ময়মনসিংহ শহরের কালীবাড়ি রোডে এসকে হাসপাতালের সামনে সরকারি খাস জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগে জেলা প্রশাসন মাঠে নেমেছে। ২৬ জানুয়ারি সোমবার জেলা প্রশাসনের পক্ষে একটি পরিদর্শক দল সরেজমিনে স্থানটি পরিদর্শন করে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ও মাপজোক সম্পন্ন করে। যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জমিটিকে সরকারি খাস জমি হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তবে দখলকারী পক্ষ দাবি করে, উক্ত জমির কিছু অংশের বিএরএস রেকর্ডে তাদের নাম রয়েছে। এ দাবির বিপরীতে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের নায়েব জীবন কুমার বিশ্বাস ও সার্ভেয়ার হুমায়ুন কবীর খান স্পষ্টভাবে জানান-নালিশী জমিটি সিএস রেকর্ড থেকেই সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত। পরবর্তীতে এসএ ও বিএরএস-সব স্তরের রেকর্ডেই জমিটি খাস সম্পত্তি হিসেবে বহাল রয়েছে। এ জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন হওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
পরিদর্শনকালে খাস জমি দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত আহাদ মো. সাঈদ হায়দারের সঙ্গে প্রশাসনিক দলের তর্ক-বিতর্ক হয়। যদিও এ সময় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হয়নি।
ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জীবন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে সরকারি খাস জমি। দখলকারীর উপস্থাপিত দলিল সঠিক নয়। এ বিষয়ে আমরা বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবো। আশা করছি শিগগিরই জমিটি অবমুক্ত করা হবে।”
এ ঘটনায় চর ঈশ্বরদিয়া মৌজার নায়েব আবুল কালাম আজাদের অবস্থান নিয়ে ভিন্নতা ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত সাঈদ হায়দারের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে তিনি দখলকারীর পক্ষ অবলম্বন করছেন। নায়েব আবুল কালাম দাবি করেন, এটি সরকারি খাস জমি নয়, বরং ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রায় ৪ লক্ষ টাকার বিনিময়ে খাস জমিকে ব্যক্তি মালিকানায় রূপান্তরের একটি মৌখিক সমঝোতার কথাও এলাকায় আলোচিত। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপস্থিত জনতা ও স্থানীয় সচেতন মহল নায়েব আবুল কালাম আজাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
বাংলাদেশ বেতার বান্দরবান কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক (অনুষ্ঠান) আহাদ মো. সাঈদ হায়দারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে-সরকারের ১নং খাস খতিয়াভুক্ত জমিতে জাল দলিল ও ভুয়া রেকর্ড সৃজন করে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ করার।
ভূমি অফিস ও জেলা সেটেলমেন্ট রেকর্ডরুমের নথি অনুযায়ী, ময়মনসিংহ টাউন মৌজার সিএস ৯৫ নং খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত সিএস ২৭৫৭ ও এসএ ১০৬৪০ নং দাগভুক্ত জমিটি জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর থেকেই সরকারের নামে ১নং খাস খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত। সিএস, এসএ ও বিএরএস-তিন স্তরের রেকর্ডেই জমিটি সরকারি খাস জমি হিসেবে বিদ্যমান।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই জমিতে ইতোমধ্যে পাকা স্থাপনা, চারদিকে ইটের প্রাচীর এবং বহুতল ভবনের জন্য ছয়তলা ফাউন্ডেশনসহ প্রথম তলার নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ১৯৯২ সালের ৮ মার্চ তারিখে ৩৭৬৫ নং একটি সাফ কবলা দলিল দেখিয়ে দাবি করা হয়-জমিটি নাকি এসএ ৪৩০৪ নং খতিয়ানের আওতাভুক্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি। অথচ স্থানীয় ভূমি অফিস ও জেলা রেকর্ডরুমে এই খতিয়ানের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
উক্ত দলিলে জবেদ আলী সরকার নামে এক ব্যক্তিকে দাতা এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার মা মিসেস সেতারা বেগমকে গ্রহিতা হিসেবে দেখানো হয়। ভূমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, খাস খতিয়ানের জমিকে ব্যক্তি মালিকানায় দেখানোর এ ধরনের দলিল সাধারণত সুপরিকল্পিত জালিয়াতির ফল।
জাল দলিলের ভিত্তিতে বিএরএস ৫২৩৩ নং একটি খতিয়ান সৃজন করা হলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ভূমি অফিস ওই খতিয়ান ব্লক করে দেয়। জমিটির কোনো হোল্ডিং খোলা হয়নি, নিয়মিত খাজনাও পরিশোধ করা যায়নি। এমনকি হোল্ডিং বহিতে জমিটি স্পষ্টভাবে “খাস খতিয়ানের জমি” হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে শুধু টাউন মৌজাই নয়, চর ঈশ্বরদিয়া মৌজার ‘নদী’ শ্রেণিভুক্ত সরকারি জমি (এসএ ১৩৮১, বিএরএস ৩৩১০ দাগ) দখল করে পাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত এক সরকারি পত্রে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে পাঠানো অবৈধ দখলদারদের তালিকায় ৫৩ নম্বরে অভিযুক্ত কর্মকর্তার মাতা মিসেস সেতারা বেগমের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তালিকাটি এখনো কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত রয়েছে।
যখন সরকারি তালিকায় নাম রয়েছে, রেকর্ডে জমি খাস এবং খতিয়ান ব্লক-তখন এতদিন প্রশাসন কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। তাঁদের আশঙ্কা, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রায় ১০ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি ধাপে ধাপে ব্যক্তিগত দখলে চলে যাচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর সরাসরি লঙ্ঘন। পাশাপাশি ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩-এর ধারা ১১ এবং দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অস্তিত্বহীন এসএ খতিয়ান দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি হলো কীভাবে? বিএরএস খতিয়ান ব্লক থাকা সত্ত্বেও নির্মাণ অনুমতি এলো কোথা থেকে? নদী শ্রেণির জমিতে স্থাপনা নির্মাণে কোন দপ্তর দায়িত্ব এড়ালো? প্রশাসনিক নীরবতার দায় কার?
এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর ও দোষীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে, খাস জমি দখল ও সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে; এমন আশঙ্কাই প্রকাশ করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।