মস্কো থেকে শুরু হওয়া তিন দিনের সরকারি সফরের প্রথম দিনেই রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, রুশ সংস্থাগুলোর জন্য ভারতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশ রয়েছে এবং এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
এই সফর এমন এক সময় হচ্ছে, যখন রাশিয়া থেকে খনিজ তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। এমন ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যেই নয়াদিল্লি-মস্কোর মধ্যকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার কূটনৈতিক বার্তা দিলেন জয়শঙ্কর।
রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব বিষয়ক একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে জয়শঙ্কর জানান, গত চার বছরে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেন পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮০০ কোটি মার্কিন ডলারে, যা ২০২১ সালে ছিল মাত্র ১৩০০ কোটি ডলার। তবে এই বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারসাম্যহীন বাণিজ্য ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন তিনি। বর্তমানে ওই ঘাটতি প্রায় ৫৮৯০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় নয় গুণ বেশি।
জয়শঙ্কর বলেন, “এই বিশাল ঘাটতির বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের বাণিজ্যিক কাঠামোয় ভারসাম্য আনতেই হবে।”
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী ডেনিস মন্তুরোভও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রশংসা করে বলেন, গত পাঁচ বছরে রাশিয়া-ভারত বাণিজ্য ৭০০ শতাংশ বেড়েছে এবং ভারত রাশিয়ার শীর্ষ তিনটি বাণিজ্য অংশীদারের অন্যতম হয়ে উঠেছে।
ভারত-রাশিয়া বিজনেস ফোরামের সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের কাছাকাছি। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ও নগরায়নের ফলে দেশজুড়ে নতুন চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা রুশ সংস্থাগুলোর জন্য বড় সুযোগ।
তিনি বলেন, “ভারতের আধুনিকীকরণ, শিল্পায়ন ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে বাজারে নতুন ধরণের ভোক্তা চাহিদা তৈরি হচ্ছে। রাশিয়ার কোম্পানিগুলোর উচিত ভারতের এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হওয়া।”
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের বিষয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সম্প্রতি মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক সাক্ষাৎকারে জানান, রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণেই ভারতকে শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা না হলে আরও শুল্ক বাড়ানো হতে পারে।
এই বক্তব্যকে ‘স্পষ্ট হুমকি’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতীয় থিংকট্যাংক অনন্তা সেন্টারের প্রধান ইন্দ্রাণী বাগচি এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে, রাশিয়ার ওপর প্রভাব রাখতে হলে ভারতকে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু এতে ভারতের ক্ষতিই বেশি হবে।”
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো তনভি মাদান এই মন্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে লিখেছেন, “যদি ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে চাপে ফেলে, তাহলে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কে ফাটল ধরতে পারে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখন এক জটিল ভূরাজনৈতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বও অব্যাহত রাখতে চায় নয়াদিল্লি।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. রজন কুমার বলেন, “ভারত এখন এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছে, যেখানে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার জন্য চাপ বাড়ছে। কিন্তু সেটা ভারতের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে নয়।”
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে চীন সফরের ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এস জয়শঙ্করের ভাষ্য অনুযায়ী, “জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও ভারত ও রাশিয়া তাদের ঐতিহ্যবাহী বিশেষ ও সুবিধাপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারত্ব ধরে রেখেছে এবং ভবিষ্যতেও তা বজায় থাকবে।”