ওপেন মেসেজ সম্পাদকীয়

আলোচিত ব্যক্তিরাই সমালোচিত হয়: জনপ্রিয়তার বিষম বসন্ত -কৃষিবিদ মোঃ আতিকুর রহমান!

অনিন্দ্যবাংলা ডেস্ক:

প্রকাশ : ২৮-৩-২০২৫ ইং | নিউজটি দেখেছেনঃ ৫২৬২

মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে কোনো খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের উত্থান একদিকে যেমন প্রশংসা ও জনপ্রিয়তার স্রোত বয়ে আনে, অন্যদিকে ঠিক তেমনভাবেই সমালোচনার ঝড় তোলে। রাজনীতি থেকে বিনোদন, সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান-প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, যেসব ব্যক্তি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন, তাদেরকেই তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। বাস্তবতা হলো, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেই সমালোচনা আসবে- এটাই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন আলোচিত ব্যক্তিরাই সমালোচিত হন?

কেনই বা সাধারণ মানুষের তুলনায় জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ত্রুটি ও বিতর্ক নিয়ে এত বেশি আলোচনা হয়?

এই প্রবন্ধে আমরা সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো, যেখানে থাকবে খ্যাতি ও সমালোচনার পারস্পরিক সম্পর্ক, সমাজ ও মিডিয়ার ভূমিকা, এবং ইতিহাস ও বর্তমানের আলোচিত-সমালোচিত ব্যক্তিদের উদাহরণ।

আলোচিত হলেই কেন সমালোচিত হতে হয়?

একজন ব্যক্তি যখন সাধারণের চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি সবার আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসেন। তার প্রতিটি কাজ, বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষ আলোচনা করতে শুরু করে। এই আলোচনার মধ্যে যেমন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া থাকে, তেমনই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও উঠে আসে।

১. উচ্চ অবস্থানে থাকলেই প্রত্যাশার চাপ বেশি:সমাজের সাধারণ মানুষ জনপ্রিয় ব্যক্তিদের থেকে অতিরিক্ত প্রত্যাশা করে। তারা মনে করে, জনপ্রিয় মানুষদের জীবন হবে একদম নিখুঁত। ফলে তাদের সামান্য ভুলও বড় হয়ে ধরা দেয়। উদাহরণস্বরূপ-

একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেন, তবে সেটি সাধারণ রাজনীতিবিদদের ভুলের তুলনায় বেশি সমালোচিত হয়।

একজন খ্যাতিমান শিল্পী বা লেখকের ছোটখাটো মন্তব্যও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।

সেলিব্রিটিরা যদি সাধারণ মানুষের মতো আচরণ করেন, তাতেও সমালোচনা হয়-আবার ভিন্ন আচরণ করলেও সমালোচিত হন।


২. জনপ্রিয়তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা:কোনো ব্যক্তি যখন আলোচিত হন, তখন তার চারপাশে একটি প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। কিছু মানুষ তাকে অনুসরণ করতে চায়, আবার কেউ কেউ তাকে নিচে নামাতে চায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বীরা সমালোচনার মাধ্যমে তার ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করে।

উদাহরণস্বরূপ-

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তোলে।

সিনেমা বা সংগীত জগতে একজন তারকা জনপ্রিয় হলে, তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য ছড়িয়ে আলোচিত ব্যক্তিদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।

৩. মিডিয়ার ভূমিকা:গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ব্যক্তিদের জীবনযাপন সবসময় চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। মিডিয়া এমনভাবেই সংবাদ প্রচার করে, যাতে বিতর্ক তৈরি হয়।

নেতিবাচক খবর বেশি আকর্ষণীয় বলে মিডিয়া সেটিকে বেশি প্রচার করে।

গসিপ এবং স্ক্যান্ডাল নিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলো বেশি আগ্রহী।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং বিষয়বস্তু সাধারণত বিতর্কিত হয়।

এভাবেই আলোচিত ব্যক্তিরা খুব সহজেই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

ইতিহাসের আলোচিত-সমালোচিত ব্যক্তিরাঃ

রাজনীতিতে সমালোচিত ব্যক্তিত্ব:রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সবসময়ই আলোচনা ও সমালোচনার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট: ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের পর তিনি এক মহান সেনাপতি ও শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন, কিন্তু তার সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ও যুদ্ধবাজ নীতির জন্য তাকে নিষ্ঠুর বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

আব্রাহাম লিংকন: দাসপ্রথার বিলোপ সাধনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও, তার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।

সুবাস চন্দ্র বসু: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অনেকেই তাকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছেন।

মাও সেতুং: চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের জন্য আলোচিত হলেও তার কঠোর শাসনের কারণে সমালোচিতও হয়েছেন।

বারাক ওবামা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আলোচিত হলেও, তার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়া: মাদার অব ডেমোক্রেসি খ‍্যাত আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও দুটি দুর্নীতির মিথ্যা মামলা দিয়ে সমালোচনায় জর্জরিত করা হয়েছে। জনগণের নেত্রী হিসেবে বারবার নির্বাচিত হওয়া এবং গণমানুষের ভালোবাসা পাওয়ার কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বরাবরই তাকে হেয় করার চেষ্টা করেছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে:বিজ্ঞানীদের অনেক যুগান্তকারী আবিষ্কার প্রথমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।

গ্যালিলিও গ্যালিলি: তিনি যখন বলেছিলেন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন তিনি চরম সমালোচনার শিকার হন।

চার্লস ডারউইন: তার বিবর্তনবাদ তত্ত্ব ধর্মীয় গোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।

এলন মাস্ক: টেসলা, স্পেসএক্স ও নিউরালিংকের মতো উদ্যোগ তাকে বিশ্বব্যাপী আলোচিত করেছে, তবে তার কাজের ধরন ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক বিতর্কও রয়েছে।

নিকোলা টেসলা: বৈদ্যুতিক শক্তির ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া এই বিজ্ঞানী তার সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকায় বিতর্কিত হয়ে উঠেছিলেন।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন: আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বিশ্বে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল, কিন্তু তার তত্ত্ব নিয়ে সংশয়বাদীরাও কম ছিলেন না।

বিনোদন জগতে:বিনোদন জগতের দরজায় সমালোচনার আঘাত বেশি কড়া নাড়ে।

মাইকেল জ্যাকসন: পপ সংগীতের কিংবদন্তি হলেও ব্যক্তিগত জীবন ও মামলার কারণে ব্যাপক সমালোচিত হন।

শাহরুখ খান: বলিউডে রাজত্ব করলেও তার ধর্ম ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রায়ই সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়।

টেইলর সুইফট: তার সংগীত প্রতিভার পাশাপাশি প্রেমজীবন ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তিনি প্রায়ই বিতর্কে জড়ান।

মার্লিন মনরো: তার জীবন, প্রেম, ও মৃত্যু আজও এক রহস্য, একদিকে সাফল্য, অন্যদিকে সীমাহীন কুৎসা।

লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও: অভিনয়ে অসামান্য দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বহু বছর ধরে তাকে অস্কার না দেওয়া নিয়ে বিতর্ক ছিল।

হুমায়ুন আহমেদ: এই কথাসাহিত্যিক উপন্যাস-নাটক-সিনেমা দিয়ে চরম জনপ্রিয় থাকার পরও ব‍্যাক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচনার শিকার হয়েছেন।

সমালোচনা কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত?

যারা আলোচিত, তাদের জন্য সমালোচনা অনিবার্য। কিন্তু এটি কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত?

মানসিকভাবে শক্ত থাকা: সমালোচনাকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ করা: সব সমালোচনা খারাপ নয়, কিছু সমালোচনা থেকে শেখা উচিত।

সঠিক তথ্য তুলে ধরা: ভুল বা মিথ্যা প্রচার হলে তার বিরুদ্ধে সত্য তথ্য প্রচার করা উচিত।

শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী থাকা: প্রতিটি সমালোচনার জবাব দেওয়া জরুরি নয়, কিছু সময় চুপ থাকাও কার্যকর হতে পারে।

আলোচিত ব্যক্তিরাই সমালোচিত হয়”—এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। খ্যাতি যত বেশি, সমালোচনাও তত বেশি। রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, শিল্পী, খেলোয়াড়—যেই হোক না কেন, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলে তাকে সমালোচনা সহ্য করতেই হবে।

তবে সমালোচনা সবসময় খারাপ নয়। এটি যদি গঠনমূলক হয়, তাহলে ব্যক্তির উন্নতির পথ দেখাতে পারে। যারা প্রকৃত কাজ করে, তারা সমালোচনাকে ভয় পায় না। বরং তারা নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল থাকে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সত্যিকারের মূল্যায়ন হয়।

যারা আলোচনায় আসে, ইতিহাসে তাদের নামই থেকে যায়—সমালোচনার সঙ্গে, কিন্তু অমরত্বের গৌরবে।


লেখক কৃষিবিদ মোঃ আতিকুর রহমান

শিক্ষার্থী, মাস্টার্স ১ম সেমিস্টার

এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

এবং

আহ্বায়ক

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল