ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন ও এনজিও ফোরামের উদ্যোগে মানববর্জ্য পরিশোধন কেন্দ্র উদ্বোধন

58

অনিন্দ্যবাংলা ডেক্স :  ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন, অক্সফ্যাম এবং এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ যৌথভাবে এই প্রথমবারের মতো একটি কেন্দ্রীয় পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্লান্ট চালু করেছে। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের সার্বিক সহায়তায় নগরীর আকুয়ায় স্থাপিত এই প্লান্টটি দৈনিক ২০ হাজার লিটার মানব বর্জ্য পরিশোধনে সক্ষম। এই প্লান্টটি সার্বিকভাবে ১২৫,০০০ মানুষের বর্জ্য পরিশোধন করবে।

বৃহস্পতিবার (২১ মার্চ) নগরীর সিটি কর্পোরেশনের শহীদ সাহাবউদ্দিন মিলনায়তনে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্লান্ট উদ্বোধন আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর দীপঙ্কর দত্ত। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডীন ড. মো. জহির উদ্দিন, ময়মনসিংহ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন এর সভাপতিত্বে এবং এনজিও ফোরামের প্রকল্প সমন্বয়কারী সাওদা সুলতানা’র সঞ্চলনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সাইন্স এর হেড অফ ডিপার্টমেন্ট এম এ ফারুক, মাইক্রোবায়োলজি এন্ড হাইজিন বিভাগের প্রফেসর ড: আরিফুল ইসলাম, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যামিকেল ইঞ্জনিয়ারীং বিভাগের এসোসিয়েট প্রফেসর ড: মোঃ মোমিনুর রহমান, ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের মেডিকলে অফিসার এস.কে দেবনাথ, প্রধান প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম, পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ার সঞ্জন কুমার বড়–য়া,অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ আরবান ম্যানেজার আনিছুর রহমান, এনজিও ফোরাম অব পাবলিক হেলথ হেড অফ প্রোগ্রাম মোঃ রিজওয়ান আহমেদ প্রমুখ। এসময় মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদপ্তর কর্মকর্তা সাদিকুন নাহার, নাগরিক আন্দোলনের সাধারন সম্পাদক নুরুল আমিন কালাম, সাংবাদিক মীর গোলাম মোস্তফা, সিটি কপোরেশনের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা অসিম কুমার সাহা, সেনেটারী ইন্সপেক্টর দীপক মজুমদার সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ।
আলোচনা শেষে অতিথিদেরকে নিয়ে নগরীর আকুয়ায় স্থাপিত পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্টটি ফিতা কেটে উদ্বোধন করেন অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর দীপঙ্কর দত্ত।

আন্তর্জাতিক সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান এইড এবং জার্সি ওভারসিস এইড কমিশনের আর্থিক সহযোগীতায়, এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ অক্সফ্যাম ইন বাংলাদেশের সহায়তায় ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সাল থেকে পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন প্লান্ট বাস্তাবায়নের কাজ শুরু হয়। সিটি কর্পোরেশন এর বরাদ্দকৃত আকুয়ার ময়লাকান্দায় ৪০ শতাংশ জমির উপর “রেজিলিয়েন্ট, ইনক্লুসিভ এন্ড ইনোভেটিভ সিটি’স ইন বাংলাদেশ প্রকল্প” এর আওতায় এই পরিশোধন প্লান্টটি গতকাল আানুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলো। এটা করা হয়েছে যাতে করে নগরীর বিপুল পরিমান পয়ঃবর্জ্য যত্র-তত্র না ফেলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিশোধন করা যায়।

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় ৮ লক্ষ লোকের বসবাস। এই বিশাল জনসংখ্যা পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের ক্ষেত্রে স¤পূর্ণরূপে অন-সাইট স্যানিটেশন ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনকে প্রতিনিয়ত এই বিশাল পরিমান পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার কঠিন কাজটি মোকাবেলা করতে হয়। প্রকল্পের আওতাধীন ৫টি ওয়ার্ড পরিচালিত একটি জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত পয়ঃবর্জ্য প্রবাহচিত্রে দেখা যায় যে, এই ওয়ার্ডগুলোতে উৎপন্ন শতকরা মাত্র ২৩ ভাগ বর্জ্য নিরাপদ ভাবে জমা হয়। অবিশিষ্ট ৭৭ ভাগ অনিরাপদ ব্যবস্থাপনায় যেমন- উন্মুক্ত পুকুর, নর্দমা, নদী, রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড় ইত্যাদি স্থানে অপসারিত হয় যা পরিবেশ এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। এটি সিটি কর্পোরেশন এলাকার একটি খন্ড চিত্র হলেও সামগ্রীক চিত্রটিও একই ধরনের। এ অবস্থার এ ধরনের একটি প্লান্ট নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

অক্সফ্যামের কান্ট্রি ডিরেক্টর দীপঙ্কর দত্ত বলেন, “পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষের পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার সব বড় শহরের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিবেশবান্ধব প্লান্টটিনগরবাসীকে সুস্থ্য রাখবে, প্রতিদিন গড় ৫.৫ কিউবিক মিটার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যাবে এখানে- এটি আসলেই একটি বিরাট প্রক্রিয়া। আমি মনে করি সরকার অন্যান্য স্থানেও এই মডেলটি অনুসরন করতে পারে”।

প্লান্টটি মূলত তিনটি ধাপে বর্জ পরিশোধনের কাজ সম্পন্ন করবে। প্রথমে নগরীর বিভিন্ন বাসা-বাড়িসমুহে সেপটিক ট্যাংক ও পিট থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে পরিশোধন প্লান্টে নিয়ে এসে প্লান্টের ড্রাইয়িং বেডে ফেলা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ড্রায়িং বেড থেকে তরল বর্জ্য ফাইটোরেমিডেশন চেম্বারে যাবে। সেখানে পুনরায় পরিস্রাবন, বাম্পিভবন এবং প্রশ্বেদন প্রক্রিয়ায় পরিশোধিত হয়ে পলিশিং পন্ডে যাবে এবং চুড়ান্তভাবে পরিশোধনের পর জলীয় অংশ উন্মুক্ত জলাশয়ে মিশে যাবে। পরিশোধন প্লান্টে দুই ধরনের ড্রাইয়িং বেড রয়েছে। একটি প্লান্টেড ড্রাইয়িং বেড এবং অণ্যটি আন-প্লান্টেড ড্রাইয়িং বেড। প্লান্টেড ড্রাইয়িং বেডে একটি বিশেষ ধরনের প্ল্যান্ট (যেমন- কলাবাতি ইত্যাদি রোপন করা হয় যেগুলো পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এই বেড থেকে ডিসচার্জ- এর উপর নির্ভর করে ২ থেকে ৩ বছর পর পর পরিশোধিত শুস্ক বর্জ্য উত্তোলন করা যাবে। আন-প্লান্টেড ড্রাইয়িং বেডে পয়ঃবর্জ্য বালি ও পাথরের স্তরের মধ্য দিয়ে পরিস্রাবন এবং সূর্য-তাপ ব্যবহার করে পানি শূন্য করার মাধ্যমে প্রতি ১৫ দিনে একবার পরিশোধিত শুস্ক বর্জ্য উত্তোলন করা সম্ভব হবে। আন-প্লান্টেড ড্রাইয়িং বেড থেকে প্রাপ্ত শুস্ক পয়ঃবর্জ্য এবং পচনশীল কঠিন বর্জ্য (কিচেন ওয়েষ্ট) -এর ১:৩ অনুপাতে মিশ্রনের বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরন করে এই পরিশোধন প্ল্য্যান্ট -এর মাধ্যমে কো-কম্পোষ্ট উৎপাদন করা হবে যা কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এই কো-কম্পোষ্ট প্লান্টে বছরে আনুমানিক পয়ঃবর্জ্য-পরিশোধন প্লান্ট থেকে ১২৫ ঘনমিটার প্রাপ্ত শল্ক বর্জ্য ব্যবহারে পাশাপাশি আনুমানিক ২৫০ ঘন মিটার পচনশীল কঠিন বর্জ্য ব্যবহার হবে যা ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন এলাকার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর অবদান রাখবে।

এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ- এর হেড অফ প্রোগ্রাম রিজওয়ান আহদে এই প্লান্টটি সম্পর্কে বলে, এর সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে নগরীর মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা এবং এরই সাথে স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা বজায় রেখে রোগ সংক্রমন কমিয়ে আনা। পয়ঃবর্জ্যরে সঠিক পরিশোধন এবং নিরাপদ অপসারন পরিবেশ দুষন কমায় পাশাপাশি রোগ জীবানুর প্রাদুর্ভাব কমায়। নগরীর গনবসতিপূর্ন স্থানগুলোতে বর্জ্যরে সঠিক অপসারন করা খুবই জরুরী। এ ধরনের একটি প্লান্ট দেশের অন্যান্য স্থানের জন্য একটি মডেল হয়ে থাকবে বলে আমি মনে করি।