Logo

এবার মশা নিধন করবে মাছ!

অনিন্দ্যবাংলা
শুক্রবার, জুন ১১, ২০২১
  • শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার: মশার উপদ্রবে নাকাল নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নিয়েছে ভিন্ন উদ্যোগ। এরই ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন শুক্রবার (১১ জুন) বিকেলে নগরীর শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন কাটাখালি খাল সহ বিভিন্ন ড্রেনে জৈবিক উপায়ে মশক নিধনের লক্ষ্যে মশাভুক মাছ অবমুক্ত কার্যক্রম শুভ উদ্বোধন করেন মেয়র মোঃ ইকরামুল হক টিটু।

এ সময় তিনি বলেন, মশক নিধনে লার্ভিসাইড ও এডাল্টিসাইড প্রয়োগ, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি জৈবিক উপায়ে মশক নিধনে আমরা কাজ করছি। ইতোপূর্বে ১০ হাজার ব্যাঙ নগরীর বিভিন্ন খালে-ড্রেনে-জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়েছে। আজ শুক্রবার প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার মাছ অবমুক্ত করা হলো। পরবর্তীতে আরো মশক নিধনকারী মাছ অবমুক্ত করা হবে। তিনি আরো জানান, মশক নিধনে উন্মুক্ত জলাশয়ে হাঁস পালন এবং মশা তাড়ানো গাছ  লাগানোর পরিকল্পনাও রয়েছে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের।

মেয়র আরো বলেন, সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণে আমরা ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নিচ্ছি। জুলাই মাস থেকে স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আঞ্চলিক পরামর্শ ও অবহিতকরণ সভার আয়োজন করবে মসিক। 

চলতি মাসে মশা বৃদ্ধির স্থান,  লার্ভার ঘনত্ব বিষয়ে জরিপ চালানো শুরু করেছে মসিক। পাশাপাশি মশক নিধনে প্রচারপত্র ও স্টিকার বিতরণের কাজ শুরু করবে।

এ সময় ০৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোঃ শরিফুল ইসলাম, সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর সেলিনা আক্তার, জনসংযোগ কর্মকর্তা শেখ মহাবুল হোসেন রাজীব, খাদ্য ও স্যানিটেশন কর্মকর্তা দীপক মজুমদার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য যে, মশক দমনে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক-কীটনাশক ব্যবহারের বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিকভাবে মশা দমনের কথা ভাবছেন অনেকে। আধুনিক কীটতত্বত্তবিদরা মনে করেন, মশা দমনে প্রধানত ৪টি কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথমটি হলো কীটনাশক ও ফ্রগারের মাধ্যমে, ২য়টি হলো জৈবিক পদ্ধতি ব্যবস্থাপনা, ৩য়টি হলো মশাতাড়ানো গাছ চাষ,  ৪টি হলো মশা দিয়ে মশা নিধন, জেনিটিক মডিফাইড মশা (জিএম মশা) ব্যবহার।

মশক নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের আশপাশের পরিবেশ বা জলাশয় পরিষ্কার ও দূষণমূক্ত রাখতে হবে। জলাবদ্ধতা দূর করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। যেমন আবদ্ধ ড্রেন, ছাদ, ঘরের কোনা, ডাব, নারকেলের মালা, খেলনা, ট্রায়ার যেখানে এক সপ্তাহ ধরে পানি জমে থাকে এমন সব জিনিশপত্র ধ্বংস করতে হবে। নিজ নিজ বাসা-বাড়ী, আঙিনা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। মশা যেখানে ডিম পড়ে, বিস্তার লাভ করে সেসব জায়গা ঝোপ-ঝাড় কেটে ফেলতে হবে। সেই সাথে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিল-ঝিল-ডোবা-নর্দমা পরিষ্কার করতে হবে। কারণ এসব স্থানেই মশা বেশি জন্মায়।

জৈবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ : জৈবিক পদ্ধতিতে মশানিধন । এই পদ্ধতিতে মশা ও লার্ভাভূক প্রাণীর মাধ্যমে মশানিধন করা হয়। ব্যাঙ, গাপ্পি মাছ, খলিসা মাছ, দাড়কিনা মাছ, হাঁস, চামচিকা এসব প্রাণী মশার লার্ভা ও মশা খেয়ে থাকে। লার্ভা ধ্বংস হলে মশাও ধ্বংস। লার্ভাভুক প্রাণীর মাধ্যমে মশা নিধন পদ্ধতি মশকনিধনে যেমন কার্যকর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গাপ্পি ফিস, খলিশা মাছ, দাড়কিনা মাছ, ব্যাং, ড্রাগন ফ্লাই, হাঁস, চামচিকা এগুলোকে প্রকৃতিতে ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে পার্শ্ব বর্তী সফল দেশগুলোর (ভারত, ভিয়েতনাম) দিকে তাকালে দেখতে পাই যে, সারা বছর ধরে বেশ কিছু জৈবিক (মশাভুক মাছ, ব্যাঙ) ও রাসায়নিক দমন পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে সাফল্য পেয়েছেন তারা।

ব্যাঙ- ব্যাঙ মশা, মাছিসহ ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ খেয়ে আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। একটি ব্যাঙ একদিনে প্রায় হাজার খানেক লার্ভা খেতে সক্ষম বলে অনেকে মনে করেন। তাই ব্যাঙ ছাড়া হয়েছে।

খলিসা, গাপ্পি, তেলাপিয়া, থাই মাগুড় ও দাড়কিনা মাছ- বিদেশি মসকুইটো ফিশ বা গাপ্পির তুলনায় মশক লার্ভা ভক্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশি জাতের খলিসা মাছ, দাড়কিনা মাছের দক্ষতা প্রায় দ্বিগুণ। খলিসা শুধু মশার লার্ভা ভক্ষণেই ভালো নয়, এটির ড্রেনের পানিতে অভিযোজন ও টিকে থাকার হারও ভালো। এসব মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন খুবই সহজ। তাই মশাপ্রবণ এলাকাগুলোর জলাশয় ও ড্রেনগুলোতে খলিশা মাছ চাষ করা যেতে পারে। 

মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য গাপ্পি মাছ অনেকটা কার্যকর বলে বিদেশী গবেষণায় ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে । আমাদের দেশে গাপ্পি মাছ নেই। দেশীয় দাড়কিনা মাছ অনেকটা গাপ্পি মাছের মত। এই মাছগুলো মশার লার্ভা খায়। তাই খাল, জলাশয় ও ড্রেনগুলোতে দাড়কিনা মাছের পাশাপাশি তেলাপিয়া, থাই মাগুড়  চাষের কথা অনেকেই বলছেন।

মশা বিরোধী গাছ- এটা সবচেয়ে কার্যকর একটি মাধ্যম। আমাদের প্রকৃতিতে এমন অনেক গাছ আছে মশা যেগুলোর ধারে কাছেও যায় না। এসব গাছের ফুল, ফল নির্ষাস যেমন মশা তাড়ায় তেমনি এগুলো থেকে তৈরী হয় মশক নিধন ঔষধ। যেমন, নিম গাছ , মেরিগোল্ড বা গেন্ধাফুল গাছ, তুলসী গাছ, পুদিনা গাছ, লেভেন্ডার গাছ, রোজমেরী গাছ, লেবু গাছ, ইউক্যালিপটাস গাছ, রসুন গাছ। মশা দমনে মশকবিরোধী গাছ লাগানো সবচেয়ে কার্যকর ও সাশ্রয়ী। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে তেমনি মশার উৎপাদনও কমে আসবে। চাইলে নিজ উদ্যোগে সবাই বাসা-বাড়ী, অফিস আদালত সহ  বারান্দা, ব্যালকনি, বাগান বা ছাদে এসব গাছ রোপন করতে পারেন।

নগরীতে নিজ দায়িত্বে তাদের আবাসস্থল, বাসাবাড়ীতে এসব গাছ রোপন করতে পারেন। পাশাপাশি সিটিকর্পোরেশ নিজেদের ব্যবস্থাপনায় এসব গাছ চাষ ও রোপন করতে পারেন।  এসব গাছ একাধারে যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি মশা তাড়াতেও খুব কার্যকর।

বিকল্প মশা বা জিএম মশা :  মশা নিধনে বিজ্ঞানীদের সফল আরেকটি পদ্ধতি হলো জেনেটিক্যালি মোডিফাইড বন্ধু মশা বা জিএম মশা। এই পদ্ধতিতে জিএম ইঞ্জিনিয়ারিং করে মশার কোষে জেনেটিক পরিবর্তন আনা হয়। যার ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেঁচে থাকতে পারে না। প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়া এই জিএম মশার সাথে নারী এডিস মশার প্রজননে যে সব মশার জন্ম হয় সে গুলো দ্রুতই মরে যায়। এতে কমে যায় এডিস মশা।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরীতে ১৬ বছরের গবেষণায় এ ধরনের মশা উৎপাদনে সফল হন বৃটেনের অক্সিটেক কোম্পানির বিজ্ঞানীরা। ব্রাজিলে এই পদ্ধতির সফলতা ছিলো ৯০ শতাংশ। এটা ব্যবহারে মাথাপিছু খরচ হয় প্রায় ৮৪৫ টাকা।

উবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া : এডিস মশা নিধনে বিজ্ঞানীদের সফল পরীক্ষা এখনো বাস্তবায়ন হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া ও চীনসহ আশেপাশের দেশগুলোতে কাজে এসেছে অভিনব এই কৌশল। ডেঙ্গু ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে মশার গায়ে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার কিংবা মশা দিয়ে মশা মারার খরচও নাগালের মধ্যে।