মধ্য দিয়ে আমরা যে চন্দ্রাবতীকে পাই তিনি মূলত নারীবাদের প্রবক্তা। চন্দ্রাবতীর রামায়ণকে তাই সীতায়ন বললেও খুব একটা ভুল হবে না।

চন্দ্রাবতীর মৃত্যু নিয়ে সবাই অবশ্য একমত নন। নয়ানচাঁদ নিজেও তাঁর চন্দ্রাবতী পালাগানে চন্দ্রাবতীর মৃত্যু নিয়ে কিছু বলেন নি। কারো কারো মতে নদীর ঘাটে মৃত অবস্থায় জলে জয়ানন্দের লাশ ভাসতে দেখে তীব্র অনুশোচনায় চন্দ্রাবতীও পরবর্তীতে ফুলেশ্বরী নদীর জলে ঝাঁপিয়ে জয়ানন্দের অনুগামী হন। উইকিপিডিয়াতেও এই বিষয়টিই লেখা আছে। আবার কারো মতে, জয়ানন্দের জলে ডুবে আত্মহত্যা বা মৃত্যুর কিছুদিন পরপরই শোকাভিভূত চন্দ্রাবতী মর্মান্তিক আঘাত প্রাপ্ত হয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন। দীনেশ্চন্দ্র সেন মৈমনসিংহ গীতিকার ভূমিকায় লিখেছেন, “প্রবাদ এই যে, প্রেমাহতা চন্দ্রা জয়চন্দ্রের শব দর্শন করার অল্পকাল পরেই হৃদরোগে লীলা সংবরণ করেন।“ ব্রজেন্দ্রকুমার দে তাঁর মঞ্চনাটক ‘কবি চন্দ্রাবতী’-তে দেখিয়েছেন যে, শোক এবং অপমান থেকে বাঁচার জন্য চন্দ্রাবতী নিজেই ফুলেশ্বরীর বুকে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন। আনুমানিক ১৬০০ সালে চন্দ্রাবতী মৃত্যুবরণ করেন।

চন্দ্রাবতী এবং তাঁর রচনাবলীকে লোকগাথার স্তূপ থেকে উদ্ধার করে কয়েকশ বছরের ধুলোবালি সরিয়ে আধুনিক কালের পাঠক সমাজের কাছে নিয়ে আসেন প্রথমে ‘মৈমনসিংহ গীতিকার’ সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে। তিনি ১৩২০ বঙ্গাব্দে (১৯১৩) ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত ‘সৌরভ’ নামের একটি মাসিক পত্রিকার ফাল্গুন সংখ্যায় ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লেখেন। নিবন্ধটি পাঠ করে দীনেশচন্দ্র সেন কবি চন্দ্রাবতী সম্পর্কে প্রবল আগ্রহবোধ করেন। পরবর্তীকালে, দীনেশচন্দ্র সেন এবং চন্দ্রকুমার দে’র যৌথ প্রয়াসে লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা চন্দ্রাবতীর লেখা অসংখ্য গান এবং অবশিষ্ট সৃষ্টিকর্ম উদ্ধার হয়। রামায়ন ছাড়াও ‘মলুয়া’ এবং ‘দস্যু কেনারামের পালা’ চন্দ্রাবতীর বিস্ময়কর কাব্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছে।

ইতিহাসের পাঠ আপাতত শেষ। চলুন ইতিহাসের এই উজ্জ্বল অধ্যায়ের সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটিয়ে আসি।

চন্দ্রাবতীর মন্দির দেখতে হলে আপনাদের যেতে হবে কিশোরগঞ্জ শহর থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে পাতুয়ারী গ্রামে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই চমৎকার। শহরের শহীদি মসজিদের সামনে থেকে নীলগঞ্জ ইউনিয়ন এবং তাড়াইল থানার উদ্দেশ্যে কিছুক্ষণ পরপরই ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ছুটে যায়। যে কোন একটায় চড়ে বসুন। ২০ থেকে ২৫ মিনিটের মধ্যেই জালালপুর বাজারে চলে আসবেন। রাস্তার ধারের ছোট্ট এই বাজারটিতে নেমে চা খেয়ে নিতে পারেন। কিছুদূর এগোলেই পথের নির্দেশ চোখে পড়বে।

