ময়মনসিংহ নগরীকে ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে বহুদিন ধরেই চিহ্নিত করে আসছেন ভূতত্ত্ববিদরা। বিশেষ করে মধুপুর ফল্ট, দাউকি ফল্ট ও ভারতের শিলং প্ল্যাটুর সক্রিয় ভূমিকম্প উৎসের কাছাকাছি অবস্থান করায় এ অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা সবসময়ই আলোচনায় থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ময়মনসিংহের আশপাশে কেন্দ্র রেখে ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, তাহলে নগরীতে বড় ধরনের প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটতে পারে।
নগরীর পুরনো অংশ-জুবলি ঘাট, গাঙ্গিনারপাড়, নতুন বাজার, কাচিঝুলি, গাঙ্গিনারপাড়, চরপাড়া, কোতোয়ালি থানা এলাকা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর কাছাকাছি নিম্নাঞ্চলগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে। এসব এলাকায় বহু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে পরিকল্পনা ও সুরক্ষা মান না মেনে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একটি বড় কম্পনে বহু পুরনো বহুতল ভবন ভেঙে পড়তে পারে, নরম পলিমাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোতে লিকুইফ্যাকশন দেখা দিতে পারে-যেখানে মাটি তরল হয়ে ভবন তলিয়ে যাওয়া বা কাত হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে ময়মনসিংহ শহরের সংকীর্ণ সড়কগুলোই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় বাধা। উদ্ধারযান, অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি অনেক জায়গায় পৌঁছাতে পারবে না। বহু গুরুত্বপূর্ণ ভবন যেমন হোস্টেল, বাণিজ্যিক ভবন, স্কুল–কলেজ এবং সরকারি অফিস-অর্ধেকের বেশি নির্মাণই বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুসরণ করে হয়নি বলে বিভিন্ন সময়ে জরিপে উঠে এসেছে।
১৮৯৭: ভূমিকম্পে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়েছিল ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের ভূমিকম্প ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতি ১২ জুন ১৮৯৭ সালের বিকেলের ভূমিকম্প। বিকেল পাঁচটার দিকে ভারতের শিলং মালভূমির নিচে উৎপত্তি হওয়া প্রায় ৮.২ মাত্রার সেই ভূমিকম্পে পুরো অঞ্চলের জীবন থমকে যায়। ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, ময়মনসিংহ শহরের অধিকাংশ ইমারত তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সরকারি ভবন, আদালত, বাজার, নৌঘাট-কোনোটিই রক্ষা পায়নি। বহু যমুনা–ব্রহ্মপুত্র পাড়ের জনপদে ফাটল ধরে মাটির ভেতর থেকে পানি–বালি উঠে আসার ঘটনা ঘটে।
সেই ভূমিকম্পের আরেকটি বিরল পরিণতি ছিল নদীপথের পরিবর্তন। ভূ-উত্থান ও ভূমি-অবনমনের ফলে ব্রহ্মপুত্রের পুরনো প্রবাহ ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নদী পশ্চিম দিকে ঝুঁকে আজকের যমুনা নদীপথ গড়ে ওঠে। ভূতাত্ত্বিকরা এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার নদী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে মনে করেন।
১৯১৮: আবারও কেঁপে ওঠে অঞ্চল
এরপর ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে পুরো পূর্ববাংলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সিলেট-মেঘালয় অঞ্চলে কেন্দ্র হলেও ময়মনসিংহে প্রচণ্ড কম্পন টের পাওয়া যায়। বহু কাঁচা ঘর ভেঙে পড়ে, বাজার-ঘাটে ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। যদিও ১৮৯৭ সালের মতো ব্যাপক ধ্বংস হয়নি, তবুও শহরের মানুষ দীর্ঘদিন আতঙ্কে কাটিয়েছে।
ময়মনসিংহে ভূমিকম্প ঝুঁকির গভীর বিশ্লেষণ
১. সক্রিয় ফল্ট লাইন
ময়মনসিংহ শহর তিনটি বড় ফল্ট লাইনের কাছাকাছি: ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ব্লাইন্ড ফল্ট এবং সিলেট–আসাম ফল্ট।
বিশেষ করে ডাউকি ফল্ট একটি বিপজ্জনক রিভার্স ফল্ট, এবং এটি শিলং প্লাটো–এর দক্ষিণ প্রান্ত বরাবর বিস্তৃত।
এ ফল্টগুলো ভূমিকম্প সৃষ্টি করার সক্ষমতা রাখে এবং প্রায় এলাকা জুড়ে চাপ সঞ্চিত রয়েছে।
২. মাটির গঠন ও লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি
ময়মনসিংহ শহরের প্রায় ৯০% মাটি লিকুইফ্যাকশন-সংবেদনশীল। অর্থাৎ ভূমিকম্প হলে নরম বা বালি জাতীয় মাটি তরল হয়ে যেতে পারে, যা ভবনকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
এমন এক প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ভূমিকম্পের কম্পনকে আরও বাড়িয়ে দেয় এবং ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়ায়।
৩. সামাজিক ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা
ময়মনসিংহ পুরনো শহর - বহু পুরানো, অপ্রয়োজনে নকশাহীন বা বিল্ডিং কোড মেনে না বনের ভবন রয়েছে।
শহর সম্প্রসারণ দ্রুত হচ্ছে, কিন্তু পরিকল্পিত ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি পর্যাপ্ত নয়, বিশেষ করে জরুরি সাড়া-দানে প্রয়োজনীয় সড়ক, উদ্ধার কেন্দ্র এবং খোলা জায়গার ঘাটতি রয়েছে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য: কিছু এলাকায় মানুষের আয় কম এবং তারা দারিদ্র্য–অনিরাপদ নির্মাণে বসবাস করতে পারে, যা ভূমিকম্পে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়।
৪. সিসমিক জোনিং
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানচিত্র ও সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জোন-১ (সর্বোচ্চ ঝুঁকিপ্রবণ) এলাকায় চিহ্নিত করা হয়েছে।
সিসমিক ম্যাক্রো-জোনিং মডেল অনুযায়ী, ময়মনসিংহে অনুমান করা হয়েছে সিসমিক সহগ (seismic coefficient) প্রায় 0.36g, যা মোট ঝুঁকি নির্দেশ করে।
আজকের ময়মনসিংহ কতটা প্রস্তুত?
বর্তমান ময়মনসিংহ শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। নগরীর পুরনো এবং নতুন সম্প্রসারিত এলাকাগুলোতে বিপুলসংখ্যক বহুতল ভবন-যার উল্লেখযোগ্য অংশ ভূমিকম্প সহনশীলভাবে নির্মাণ হয়নি। উদ্ধারকাজ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় উন্মুক্ত মাঠ, জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র, বিকল্প সড়ক-এসবের ঘাটতি প্রকট। ব্রহ্মপুত্রের কোলঘেঁষা বস্তি ও নিচু জনবসতিগুলো ভূমিকম্পের পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাস ও ধস-দুই ধরনের বিপদের মুখে পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যদি রাতের বেলায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। হাসপাতালগুলো নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হলে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। গ্যাস লাইন ফেটে আগুন লাগা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, পানির পাইপ ভেঙে যাওয়া-এগুলোও বাড়তি বিপদ ডেকে আনবে।
ভূমিকম্প কখন, কোথায়, কী মাত্রায় হবে-সেটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু ইতিহাস ও ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা বলছে, ময়মনসিংহ একটি সম্ভাব্য বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতীতের ঘটনা এটি বারবার প্রমাণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবন নির্মাণে কঠোরভাবে কোড মানা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি, সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন, উদ্ধার দলের দক্ষতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা-এই বিষয়গুলো এখনই নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতের একটি বড় দুর্যোগ সামলানো কঠিন হবে।