ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে মো. রুকুনোজ্জামান রোকন দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮০ দিন পেরিয়েছে। এই সময়ে নগরের সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিচ্ছন্নতা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, যানজট নিয়ন্ত্রণ, মশক নিধন, সড়কবাতি মেরামত এবং নগর সম্পত্তির GIS-ভিত্তিক তথ্যভান্ডার তৈরির মতো বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই সময়ে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য ৮২২ কোটি ৩০ লাখ টাকার বাজেটও ঘোষণা করা হয়েছে। উন্নয়ন বাজেট ধরা হয়েছে ৬৭৬ কোটি ৩ লাখ টাকা।
তবে ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে প্রশ্ন উঠছে, এসব উদ্যোগের কতটা বাস্তবে সম্পন্ন হয়েছে। কত কিলোমিটার রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ হয়েছে, কত টাকা খরচ হয়েছে, জলাবদ্ধতা কতটা কমেছে, উচ্ছেদের পর দখলমুক্ত জায়গা কতটা টিকে আছে-এসবের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রকাশিত হয়নি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু ও উদ্বোধন করা হয়েছে। এপ্রিল মাসে শম্ভুগঞ্জ বাজার ও প্রধান সড়কের পাশে ফুটপাতসহ আরসিসি ড্রেন নির্মাণের কাজ উদ্বোধন করা হয়।
জুনে ৭ নম্বর ওয়ার্ডে তালুকদারের বাড়ি থেকে ডি. এম. জলিল কবিরের বাড়ি পর্যন্ত আরসিসি ড্রেন ও সড়ক নির্মাণের প্রতিবন্ধকতা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে কয়েকটি রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের কাজ উদ্বোধনের তথ্য প্রকাশ করে সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে সিটি মোড় থেকে হারুন ডাক্তারের বাড়ি পর্যন্ত আরসিসি রাস্তা, চর ঈশ্বরদিয়া বাজার থেকে সোনালী মসজিদ পর্যন্ত আরসিসি রাস্তা, চর ঈশ্বরদিয়া গুচ্ছগ্রামে আরসিসি ড্রেন এবং চর রঘুরামপুরে সিসি রাস্তা নির্মাণের কাজ রয়েছে।
তবে উদ্বোধন করা প্রকল্পগুলোর কতটি ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ হয়েছে, তার প্রকল্পভিত্তিক তালিকা পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহ নগরের দীর্ঘদিনের সমস্যা জলাবদ্ধতা। দায়িত্ব নেওয়ার পর এ সমস্যা মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে বেশ কিছু কার্যক্রম চালানো হয়।
১৩ মে ভারী বৃষ্টির মধ্যে প্রশাসক নিজে ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রমে অংশ নেন। ১৪ জুন আকুয়া-চুকাইতলা এলাকায় ড্রেনেজ ও সড়ক পরিস্থিতি পরিদর্শন করা হয়। সেনবাড়ি এলাকায় ড্রেনের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, ড্রেন ও খাল পরিষ্কারের ফলে আকুয়া ও গোহাইলকান্দি খালে পানিপ্রবাহ ফিরেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা কমেছে। তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে পরিমাপ করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ৮ জুলাই ভারী বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন থাকছে, নতুন ড্রেন নির্মাণ ও খাল পরিষ্কারের পরও কোন কোন এলাকায় পানি জমছে এবং পানি নামতে কত সময় লাগছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। খাল-নালা দখলমুক্ত রাখা, পানি নিষ্কাশনের সংযোগ ঠিক রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে খাল ও ড্রেন খননের জন্য ২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। রাস্তা, ড্রেন ও হাটবাজার নির্মাণে আরও ১০ কোটি টাকা রাখার কথা বলা হয়েছে।
এই অর্থে কোন কোন খাল ও ড্রেন খনন করা হবে, কত কিলোমিটার কাজ হবে এবং কাজ শেষে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা কতটা বাড়বে-এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রকল্পের ফলাফল পরিমাপ করা সহজ হবে।
মাসকান্দা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় ১৫ জুন শতাধিক অবৈধ দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। আগস্টে গাঙ্গিনাপাড়, পালিকা মার্কেট, মেছুয়া বাজার ও দুর্গাবাড়ি রোডেও অভিযান চালানো হয়।
অভিযানের ফলে ফুটপাত ও সড়কের কিছু অংশ দখলমুক্ত হলেও প্রশ্ন রয়েছে উচ্ছেদ করা জায়গাগুলো কতটা স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা যাচ্ছে।
কারণ নিয়মিত নজরদারি না থাকলে উচ্ছেদের পর আবারও একই জায়গায় দোকান বা স্থাপনা গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
তাই ১৮০ দিনের মূল্যায়নে শুধু ‘কতটি স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছে’ নয়, উচ্ছেদের পর কতটি জায়গা এখনো দখলমুক্ত আছে-এই হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।
যানজট নিয়ন্ত্রণে এপ্রিল মাসে চরপাড়া মোড় থেকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা পর্যন্ত অবৈধ পার্কিং ও দোকানপাট উচ্ছেদে অভিযান চালানো হয়।
আগস্টে সি কে ঘোষ রোডে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জায়গায় একটি পার্কিং জোন উদ্বোধন করা হয়। সড়কের ওপর যত্রতত্র গাড়ি রাখা কমানো ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে পার্কিং জোন চালুর পর ওই এলাকায় সড়কের ওপর পার্কিং কতটা কমেছে বা যান চলাচলে কী পরিবর্তন এসেছে, তার কোনো পরিমাপযোগ্য তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও জোর দেওয়া হয়েছে। জুনে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রশাসকের বাজেট বক্তব্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করতে সাড়ে পাঁচ শতাধিক পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে স্বদেশী বাজার, গাঙ্গিনাপাড়, চরপাড়া, মাসকান্দা ও টাউন হল রোডসহ কয়েকটি এলাকায় রাতের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের কথাও জানানো হয়।
তবে নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে প্রতিদিন কত টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, কত টন সংগ্রহ করা হয় এবং কত শতাংশ সঠিকভাবে অপসারণ করা হয়-এসব তথ্য প্রয়োজন।
আগস্টে নষ্ট সড়কবাতি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে।
এই নির্দেশ কার্যকর হলে নাগরিক সেবায় একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা তৈরি হতে পারে। তবে ১৮০ দিনে কতটি অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তার কত শতাংশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান হয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জুনে লার্ভা অনুসন্ধান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হয়। আগস্টে মশক নিধনে ‘ওয়েল বল’ প্রয়োগের কার্যক্রম শুরু করা হয়।
তবে এই পদ্ধতি ব্যবহারের পর মশার লার্ভার ঘনত্ব কতটা কমেছে বা ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে কী পরিবর্তন এসেছে, তার তুলনামূলক তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো GIS-ভিত্তিক নগর তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ। সড়ক, ড্রেন ও সিটি করপোরেশনের স্থাবর সম্পত্তির তথ্য নিয়ে জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই উদ্যোগ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে নগরের রাস্তা, ড্রেন, জমি ও অন্যান্য সম্পত্তির তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনা সম্ভব হবে।
তবে GIS ডাটাবেজ শুধু তৈরি করলেই হবে না। সেটি কতটা হালনাগাদ থাকবে এবং নাগরিকেরা কতটা তথ্য দেখতে পারবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব জমি, মার্কেট, দোকান, পুকুর ও অন্যান্য সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি হলে সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আদায়ে এর ব্যবহার হতে পারে।
২০২৬–২৭ অর্থবছরে সিটি করপোরেশনের প্রস্তাবিত বাজেট ৮২২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব বাজেট ১৪৬ কোটি ২৭ লাখ এবং উন্নয়ন বাজেট ৬৭৬ কোটি ৩ লাখ টাকা।
পরিচ্ছন্নতা খাতে ১৬ কোটি ৬০ লাখ, বিদ্যুৎ ও সড়কবাতিতে ১১ কোটি, রাস্তা-ড্রেন ও হাটবাজারে ১০ কোটি এবং খাল ও ড্রেন খননে ২ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটের আকার বড় হলেও এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ, কত টাকা ব্যয়, কাজ কত শতাংশ শেষ এবং কাজের মান কী-এসব তথ্য প্রকল্পভিত্তিক প্রকাশ করা হলে নাগরিকেরা বাজেটের বাস্তব ফলাফল বুঝতে পারবেন।
১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় ঘাটতি হচ্ছে একটি সমন্বিত কর্মদক্ষতা প্রতিবেদন না থাকা।
এখনো এক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে না-
কত কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ হয়েছে;
কত কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ হয়েছে;
মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে;
কতটি প্রকল্প শেষ হয়েছে;
কতটি চলমান;
কত টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে;
আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব কত বেড়েছে;
কতটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হয়েছে;
উচ্ছেদ করা জায়গার কতটুকু এখনো দখলমুক্ত;
জলাবদ্ধতা কতটি এলাকায় কমেছে;
প্রতিদিন কত টন বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে;
সড়কবাতির কত শতাংশ অভিযোগ ২৪ ঘণ্টায় সমাধান হয়েছে।
এই তথ্যগুলো প্রকাশিত হলে প্রশাসনের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের একটি তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন সম্ভব হবে।
প্রশাসনের প্রথম ১৮০ দিনে বেশ কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন সেগুলোর স্থায়ী ফল পাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো ড্রেন ও খাল রক্ষণাবেক্ষণ, উচ্ছেদ করা জায়গা দখলমুক্ত রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, যানজট কমানো এবং সিটি করপোরেশনের সম্পত্তির সঠিক ব্যবস্থাপনা-এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পরিমাপযোগ্য ফলাফল প্রকাশের।
১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে নগরবাসীর প্রশ্ন তাই খুব সরল-
কতটি কাজ ঘোষণা হয়েছে, সেটি নয়; কতটি কাজ শেষ হয়েছে, কত টাকা খরচ হয়েছে এবং সেই কাজের ফলে নগরবাসীর জীবন কতটা বদলেছে?
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরই ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব হয়ে উঠতে পারে।