সকল খবর বিদেশের খবর

মিত্রতা থেকে মুখোমুখি অবস্থান কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নতুন টানাপোড়েন

অনিন্দ্যবাংলা ডেস্ক:

প্রকাশ : ২৫-১-২০২৬ ইং | নিউজটি দেখেছেনঃ ৫০০৯

উত্তর আমেরিকার দীর্ঘতম সীমান্ত একসময় পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র-এই দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বহু দশক ধরে মতপার্থক্য মিটিয়েছে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই সম্পর্কের ভেতর স্পষ্ট উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বক্তব্য ও নীতিগত অবস্থান কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এক নতুন অস্বস্তিকর অধ্যায় তৈরি করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘৫১তম রাজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র নাকি প্রতিবছর কানাডাকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেয় এবং এই সহায়তা ছাড়া দেশটি টিকে থাকতে পারবে না। কানাডা সরকার এই মন্তব্যকে কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত নয়, বরং সরাসরি সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবেও বিবেচনা করছে।

এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দৃঢ় অবস্থান নেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কানাডা কোনো দেশের দয়ায় টিকে নেই; দেশটি তার নিজস্ব মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক কাঠামো ও জাতীয় পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর এই বক্তব্য দ্রুত কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতীয় মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্যিক চাপের আশঙ্কাও সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য শুল্কনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কানাডায়। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ নাগরিকদের মনোভাবেও। মার্কিন পণ্য বর্জন এবং ‘বাই কানাডিয়ান’ ধরনের প্রচারণা জোরালো হচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে কানাডিয়ানদের আগ্রহ কমছে এবং দেশীয় পণ্যের প্রতি ঝোঁক বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উত্তেজনার পেছনে একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে কানাডার সার্বভৌমত্ব নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য, শুল্ককে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা, চীন ইস্যুতে কানাডার অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা বিষয়ে মার্ক কার্নির কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্প।

তবে বাস্তবতা হলো, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি এখনও অত্যন্ত গভীর। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা সীমান্ত অতিক্রম করে। কানাডার রপ্তানির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর, আবার যুক্তরাষ্ট্রের বহু অঙ্গরাজ্যের জন্য কানাডা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার।

তারপরও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনে এই ঘনিষ্ঠতার ভেতর দৃশ্যমান ফাটল তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কূটনৈতিক মহল আশঙ্কা করছে, ঘনিষ্ঠ মিত্রদের মধ্যে এই ধরনের উত্তেজনা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

এই সংকট কেবল অর্থনীতি বা বাণিজ্যের হিসাব নয়; এটি সম্মান, জাতীয় পরিচয় এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই ইউএসএমসিএ (USMCA) চুক্তির প্রথম যৌথ পুনর্মূল্যায়ন কানাডা যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেই পরীক্ষার ফলই নির্ধারণ করবে, উত্তর আমেরিকার এই ঐতিহাসিক মিত্রতা ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবে।