ময়মনসিংহে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প; বিশেষত সড়ক, রেল, নগর উন্নয়ন, সিটি কর্পোরেশন অবকাঠামো এবং সরকারি সংস্থার জন্য ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণ প্রদানের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মে জর্জরিত। জালিয়াতি, ভুয়া দলিল, জাল ওয়ারিশান সনদ, মিসকেস জট, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও অযাচিত আপত্তির কারণে প্রকৃত জমির মালিকরা ক্ষতিপূরণ পেতে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
জাল দলিল ও ভুয়া ওয়ারিশান সনদ; সক্রিয় দালালচক্র :
ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র গত কয়েক বছর ধরে জাল দলিল, মিথ্যা ওয়ারিশান সনদ, ফেক নামজারি এবং ভুয়া উত্তরাধিকার দাবি দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকার বড় অংশ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছে।
বিশেষ করে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখিয়ে দলিল তৈরি, অসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ওয়ারিশ দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ দাবি, প্রকৃত মালিকদের নামে জাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি, এক জমির ওপর একাধিক দলিল দেখিয়ে মিসকেস তৈরি, দালালদের মাধ্যমে আপত্তি মামলা দিয়ে ক্ষতিপূরণ স্থগিত করা, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক প্রকল্পে জমির ক্ষতিপূরণ আটকে যায়। প্রকৃত মালিকরা বছর বছর অফিসে ঘুরেও ন্যায্য প্রাপ্য পান না।
গ্রেফতার রুকন-শফিকুলসহ জালিয়াত চক্রের সদস্যরা :
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিক অভিযান চালিয়ে রুকন, শফিকুলসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে জাল দলিল তৈরি, ক্ষতিপূরণ লুটের উদ্দেশ্যে ভুয়া ওয়ারিশ তৈরি, ভুক্তভোগী জমির মালিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, সরকারি কাগজপত্র জাল করা এমন গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। বর্তমানে তারা জেলহাজতে রয়েছেন।
অযাচিত মিসকেসে কাজের গতি থমকে যায় :
জমি অধিগ্রহণে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাগুলোর একটি হলো মিসকেস। দালালচক্র টাকা নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে আপত্তি মামলা দায়ের করে ক্ষতিপূরণ স্থগিত করে রাখে। ফলে- প্রকৃত মালিকরা টাকা পান না, একই জমির ওপর একাধিক দাবি আসে, অফিসকে একের পর এক শুনানি-নথি যাচাইয়ে সময় ব্যয় করতে হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন, এলজিইডি, রেলওয়ে ও বিআরটিএর বিভিন্ন প্রকল্পে এ সমস্যা প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মব্যস্ততা ও চাপ বৃদ্ধি :
ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ফাইল মামলা-দলিল যাচাই করতে হচ্ছে। একই জমির ওপর ৫–১০ জনের দাবি আসায় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে।
এক কর্মকর্তা বলেন; “দলিল যাচাই, ওয়ারিশান যাচাই, নামজারি, সিএস-এসএ–আরএস-বিএস মিলিয়ে শত শত নথি পরীক্ষা করতে হচ্ছে। তার ওপর দালালচক্রের চাপ ও অযাচিত আপত্তি কাজকে আরও কঠিন করছে।”
প্রকৃত মালিকরা ক্ষুব্ধ; অনেক জমির মালিক অভিযোগ করেন,“সরকার টাকা দিয়েছে, কিন্তু দালাল আর জালিয়াতদের কারণে আমরা পাই না।”
“সত্যিকারের দলিলধারী হয়ে ২ বছর ঘুরছি, অথচ ভুয়া দাবি দেখিয়ে আমাদের ক্ষতিপূরণ আটকে দেওয়া হয়েছে।”
এ অবস্থায় তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
প্রশাসনের কঠোর অবস্থান; জালিয়াতি নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন কয়েকটি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে :
নিয়মিত যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন, ভুয়া ওয়ারিশান সনদ শনাক্তে ইউনিয়ন পরিষদ ও এনআইডি ডাটাবেস ক্রসচেক, ভূমি অফিস-সাবরেজিস্ট্রি–অধিগ্রহণ শাখার তথ্য মিলিয়ে দেখা, দালাল চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, কাগজপত্র জালকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক মামলা, প্রশাসনের দাবি, “জমির প্রকৃত মালিক ছাড়া কেউ এক টাকা ক্ষতিপূরণও পাবে না।”
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের ঘোষণা :
জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আজিম উদ্দিন ও এলএ কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা বলেন; “ময়মনসিংহের ভূমি অধিগ্রহণে জালিয়াত চক্র সক্রিয় ছিল। আমরা ইতোমধ্যে বহু মামলায় কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি। সাধারণ মানুষকে অনুরোধ দালালের কাছে যাবেন না, সরাসরি অধিগ্রহণ শাখায় যোগাযোগ করুন।”
ময়মনসিংহে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি জটিল হয়ে পড়লেও প্রশাসন জালিয়াতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে দালালচক্র পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ জমির মালিকদের হয়রানি পুরোপুরি বন্ধ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।