হাসপাতাল পরিদর্শনে মাশরাফির আচরণ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ !

224

অনিন্দ্যবাংলা : হাসপাতাল পরিদর্শনকালীন নড়াইল-২ আসনের এমপি মাশরাফি বিন মুর্তজার আচরণ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। কিছু মানুষ মাশরাফির পক্ষ নিলেও চিকিৎসক, লেখক, ফেসবুক এক্টিভিস্টসহ সাধারণ মানুষের বিশাল একটা অংশই এ ঘটনায়  ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হেমাটোলজি বিশেষজ্ঞ, ডা. গুলজার হোসেন উজ্জল তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, চিকিৎসকের সঙ্গে মাননীয় সংসদ সদস্য মাশরাফি বিন মুর্তজার অসৌজন্যমূলক আচরণ অনভিপ্রেত। চিকিৎসকের সঙ্গে তার ফোনালাপই প্রমাণ করে এই দেশে অফিসিয়াল ডেকোরাম বলে কিছু নেই।

একজন সরকারি কর্মকর্তার কর্তব্যে অবহেলার (আমি ধরেই নিচ্ছি ডাক্তার কর্তব্যে অবহেলা করেছেন) প্রতিক্রিয়ায় একজন জনপ্রতিনিধি তার অনুগত বাহিনী নিয়ে প্রকাশ্যে ভিডিও ক্যামেরা অন করে একজন প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সিনিয়র চিকিৎসকের সঙ্গে যে অসৌজন্যমূলক কথা বলেছেন, সেটা প্রমাণ করে এদেশে চিকিৎসকরা মূলত ‘গরিবের ভাউজ’।

চিকিৎসকের সঙ্গে যদি যাচ্ছেতাই ভাষায় কথা বলা যায়, তাহলে আমরা চিকিৎসকদের কাছে শিষ্টাচার আশা করি কিভাবে? একজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি চাইলে সহজেই এই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারতেন। আমরাও চাই, অপরাধ হয়ে থাকলে শাস্তি হোক।

বিভিন্ন সেবা খাতের সমস্যা নিয়ে জেলায় মাসিক মিটিং হয়৷ সেখানে যে কোনোভাবেই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে চার্জ করা যায়। তা না করে প্রকাশ্যে ভরা হাটে কাউকে অপদস্ত করা এক ধরণের দাম্ভিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

প্রতিটি মানুষেরই আত্মসম্মানবোধ আছে। তাই একজন দাগী অপরাধীকেও প্রকাশ্যে অপমান করার সুযোগ নেই।

লেখক ও সোশ্যাল মিডিয়া এক্টিভিস্ট রিফাত হাসান তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য দরকার ওষুধ ও স্বাস্থ্য-চিকিৎসা নীতিমালা এবং তার সঠিক প্রয়োগ। মানুষ যেন সরকারি বেসরকারি ছোট ও বড় সব হাসপাতালে সঠিক মানের চিকিৎসা পায় ও প্রতারিত না হয়। এমন কোন দ্বন্দ্বের মুখোমুখি যাতে না হয় যে, অমুক বড় হাসপাতালে না গেলে আমার সঠিক চিকিৎসা হবে না বা কোন হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ ও চিকিৎসার ফলাফল দেখে রোগী প্রতারিত বোধ করবে না।

চিকিৎসার খরচের ব্যাপারটি যাতে রোগীর সামর্থ্য ও স্বতঃস্ফূর্ত চয়েজের উপর ডিপেন্ড করে, চিকিৎসার মানের উপর না। চিকিৎসার অতিরিক্ত হাসপাতালের ফ্যাসিলিটির উপর ডিপেন্ড করে চিকিৎসা খরচ বাড়বে বা কমবে, অনেকটা ফাইভ স্টার হোটেলের মত, আবার সব চেয়ে কব খরচের হাসপাতালেও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

সমাজকর্মী এবং ফেসবুক এক্টিভিস্ট হুমায়রা তাবাসসুম হিমি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, গতকাল মাশরাফি বিন মর্তুজা হসপিটালে গিয়ে ডিউটি ডাক্তারকে না পেয়ে যেভাবে রিয়্যাক্ট করেছেন, তার এই আচরণ কতটা অশোভন হয়েছে সেটা অনেক ভাবেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। যেহেতু সে এই কাজটা মাস পিপলের পক্ষ নিয়ে করেছে, সুতরাং তার এই আচরণের প্রতি স্বাভাবিক ভাবেই একধরনের পজিটিভ সাপোর্ট চলে আসবে।

কিন্তু নিজের ক্ষমতা দেখানোর এমন টেনডেন্সী গুলো সামগ্রিক ভাবে ভীষণ রকম বিপজ্জনক। যেমন দেখেন, গতকাল সমকাল একটি নিউজ শেয়ার করেছে যেখানে জানানো হয়েছে যে, শেরপুরে এক ইউপি চেয়ারম্যান নাকি তার এলাকার এক কৃষককে নিজ বাসায় যেয়ে গুলি করেছে এবং ভিক্টিম জাস্ট স্পটেই শেষ। এই যে সাডেন ফল অব টেম্পারেচার আর ক্ষমতা দেখানোর প্রবৃত্তি মিলে কি একটা বাজে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, ভাবতে পারছেন কি?

আজ মাশরাফির এমন হাইপার অ্যাক্টিভিটি গুলো যদি এভাবে বাহবা পায়, তাহলে দেখবেন ইন ফিউচার সে নিজের ক্ষেত্রগুলোতে আরো ডেস্পারেট হয়ে যাবে প্লাস তাকে দেখে আরো অনেকেই ইন্সপায়ারড হবে। এজন্য কোথাও না কোথাও একচুয়্যালি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষমতার একটা সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন। যে হ্যাঁ, তুমি জাস্ট এ পর্যন্ত আসতে পারবে, এর বাহিরে কোনকিছু ভাবার সুযোগ তুমি পাবে না। একটা হেলদি এডমিনিস্ট্রেশন যেভাবে কাজ করে আর কি।

প্রবাসী ফেসবুকার কবির হক তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, মাশরাফিদের এসব ঘটনা থেকে জোশ পাওয়ার কারনেই বিভিন্ন সময় ভুল চিকিৎসার অপবাদ দিয়ে গ্রামের অশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা ডাক্তারদের উপর হামলা করে, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।

এতে করে কি সুচিকিৎসা ফেরত আসে? বরং ডাক্তাররা এখন উপজেলা লেভেলে চিকিৎসা করতে ভয় পায়, রোগীকে উপজেলা থেকে জেলা, জেলা থেকে রাজধানীতে রেফার করে দেয়। এতে করে হয়রানী সেই রোগীদেরই হয়। সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হলে সেটা অফিসিয়াল ওয়েতে কাজ করতে হবে, সিনেমা কিংবা ফাটাকেষ্ট ষ্টাইলে নয়। জনস্মুখে চিকিৎসককে ধমকালে ফেসবুকে গোয়াড় লোকদের লাইক মিললেও সমস্যার সমাধান না হয়ে উল্টা জটিলতার সৃষ্টি হয়।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য শুধু ডাক্তারদের ধমকালে হবে না, সরকারী দল করে হাসপাতালের তৃতীয় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা কিভাবে শতকোটি টাকার মালিক হয়? শুধুমাত্র চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতাল সেখানে কিভাবে রাজনৈতিক দলের সভা, সেমিনার, কমিটি হয়? চায়না থেকে মেশিন আমদানি করে কিভাবে জার্মানি লিখে হাজার কোটি টাকা মেরে দেওয়া হয়? ল্যাবে কেন তালা দেওয়া থাকে? বেসরকারী হাসপাতাল ল্যাবে কিভাবে ১০০ টাকার পরীক্ষা ১ হাজার টাকা নেয়, সেসবে নজর দিবে কে?

শিশু হাসপাতালের রেসিডেন্ট ডা. রাসেল চৌধুরী তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেছেন, নড়াইলে গিয়ে হাসপাতালে তিনি যে ভাষায় কথা বলেছেন সেটাকে জনপ্রতিনিধির ভাষা বলে না। কোনোরকম হোমওয়ার্ক ছাড়া, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা বা জনবল কাঠামো সম্পর্কে কোনো ধারনা না নিয়ে, গলায় সানগ্লাস আর পাকিস্তানি কাবলি ড্রেস পরে যে ভাষায় মন্তব্য করেছেন সেটা চিকিৎসকদের জন্য চরম অপমানজনক। রাজনীতিটা করলে পুরোটা জেনে পুরোটা সময় করুন, সাইড পেশা হিসেবে সেটা না নিলেও চলবে।

এদিকে, আজ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের দেয়া এক প্রজ্ঞাপনে মাশরাফি বিন মুর্তজার হাসপাতাল পরিদর্শনকালে হাসপাতালে চিকিৎসক অনুপস্থিতির ঘটনায় ৪ চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। তারা হলেন: কার্ডিওলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. শওকত আলী ও ডা. মো. রবিউল আলম, সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. আখতার হোসেন এবং মেডিকেল অফিসার ডা. এএসএম সায়েম। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ দেয়া হয়। এতে বলা হয়, বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডার/স্বাস্থ্য সার্ভিসের এ কর্মকর্তাদের পুনরায় আদেশ না দেয়া পর্যন্ত তাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বদলি/পদায়ন (ওসডি) করা হলো। বদলি/পদায়নকৃত এ কর্মকর্তাদেরকে আদেশ জারির সাত কর্মদিবসের মধ্যে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। অন্যথায় পরবর্তী কর্মস্থল হতে তিনি তাৎক্ষণিক অবমুক্ত হবেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক এই সংসদ সদস্য গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে আকস্মিকভাবে সদর হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। এ সময় হাজিরা খাতায় ৩ চিকিৎসকের স্বাক্ষর না দেখে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুস শাকুর এবং পরে অনুপস্থিত সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আকরাম হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন মাশরাফি। কথা বলার এক পর্যায়ে সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আকরাম হোসেনকে উদ্দেশ্য করে মাশরাফি মোবাইল ফোনে বেশ রুঢ় ভাষায়  তাঁকে বলেন, ‘ফাইজালামি পাইছেন?….এখন বলেন আমি আপনারে কি করবো?….।

এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর চিকিৎসকসহ অন্যান্যদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

কার্টেসি ও ক্রেডিট : মেডিভয়েস