কেন্দুয়া রোয়াইল বাড়ী। মাটির নীচে চাপা পড়া শত শত বছরের ইতিহাস এখন কেবলি দীর্ঘশ্বাস!

0
31

শেখ অনিন্দ্যমিন্টু, কেন্দুয়া, রোয়াইল বাড়ী থেকে।।

দিন চলে যায়, ইতিহাস থেকে যায়। কেন্দুয়া রোয়াইল বাড়ী। মাটির নীচে চাপা পড়া শত শত বছরের ইতিহাস এখন কেবলি দীর্ঘশ্বাস! কিশোরগঞ্জের জংগলবাড়ী দূর্গ আর কেন্দুয়া বেতাই নদীর তীরে রোয়াইলবাড়ীর দূর্গ, দুটোই কালের ইতিহাস! বাংলার স্বাধীনতা শুরুর স্মারক ও সাক্ষী।

দেশের সভ্যতা এত এগিয়ে গেলো! অথচ রোয়াইল বাড়ী নিয়ে এখানে নূন্যতম একটি সাইনবোর্ড নেই, এলাকাটি সংরক্ষিত বা সংরক্ষণ এর কোন উদ্যোগ নেই! কোন এক অজানা কারনে সবকিছু এখানে থমকে আছে।

৩৬ একর জমি নিয়ে চারিদিকে পরিখা বেস্টিত এই দূর্গম দূর্গ এলাকার বেশীর ভাগ জমিই এখন দখল হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দরকার।

প্রয়োজন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গবেষনা ও খোঁড়াখুঁড়ি। নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন, এমপি অসীম কুমার উকিল, অপু উকিল ও স্থানীয় সচেতন মহলের কাছে অনুরোধ রোয়াইলবাড়ীর ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখুন, একবার গিয়ে পরিদর্শন করুন।

ফরিদ আহম্মদ দুলালের তথ্য থেকে :

বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার একটি জনপদ রোয়াইল বাড়ি। রোয়াইল বাড়ি পৌঁছানো নেত্রকোণা শহর থেকে যতটা সহজ তারচেয়েও কিঞ্চিত সহজ ময়মনসিংহ সদর থেকে পৌঁছানো। ময়মনসিংহ থেকে ঈশ্বরগঞ্জ-সোহাগী-রায়ের বাজার হয়ে সহিদপুর বাজার। সহিদপুর থেকে কেন্দুয়ার দূরত্ব সাত কিলোমিটার। সহিদপুর থেকে ডানদিকে (পশ্চিমে) পাঁচ কিলোমিটার গেলেই রোয়াইল বাড়ি বাজার, রোয়াইল বাড়ি বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার গেলেই পাওয়া যাবে রোয়াইল বাড়ি প্রত্ন-রত্নের দেখা।

স্থানীয় মানুষ জানে মাটির নিচ থেকে পাওয়া মসজিদ। কেউ কেউ বলে রোয়াইল বাড়ি দুর্গ। প্রায় দশ-বারো একর এলাকা জুড়ে এ প্রত্ন-রত্নের স্থাপনা বিস্তৃত। বর্তমানে যার অনেকটা জুড়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘রোয়াইলবাড়ী ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসা; মাদ্রাসার প্রয়োজনে প্রাচীন অনেক স্থাপনাই নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। প্রায় পঁচিশ বছর আগে যা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ ছিলো আজ তার সিকিআনা পাওয়া যেতে পারে। যদিও ওখানটায় বাংলাদেশ যাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ছোট্ট একটা প্রায় পাঠঅযোগ্য সাইনবোর্ড লাগানো আছে; যাতে লেখা আছে-
“বিজ্ঞপ্তি/ সংরক্ষিত পুরাকীর্তি/ কোন ব্যক্তি এই পুরাকীর্তির কোনরকম ধ্বংস বা অনিষ্ট সাধন করলে বা এর কোন বিকৃতি বা অংগচ্ছেদ ঘটালে বা এর কোন অংশের উপর কিছু লিখলে বা খোদাই করলে বা কোন চিহ্ন বা দাগ কাটলে ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইনের চতুর্দশ ধারার অধীনে তিনি সর্বাধিক এক বৎসর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা অথবা এই উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডণীয় হবেন।/ পরিচালক/ যাদুঘর ও প্রত্ন বিভাগ/ বাংলাদেশ সরকার।”
পঁচিশ বছর আগে যে সাইনবোর্ডটি সহজে পাঠ করা যেতো পঁচিশ বছর পর তার পাঠোদ্ধার ততোটাই কঠিন, তা থেকেই বুঝে নেয়া যায় প্রত্ন-রত্নের বিষয়ে যাদুঘর ও প্রত্নবিভাগের কতটা অবহেলা। পঁচিশ বছরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কেউ এর দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন, বিশ্বাস হয় না। যা হোক কর্তৃপক্ষের সমালোচনা আমার কাজ নয়, আমি কেবল আমার পাঠকের জন্যে অমূল্য এ প্রত্ন-রত্নটির সন্ধান জানাতে চাই। যদিও রোয়াইল বাড়ির প্রত্নসম্পদ ততটা লোকপুরাণ নয়, তবুও দালিলিক প্রমান এবং ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তের ঘাটতিজনিত কারণে এটিকে সে অধ্যায়েই উপস্থাপন করছি।

রোয়াইল বাড়িতে এখনো যেসব স্থাপনার ভগ্নাবশেষ আছে, তার স্থাপত্যশৈলী এবং বিভিন্ন স্থানের সমিল স্থাপনার শৈলী বিবেচনায় ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারনা, এটি পরিত্যক্ত বৌদ্ধবিহার হবারই কথা; যদিও এতদ অঞ্চলে যারা কিছুটা খোঁজ-খবর রাখেন তাদের সবাই আমার সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন, একমাত্র কবি সৈয়দ নাজমুল করিম আমার সাথে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। রোয়াইল বাড়ির স্থাপনার সাথে কুমিল্লার ময়নামতি, বগুড়ার মহাস্থানগড় অথবা পাহাড়পুরের স্থাপনার সাদৃশ্যের কারণে আমি বারবারই একে বৌদ্ধবিহার বলে দাবী করেছি এবং এর প্রকৃত ইতিহাস উন্মোচনের আহবান জানাচ্ছি। রোয়াইল বাড়ির স্থাপনা যে বৌদ্ধ বিহার ছিলো দরজি আবদুল ওয়াহাব সে কথা সরাসরি না বললেও তার ‘ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন’ গ্রন্থে বলেন, ‘রোয়াইলবাড়ি এলাকার মাটির নীচ থেকে হঠাৎ হঠাৎ বুদ্ধ মূর্তিযুক্ত প্রচীন কালের ইট পাওয়া যায়। তা থেকে পণ্ডিতগণ মনে করেন- এ অঞ্চলে এক সময় পাল আমলের সমৃদ্ধ শাসনকেন্দ্র ছিলো।

যদ্দুর জানা যায় ইংরেজ শাসনামলে রোয়াইল বাড়িতে ছিলো সমৃদ্ধ নদীবন্দর এবং এখানে নদীতে ছিলো নৌকা ও বজরাভিত্তিক বাইজী ও দেহপসারিনীদের জমজমাট ব্যবসায়।

উল্লেখ্য যে : এখানে এখন আর কোন সাইনবোর্ড নেই।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here