জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হয়েছিল বৈষম্য, দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে। কিন্তু ময়মনসিংহ জেলার বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে-স্বৈরশাসক পালালেও কি তার দোসররা এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে?
সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগীদের পরিকল্পিতভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো, ভুল চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় অপারেশন এবং রোগী ও স্বজনদের সর্বস্বান্ত করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রে উঠে এসেছে কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশ (CBMCB)। জীবন বাঁচানোর আশায় মানুষ গবাদিপশু ও ভিটেমাটি বিক্রি করে এখানে এসে পড়লেও, অভিযোগ রয়েছে-এই প্রতিষ্ঠানটি এক শ্রেণির চিকিৎসক ও দালাল চক্রের কাছে পরিণত হয়েছে ‘মুনাফার ফাঁদে’।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যেখানে ভালুকার এক ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি সামান্য পেটের সমস্যার চিকিৎসা নিতে এসে ভুলভাবে ক্যান্সার রোগী হিসেবে চিহ্নিত হন। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া রিপোর্ট দেখিয়ে তার কোলনের একটি অংশ কেটে ফেলা হয় এবং পরে কেমোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়। এতে রোগীর শারীরিক অবস্থা মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটে এবং পরিবারটি আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
চিকিৎসাবিদদের মতে, এমন ঘটনা নিছক চিকিৎসাগত ভুল নয়-এটি গুরুতর নৈতিক ও পেশাগত অপরাধ, যা তদন্তসাপেক্ষ।চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি শিক্ষা ব্যবস্থাতেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দৈনিক জাহান-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সিবিএমসিবি-তে রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অনুপস্থিত থেকেও হাজিরা দেখানো এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডা. নাজমা পারভীন আনসারী ও ডা. মির্জা হামিদুল হকের মতো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এসব অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও এখনো পর্যন্ত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।
এদিকে, প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে অনিয়মের তথ্য প্রকাশের পর ডা. শাহনাজ জাহান, যিনি একটি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাকে মানসিক ও প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, সংবাদ প্রকাশের দায় তার ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় চিকিৎসক সমাজের একটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছে, সত্য প্রকাশকারীদের টার্গেট করা হলে স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সচেতন নাগরিক ও ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ময়মনসিংহের চিকিৎসা খাতে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই দালাল ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি ভাঙতে হলে- যা করতে হবে, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, ভুল চিকিৎসার অভিযোগে অভিযুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত, রাষ্ট্রীয় পরীক্ষায় অনিয়মের বিচার, সৎ চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ।বক্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রোগীর জীবন নিয়ে কোনো ধরনের ব্যবসা বা প্রতারণা আর বরদাশত করা হবে না। প্রয়োজনে আইনগত ও গণআন্দোলনের পথেই এই অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হবে।