চন্দ্রাবতীর মন্দিরচন্দ্রাবতীর মন্দির

বাকি রাস্তাটা হেঁটেও যেতে পারেন, আবার রিক্সাও নিতে পারেন। হেঁটে যাওয়াই ভাল। গ্রামের ভিতরকার দিগন্তবিস্তৃত সবুজের মাঝখানের মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এমনিতেই আনমনা হয়ে পড়বেন। প্রায় ২০ মিনিট হাঁটবার পর দৃষ্টির সামনে উদ্ভাসিত হবে চন্দ্রাবতীর মন্দির। মন্দিরের সামনের পুকুর। সেই পুকুরে মন্দিরের প্রতিবিম্ব দেখে আপনি স্বাভাবিকভাবেই মুগ্ধ হবেন।

মূল মন্দিরের পাশেই ছোট আরেকটি মন্দির আছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী এই মন্দিরটি ছিল কবি দ্বিজবংশি দাসের।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পর্যটকদের জন্য একটা ছাউনিমত বানিয়ে দিয়েছে। শেষবার যখন চন্দ্রাবতীর মন্দিরে আসি তখন সম্ভবত অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ি। যশোরের এক ডাক্তার বন্ধু কিশোরগঞ্জ বেড়াতে এসেছিল। তাকে নিয়েই গিয়েছিলাম। প্রায় ১০ বছর পর আবার আসলাম। কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ল। যাত্রী ছাউনিটা আগে ছিল না, নতুন হয়েছে। একটা মুক্তমঞ্চও হয়েছে। মন্দিরের ময়লা রঙ পরিবর্তন হয়ে সাদা হয়েছে। আমেরিকান এম্বাসেডার আসার কথা ছিল। তাই নাকি এত গোছগাছ। ভালই হয়েছে। মন্দিরটা দেখতে ভালো লাগছিল।

মন্দিরের সামনেমন্দিরের সামনে

ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে মাঝে মাঝে ভিআইপি’রা বেড়াতে আসলে খারাপ হয় না। এই উসিলায় কিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান তো চলে।

একটু ঘুরে মন্দিরের দরোজার সামনে আসতেই শরীরটা শিরশির করে উঠল। এই দরোজা দিয়েই চন্দ্রাবতী মন্দিরে প্রবেশ করতেন। এই মন্দিরে বসেই তিনি রামায়ন লিখেছিলেন ভাবা যায়?

মন্দিরের দরোজামন্দিরের দরোজা

মন্দিরের সামনেই একটা পুকুর। তাহলে ময়মনসিংহ গীতিকায় বর্ণিত সেই প্রমত্তা ফুলেশ্বরী নদী কোথায়? মন্দিরের এক পূজারী উত্তরটা দিলেন। কালের বিবর্তনে নদী অনেকটা দূরে সরে গেছে। নদীর জায়গায় এখন পুকুর আর ধানক্ষেত।

চন্দ্রাবতীর স্মৃতির প্রতি সন্মান জানিয়ে মন্দিরের পাশেই একটা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এর বেশি কিছু করা হয়েছে কি না জানা নেই। অথচ বাংলার প্রথম মহিলা কবির গৌরবে তিনি গৌরবান্বিত।

সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়

চন্দ্রাবতীর নিবাস থেকে একটু ঘুরে আসা যাক। মন্দিরের কাছেই অনেক প্রাচীন একটা দোতলা বিল্ডিং।

প্রাচীন একটা দোতলা বিল্ডিংপ্রাচীন একটা দোতলা বিল্ডিং

অনেকের ধারণা এই বাড়ি দ্বিজবংশী দাসের। ধারণাটা ভুল। চন্দ্রাবতী পালাতেই উল্লেখ আছে দ্বিজবংশী অনেক গরীব ছিলেন।

 

দ্বিজবংশী পুত্র হৈল মনসার বরে।

ভাসান গাইয়া যিনি বিখ্যাত সংসারে।।

ঘরে নাই ধান-চাল, চালে নাই ছানি।

আকর ভেদিয়া পড়ে উচ্ছিলার পানি।।

ভাসান গাইয়া পিতা বেড়ান নগরে।

চাল-কড়ি যাহা পান আনি দেন ঘরে।।

অতএব গান গেয়ে যিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন, যার ঘরের চালে ছানি ছিল না সেই দ্বিজবংশী’র পক্ষে এই বাড়ি তৈরি করা সম্ভব ছিল না। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এই বাড়ি কার ছিল?

জমিদার নীলকণ্ঠ রায়জমিদার নীলকণ্ঠ রায়

বাড়িটি ছিল তৎকালীন জমিদার নীলকণ্ঠ রায়ের। তাঁর নামেই পাশের নীলগঞ্জ বাজারটির নামকরণ করা হয়েছে। এই নীলগঞ্জ-ই জনপ্রিয় উপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদের নাটকের ‘সুখি নীলগঞ্জ’ গ্রাম। দ্বিজবংশী ছিলেন নীলকণ্ঠ রায়ের পারিবারিক পুরোহিত। নীলকণ্ঠ রায়ের সহযোগিতাতেই চন্দ্রাবতীর মন্দির দুইটি নির্মিত হয়েছিল। জনশ্রুতি মতে নীলকণ্ঠ জমিদার তাঁর বাড়িতে দ্বিজবংশী-কে আশ্রয় দিয়েছিলেন। অতএব এই বাড়িতে চন্দ্রাবতী থাকতেন সেটা আমরা ধরে নিতে পারি। বাড়িটির নির্মাণশৈলী কিন্তু চমৎকার।

দেশ বিভাগের পরপরই নীলকণ্ঠ রায় সপরিবারে ভারতের আসাম চলে যান। তাঁর কোন খোঁজ আর পাওয়া যায় নি। বাড়িটিতে এখন দুইটি পরিবার বাস করে। অর্ধেক অংশে থাকে একটি হিন্দু পরিবার। তারা নিজেদেরকে নীলকণ্ঠ রায়ের বংশধর হিসাবে দাবী করে। অন্য অর্ধেক অংশে থাকে একটি মুসলমান পরিবার। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল বলে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে পারি নি। তবে এর আগেরবার যখন এসেছিলাম তখন বাড়ির ভিতরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ভিতরের দরোজা এবং দেয়ালগুলোর অঙ্গসজ্জা সত্যিই মনোমুগ্ধকর।

সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় ফিরে চললাম। গ্রামের ভিতর গ্রামের ভিতর দিয়ে যখন ফিরছিলাম তখন চারপাশে আঁধার নেমেছে। সেই আঁধার কেটে উঁকি দিয়েছিল পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের দিকে তাকিয়ে হঠাত করেই যেন ফিরে গিয়েছিলাম ১৬০০ সালের কোন এক পূর্ণিমার রাতে। যেখানে মন্দিরের পাশের পুকুরঘাটে বসে চন্দ্রাবতী জয়ানন্দের উদ্দেশ্যে গাইছে,

 

চাইরকোণা পুষ্কুনির পারে চম্পা নাগেশ্বর

ডাল ভাঙ্গ, পুষ্প তোল, কে তুমি নাগর?

আর জয়ানন্দ পুকুরের অপর পাশ থেক উত্তর দিচ্ছে –

মন্দিরের পাশের পুকুরমন্দিরের পাশের পুকুর

তোমারে দেখিব আমি নয়ন ভরিয়া।

তোমারে লইব আমি হৃদয়ে তুলিয়া।

উপর থেকে পূর্ণিমার চাঁদ তার সবটুকু সৌন্দর্য ঢেলে দিচ্ছে এই যুগলের প্রতি। সে তো জানে, এই অমর প্রেমের কাব্য এখানেই ফুরোবে না। বরং তা দ্বীপ জ্বালিয়ে যাবে পৃথিবীর সকল প্রেমিক যুগলের জন্য। বহুকাল পরেও দূরদেশ থেকে লোকেরা এসে দেখে যাবে অমর প্রেমের এই তীর্থস্থান।

তথ্যসূত্রঃ

১. কবি চন্দ্রাবতী এবং মধ্যযুগের লোকমানস

২. ইতিহাসে উপেক্ষিত এক নিঃসঙ্গ দ্রাবিড়া-কবি চন্দ্রাবতী

৩. চন্দ্রকান্তি এক কবি চন্দ্রাবতী

৪. চন্দ্রাবতী সংবাদ

৫. চন্দ্রাবতী (ষোড়শ শতক)

৬. চন্দ্রাবতী – উইকিপিডিয়া

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE