যেকোনও ব্যক্তি বা আইনজীবী তার বক্তব্য, অভিযোগ বা দাবির বিষয়টি লিগ্যাল নোটিশ বা আইনি নোটিশের মাধ্যমে অপর ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। এটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, নোটিশ দেওয়ার এই প্রবণতা অনেক সময় গুরুত্বহীন, অসত্য বা বিভ্রান্তিকর বিষয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা প্রশ্ন তুলেছে এর ব্যবহারিক উদ্দেশ্য নিয়ে। কেউ কেউ বলছেন- এটি এখন অনেকের কাছে পাবলিসিটি অর্জনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাইজুল্লাহ ফয়েজ জানান, আইনি নোটিশের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- মামলা করার আগে বিরোধ amicable উপায়ে সমাধানের আহ্বান জানানো। কমন ল’ সিস্টেমভুক্ত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও এ ধরনের নোটিশ পাঠানো হয়ে থাকে। বিশেষ কিছু আইনে যেমন চেক ডিজঅনার বা আরবিট্রেশনের ক্ষেত্রে নোটিশ পাঠানো বাধ্যতামূলক হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়।
তিনি বলেন, “নোটিশ পাঠানো হয় মূলত আদালতের দরজায় যাওয়ার আগে আরেকটি ‘সুযোগ’ দেওয়ার মানসিকতা থেকে। কিন্তু এখন অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, নোটিশটি মূলত মিডিয়ায় প্রচার পাওয়ার উদ্দেশ্যেই পাঠানো হচ্ছে।”
এই অবস্থানকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। তিনি বলেন, “অনেকেই এখন ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের কাছে নোটিশ পাঠাচ্ছেন। সেগুলোর কোনো বাস্তবতা বা আইনি ভিত্তি থাকে না। এতে সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ নোটিশগুলোকেও সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা সম্প্রতি এমন কিছু নোটিশ পেয়েছি, যেগুলোর ভাষা ও তথ্য দেখে বোঝা গেছে এটি শুধু সংবাদ শিরোনামে আসার উদ্দেশ্যেই পাঠানো হয়েছে। আইনি ভিত্তি বা বাস্তবতার অভাবে এসব নোটিশ আমরা আমলে নিই না।”
সম্প্রতি পাঠানো কিছু আইনি নোটিশের উদাহরণ দিচ্ছে এর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ। ফেনী নদীর পানি সরবরাহ বন্ধের দাবি, ১৪ দলীয় জোট নিষিদ্ধের আবেদন, জৈব বিবর্তন তত্ত্ব পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ কিংবা পুলিশ কর্মকর্তাদের বরখাস্তের আহ্বান- এমন অনেক বিষয়েই আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে, কিন্তু কোনওটিই শেষ পর্যন্ত রিট বা মামলায় রূপ নেয়নি।
এই প্রসঙ্গে অনীক আর হক বলেন, “যেসব নোটিশে আইনগত প্রশ্ন বা ঘটনাগত বিষয়ে গভীরতা থাকে, আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তা অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এসব নোটিশ গভীরতা ও গুণগত মানে দুর্বল, যা শুধু বিভ্রান্তির জন্ম দেয়।”
আইনি নোটিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ফাইজুল্লাহ ফয়েজ বলেন, “এটার জন্য আলাদা নীতিমালার প্রয়োজন নেই। তবে বার কাউন্সিলের ‘ক্যাননস অব কনডাক্ট’ হালনাগাদ করে আইনজীবীদের আচরণনির্ভর তদারকি করা যেতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “কোনো আইনজীবী যদি অসত্য তথ্য বা হয়রানিমূলক উদ্দেশ্যে নোটিশ দেন, তাহলে বার কাউন্সিলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে করে আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকবে।”
সবশেষে, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইনি নোটিশ হলো একটি দায়িত্বশীল উদ্যোগ- যা আইনের দরজায় যাওয়ার আগে বিকল্প সমাধানের সুযোগ করে দেয়। তবে এটি যেন জনগণকে বিভ্রান্ত করা, প্রতিপক্ষকে হেয় করা বা সংবাদে আসার কৌশল না হয়, সে বিষয়ে সব পক্ষকে সচেতন থাকতে হবে। আইনজীবী, প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যম- তিন পক্ষের দায়িত্বশীলতা ছাড়া এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন।