অনিন্দ্য আড্ডা লোক বাংলা

হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য : ভাট কবি ও কবিতা

মজিবুর রহমান শেখ মিন্টু

প্রকাশ : ৩১-১০-২০২৬ ইং | নিউজটি দেখেছেনঃ ৫১৩০

একসময় গ্রামবাংলার হাটে-বাজারে, মেঠোপথে কিংবা মানুষের কোনো জনসমাগমে হঠাৎ শোনা যেত ছন্দময় কণ্ঠের ডাক। কোনো কবি দাঁড়িয়ে আছেন মানুষের ভিড়ের মধ্যে। তাঁর হাতে হয়তো কাগজের পুঁথি, কাঁধে ঝোলা, মুখে ছন্দের প্রবাহ। তিনি কবিতা শোনাচ্ছেন। কখনো হাস্যরস, কখনো ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, কখনো প্রেম-বিরহ, আবার কখনো সমাজের অন্যায়-অবিচার কিংবা সমকালীন কোনো আলোচিত ঘটনা তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে উঠছে। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনছেন। কেউ হাসছেন, কেউ বিস্মিত হচ্ছেন, কেউবা কবিতার কথায় খুঁজে পাচ্ছেন নিজেদের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

এই কবিরা ছিলেন ভাট কবি। আর তাঁদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া ছন্দময় রচনাগুলো পরিচিত ছিল ভাট কবিতা নামে। গ্রামবাংলার লোকসাহিত্যের এই বিশেষ ধারাটি একসময় মানুষের বিনোদন, সংবাদ পরিবেশন, সামাজিক সচেতনতা এবং জনমত প্রকাশের এক অভিনব মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। অথচ সময়ের প্রবাহে সেই কবি, সেই কবিতা, সেই আসর-সবকিছুই আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে বসেছে।

ভাট কবিতা মূলত লোকজ জীবন ও জনপদের অভিজ্ঞতানির্ভর এক ধরনের মৌখিক সাহিত্য। এর প্রধান শক্তি ছিল মানুষের মুখের ভাষা, সহজ ছন্দ, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ এবং সমকালীন ঘটনাকে কবিতায় রূপ দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও অনেক ভাট কবি তাঁদের সৃজনশীলতা ও স্মৃতিশক্তির মাধ্যমে সমাজের নানা বিষয়কে কবিতায় তুলে ধরতেন। তাঁদের কবিতায় যেমন থাকত হাস্যরস ও কৌতুক, তেমনি থাকত জীবনবোধ, প্রতিবাদ, নৈতিক শিক্ষা এবং সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন।

ভাট কবিতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল এর তাৎক্ষণিকতা। কোনো এলাকায় বিশেষ ঘটনা ঘটলে, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অন্যায় করলে, কোথাও বন্যা কিংবা দুর্যোগ দেখা দিলে অথবা কোনো সামাজিক ঘটনা মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলে ভাট কবিরা সেই বিষয়কে অবলম্বন করে কবিতা রচনা করতেন। কখনো নিজেরাই পরিবেশন করতেন, কখনো অন্যদের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ত। ফলে একটি কবিতা দ্রুত এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে, এক হাট থেকে অন্য হাটে পৌঁছে যেত। সংবাদপত্র, বেতার কিংবা আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের আগের সময়ে এই কবিতাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটা চলমান সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা পালন করত।

ভাট কবিরা শুধু কবিতা পাঠ করতেন না; তাঁরা ছিলেন এক অর্থে সমাজের পর্যবেক্ষক ও কথক। তাঁদের চোখ এড়িয়ে যেত না গ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, সামাজিক বৈষম্য, জমিদারি অত্যাচার, পারিবারিক বিরোধ কিংবা ক্ষমতাবানদের নানা কর্মকাণ্ড। অনেক সময় সরাসরি প্রতিবাদ করার সুযোগ না থাকলেও কবিতার ব্যঙ্গ ও রসিকতার মধ্য দিয়ে তাঁরা সমাজের অসংগতি তুলে ধরতেন। শ্রোতারা কবিতার আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি তার অন্তর্নিহিত বক্তব্যও বুঝতে পারতেন। এভাবেই ভাট কবিতা হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষের অনুভূতি প্রকাশের একটি শক্তিশালী লোকজ মাধ্যম।

ভাট কবিতার ইতিহাস ও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য কবি

ভাট কবিতার ইতিহাস শুধু সাম্প্রতিক সময়ের নয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই এ ধরনের কবিতা মুদ্রিত পুঁথি বা ছোট ছোট পুস্তিকার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাতে শুরু করে। বিভিন্ন গবেষণামূলক লেখায় মুন্সি আব্দুর রহমানের ‘১২৮০ সালের দুর্ভিক্ষের পুঁথি’, ওয়াইজদ্দিনের ‘গরকির বচন’ এবং কোরবান উল্লাহর ‘খণ্ড প্রলয়’ (১৮৭৭) প্রাচীন ভাট কবিতার উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হিসেবে আলোচিত হয়েছে। দুর্ভিক্ষ, মহামারি, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও সামাজিক বিপর্যয় এসব রচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছিল।

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য হাটুরে ও ভাট কবির আবির্ভাব ঘটে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন-

শামসুদ্দিন মিয়া: ঝিনাইদহের শৈলকুপা অঞ্চলের এই কবি ভাট বা হাটুরে কবিতার পরিচিত রচয়িতা হিসেবে আলোচিত। সমকালীন ঘটনা ও সমাজবাস্তবতা ছিল এ ধারার কবিদের অন্যতম উপজীব্য।

ইউসুফ খান: হাটুরে কবিতার পরিচিত কবি। তাঁর পুত্র জালাল খান ইউসুফীও পরবর্তী সময়ে এই সাহিত্যধারার গুরুত্বপূর্ণ রচয়িতা ও সংগ্রাহক হিসেবে পরিচিতি পান।

জালাল খান ইউসুফী: সিলেটের ওসমানীনগরের প্রথমপাশা গ্রামের এই কবি ও সংগ্রাহক হাটুরে কবিতার অন্যতম পরিচিত নাম। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য পুঁথির মধ্যে রয়েছে ‘মনির-খুকুর ফাঁসি’, ‘তোরাব আলী ও রোকেয়া সুন্দরীর প্রেমকাহিনি’, ‘ইরাক-আমেরিকার যুদ্ধ’, ‘চিত্রনায়ক সালমান শাহের রহস্যজনক মৃত্যুর কাহিনি’, ‘সূচরাজা ও সুখপাখির কবিতা’ এবং ‘লাইলী-মজনুর প্রেমকাহিনি’। তাঁর সংগ্রহে প্রায় তিন শ গ্রামীণ কবির লেখা পাঁচ শয়ের বেশি হাটুরে কবিতার পুঁথি রয়েছে বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে।

আব্দুল করিম খান, মোকছেদ আলী ও সোলায়মান খোয়াজপুরী: হাটুরে কবিতার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্য নাম। এ ছাড়া আহমেদ রহমান, নাজির হোসেন পণ্ডিত, নাজিরুজ্জামান, আব্দুল কুদ্দুছ, ওসমান গনি, নুরুল হক সরকার, রহমত আলী, সেকেন্দার আলী, চাঁদ মিয়া, আসগর আলী সরকার ও আবুল কালামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক কবি এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন।

এই কবিদের রচনায় প্রেম-বিরহ, সামাজিক ঘটনা, রাজনৈতিক আন্দোলন, যুদ্ধ, অপরাধ, ধর্মীয় অনুভূতি এবং মানুষের বিচিত্র জীবনকাহিনি স্থান পেয়েছে।

কবিতার কয়েকটি পরিচিত শিরোনাম ও নমুনা

ভাট কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অনেক সময় কবিতার শিরোনামেই পুরো ঘটনার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন-

  • ‘১২৮০ সালের দুর্ভিক্ষের পুঁথি’ -মুন্সি আব্দুর রহমান।

  • ‘গরকির বচন’ - ওয়াইজদ্দিন।

  • ‘খণ্ড প্রলয়’ - কোরবান উল্লাহ।

  • ‘মনির-খুকুর ফাঁসি’ - জালাল খান ইউসুফী।

  • ‘তোরাব আলী ও রোকেয়া সুন্দরীর প্রেমকাহিনি’ - জালাল খান ইউসুফী।

  • ‘ইরাক-আমেরিকার যুদ্ধ’ - জালাল খান ইউসুফী।

  • ‘রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের রহস্য’ - জালাল খান ইউসুফীর সংগৃহীত পুঁথির তালিকায় উল্লেখিত।

  • ‘১১ দফা দাবি ও গণতন্ত্রের কবিতা’ - জালাল খান ইউসুফীর সংগৃহীত পুঁথির তালিকায় উল্লেখিত।

এখানে কবিতার মূল পঙ্‌ক্তির পরিবর্তে যাচাইযোগ্য গ্রন্থ ও পুঁথির শিরোনাম দেওয়া হলো। কারণ এসব পুরোনো রচনার পূর্ণাঙ্গ পাঠ সব ক্ষেত্রে সহজলভ্য নয়।

তবে ভাট কবিতার আঙ্গিক ও ভাষার একটি সুন্দর নমুনা পাওয়া যায় সজলকান্তি সরকারের ‘হাওর কাহন’ রচনায়। এটি হাওর অঞ্চলের জীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে লেখা একটি আধুনিক ভাট কবিতা।

কবিতাটির কয়েকটি পঙ্‌ক্তি-

“কালিদহ সাগর ছিল, এই হাওর তখন তার পরের-কথা, ভিন্ন বার্তা, কী বলিব আর, পলি জমে ভরে উঠে, হাওরেরও পাড়।”

এই কয়েকটি পঙ্‌ক্তির মধ্যেই রয়েছে হাওরের ভূপ্রকৃতি, ইতিহাস ও পরিবর্তনের স্মৃতি। পরবর্তী অংশে কবি তুলে ধরেছেন মাছ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, মানুষের পেশা এবং হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ জীবনযাত্রার কথা। এভাবে পুরোনো ভাট কবিতার আঙ্গিককে ব্যবহার করে সমকালীন পরিবেশ ও সমাজের সংকটও তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।

সংগৃহীত ২টি ভাট কবিতার কিছু অংশ

সংগৃহীত ভাট কবিতা-১

আল্লাহু আকবর বাংলাদেশ জিন্দাবাদ

কবিতা : পিরিতের জেল

রচয়িতা : বাউল ফজলু মিয়া

প্রকাশক: কবি মো. নূরুল ইসলাম গজনভী

রেলওয়ে স্টেশন মসজিদ কোয়ার্টার গৌরীপুর, ময়মনসিংহ।

মূল্য- ২.০০ টাকা

প্রথম মুর্শিদ নামটি ২ জানি খাঁটি অন্তরে আমার মাতা পিতার চরণ বন্দি আমি গোনাগার কবি ফজলু মিয়া ২ যাই লিখিয়া পিরিতের শেল পিরিত করে খেটে আইল পিরিতেরি জেল।

জিলা রংপুরেতে ২ আছে তাতে ফুলবাড়িয়া গ্রাম সেই গ্রামেতে বাস করিত আ. মজিদ নাম তাহার দুটি ছেলে ২ একটি মেয়ে লিখিয়া জানাই অতি সুখে আছে তাহার কোনো অভাব নাই।

মেয়ে বুদ্ধিমতি ২ জ্ঞান অতি রূপে নহে কম আদর করে নামটি রাখে আছিয়া বেগম দিলো ইস্কুলেতে ২ আনন্দেতে লেখাপড়া করে কিছুদিন পরে তাহার পিতা গেল মরে।

আছে সেই গ্রামেতে ২ পাই জানিতে রমিজ আলী নাম তাহার ছেলে রজব আলী লিখে জানাইলাম 

পড়ে ইস্কুলে ২ যাই বলে সবে আদর করে আছিয়া আর রজব মিয়া এক ইস্কুলে পড়ে। 

তারা দুই জনে ২ এক মনে স্কুলেতে যায় ছোট হইতে ভালোবাসা তারা দুই জনায় 

এসব ছেড়ে দিয়া ২ যাই লিখিয়া, শুনেন বন্ধুগণ ক্লাস টেনে পড়ে বিবি আছিয়া তখন। 

বয়স ১৭ বছর হইল ২ তারপর বিবি আছিয়ার যৌবনে মারিল উঁকি বুকেতে তাহার

তাহার রূপের কথা ২ ভদ্রশ্রোতা কবিতায় প্রকাশি আকাশের চন্দ্র যেমন ধরায় পড়ল খসি। 

শাড়ি বানারসি ২ পিনছে কষি ব্লাউজ পরছে কালা তার নিচে আছে দুইটি রসের কমলা 

মনে নাহি মানে ২ বুকের পানে চাইলে তাহার সারা দেহে আসিয়াছে যৌবনের জোয়ার। 

মাথায় তেরি সিতা ২ ঠোঁটে আলতা কালো চুলের বেণি ইস্কুলেতে যায় গো যেমন পরীস্থানের রানি 

মুখে মুচকি হাসি ২ দিবা নিশি সাজিয়া বেড়ায় জানিয়া এই পরশ মণি কোন রসিকে পায়। 

হায়রে কাল যৌবনে ২ ঠেকাইল বিবি আছিয়ারে লেখাপড়া লয় না মনে প্রাণে কেমন করে 

বিবি আছিয়ার ২ বলছে হায়, কী করি এখন বিফলতে যাবে আমার সোনার যৌবন। 

যদি থাকত পিতা ২ দিত বিয়া আদর করিয়া মনের আশা মিটাইতাম স্বামীকে লইয়া

সতী ভাবে মনে ২ স্বামী বিনে নাহি মোর গতি রজবকে বানাব আমার যৌবনের সাথি।

একদিন রজব মিয়া ২ আর আছিয়াতে ইস্কুলেতে যায় রাস্তাতে বসিল দুই জন গাছের তলায় 

তখন আছিয়া ২ দেখে চাইয়া আমগাছের ডালে পাখি দুইটি বসে আছে কেমন জোড়া মিলে।

করছে কুলাকুলি ২ পাখি দুইটি মুখে মুখ লাগাইয়া রজবকে দেখাইল তখন হাতেনাতে ধরিয়া 

রজব পাখি দেখে ২ আছিয়াকে বলে বুঝাইয়া স্বামী-স্ত্রী তারা দুইজন ডালেতে বসিয়া।

খেলছে প্রেমের খেলা ২ মন উতলা আনন্দে মাতিয়া কত দেশে যায় গো তারা আকাশে উড়িয়া 

শুনে আছিয়ায় ২ বলে যায় তার গলায় ধরে পাখির মতো ভালোবাসি আমি যে তোমারে। 

তুমি আমার স্বামী ২ হইলাম আমি চরণের দাসী তুমি আমার জীবন যৌবন হাতের মোহন বাঁশি 

বাজাও আস্তে ধীরে ২ মধুর সুরে হাসি দিয়া বলে স্ত্রীর বেহেশত জানি স্বামীর পায়ের তলে। 

শুনে রজব মিয়া ২ যায় বলিয়া একি শুনতে পাই এই দেশেতে বড় গুণ্ডা তোমার দুইটি ভাই 

যদি জানতে পারে ২ মারবে ধরে প্রাণ যাবে মোর একা বাপের ছেলে আমি লাঠির নাহি জোর। 

শুনে আছিয়ায় ২ বলে যায় চিন্তার নাই কারণ আমি থাকতে কে মারিব তোমার জীবন 

তুমি যদি পার ২ উকিল ধর অতি তাড়াতাড়ি আমার ভাইদের কাছেতে যাও বিয়ার প্রস্তাব করি। শুনে কয় তোমায় লইয়া যাব দেশ ছাড়িয়া। 

পরে রজব মিয়া ২ করতে বিয়া উকিল পাঠাইল আছিয়ার ভাই সকলে শুনে গোস্বা হইল বলে উকিলেরে ধমক মেরে অপমান করিয়া তাহার মতো ছেলের কাছে নাহি দিব বিয়া। 

পরে আছিয়ারে ২ ইস্কুলেতে নাহি দিলো আর লেখাপড়া বন্ধ করল ভাই সকলে তার 

কান্দে আছিয়া ২ ব্যথা পাইয়া নিরলেতে বসি রজবেরে না পাইলে গলায় লইব ফাঁসি। 

কবি ফজলু মিয়া ২ যাই লিখিয়া শুনেন শ্রোতাগণ এই ভাবেতে কিছুদিন গত হয় যখন।

একদিন রাত্রিকালে ২ আইল চলে আছিয়া সুন্দরী রজবেরে বলে তখন এসে তার বাড়ি।

চল তাড়াতাড়ি ২ সয় না দেরি সময় বয়ে যায় তোমায় নিয়ে ভিক্ষা করে খাব দুনিয়ায় 

তখন রজব মিয়া ২ পাগল হইয়া কিবা করে গেল আছিয়াকে নিয়া তখন ঘরের বাহির হইল।

গেল চন্দনপাড়া ২ নহে দুরা তাহার খালার বাড়ি গোপনেতে রইল তারা এক সপ্তাহ ভরি 

রাত্রি পোহাইল ২ জানতে পারল তাহার ভাই সকলে আছিয়া চলে গেছে রজব মিয়ার সনে।

তাহার ভাই সকলে ২ উঠিল জ্বলে আগুনের মতন থানাতে এজাহার করে গোপনে তখন 

পরে দারোগায় ২ চলে যায় আসামী ধরিতে ডাকাতি কেইছ দিলো তারা রজবের নামেতে।

ছাড়ি এসব কথা ২ ভদ্রশ্রোতা শুনেন দিয়া মন রজব মিয়া কিবা করে করে যাই বর্ণন 

বিবি আছিয়ারে ২ নিয়া পরে কাজীর বাসায় গেল মেয়ের কথায় কাজী সাহেব বিয়া পড়াইল। 

পরে এই ভাবেতে ২ গোপনেতে কিছুদিন গেল দারোগার হাতে এক দিন ধরা পরে গেল 

পরে দারোগায় ২ রজবেরে চালান করে দিলো হাজতখানায় নিয়া তারে আটক করিল। 

পরে আছিয়ায় ২ উকিল ধরে দরখাস্ত করিল রজব মিয়া জামিনেতে বাড়ি চলে আইল 

শত চেষ্টা করে ২ ভাই সকলে বিবি আছিয়ার আছিয়াকে বাধ্য করতে না পারিল আর। 

চলে মোকাদ্দমা ২ খাতির জমা এসডিও কোর্টেতে মিথ্যা মামলা লাগাইল গিয়া ফৌজদারিতে 

মামলার তারিখ আইল ২ বাদী গেল সাক্ষীগণকে নিয়া সাক্ষীগণে মিথ্যা সাক্ষী দিলো টাকা খাইয়া। 

করল চালাকি ২ দিলো ফাঁকি আছিয়ার উকিলে টাকার লোভে আইন নিল নিজের হাতে তুলে 

উকিল ঘুষ খাইয়া ২ যায় চলিয়া বাদীর পক্ষেতে মামলাখানি নষ্ট হইল উকিলের দুষেতে। 

হাকিম সাক্ষী হইল ২ আইনে হইল রজব মিয়ার জেল ডাকাত বলে দিলো তারে ১২ বছরের জেল 

শুনে আছিয়ায় ২ হায়রে হায় চিৎকার মারিল হাকিমের সম্মুখেতে ঢলিয়া পড়িল।- (চলবে)

সংগৃহীত ভাট কবিতা-২

আল্লাহু আকবার বাংলাদেশ জিন্দাবাদ

মাওই পুত্রায় ধরা পড়ছে ছাগল বেইচ্চা বিয়া করছে

কবিতা

পুত্রার প্রেমে মাওই সাফ তালই বলে বাপরে বাপ

নতুন স্বাদে ভরপুর ভাটির দেশের খাঁটি সুর

প্রণেতা: কবি মো. ইসমাইল আলী খান

প্রাপ্তিস্থান: আলেয়া বুক ডিপো, ৬নং আহসান উল্লা রোড, ঢাকা ১১০০

লাইসেন্স নম্বর-১৭১৩, মূল্য-৩.৫০ টাকা

প্রথম কলম ধরি ২ স্মরণ করি, প্রভু নিরাঞ্জনে।

(তারপর) কবিতা লেখিতে বইলাম দেখিয়া নয়নে।

বিশ্ব পরয়ারে ২ এ সংসারে, যা কিছু বানায়। সব কিছু বানাইছে মাওলায় নিজের মহিমায়।

দেখ গাছের পাতা ২ কত তিতা, মিষ্টি গাছের ফল। নারিকেলের শুকনা ছোলা মধ্যখানে জল।

কত মরা গাছে ২ ফুল ফুটাইছে, আপে সাঁই রব্বানা। আমি অধম কি বুঝাব করিয়া কল্পনা।

কত খুনির সাথে ২ খোদার সাথে, চলতেছে কারবার। নিজাম খুনি ছিল শুনি ডাকাতের সরদার।

শত খুন করিয়া ২ বসে যাইয়া, মরা গাছের তলে। একটা খুনের পুণ্যে মিয়ার গাছ ভরিল ফুলে।

বানাই মানব জাতি ২ প্রেম পিরিতি, দিছে তাদের মাঝে। প্রেমের খেলা খেলতে বলছে ভালো মন্দ বুঝে।

দিছে ধম কর্ম ২ ভবের মর্ম, মানুষের ভিতরে। নিজের হাতে বিচার করবে কঠিন হাশরে।

আমরা ভাও বুঝি না ২ ধার ধারি না, জাতি উপজাতি। রেস্তা-ফেস্তা মানি নারে যখন নিভায় বাতি।

আমরা ভবে আইয়া ২ যাই ভুলিয়া, এই সমস্ত সব। পুণ্য ফেলে সবাই মিলে করতে আছি পাপ।

লেখতে এসব কথা ২ ঘুরে মাথা, ব্যঙ্গে হাসি পায়। ছাগল বেইচ্চা বিয়া করছে মাওইরে পুত্রায়।

জেলা বরিশালে ২ তালবেতালে,করিম মোকাম। হাল জেলা পটুয়াখালী বট কাজল গ্রাম।

থানা বাউফলে ২ কেহ বলে, ছাগলচোরা হাটে। পুত্রার বাচ্চা কেমনে লইল মাওই সাফের পেটে।

করে কানাকানি ২ জানাজানি, দেশ গেছে ভড়িয়া। আমি অধম বসে পড়লাম কাগজ কলম লইয়া।

একটু লিখে যাই ২ ভাইরে ভাই, শুন মনো দিয়া। হাসতে হাসতে হাতের কলম যাইতেছে পরিয়া।

মাওইর বয়স বেশি না ২ আছে জানা, ত্রিশের উপরে। তালই ছাড়ছে ভবের মায়া চৌদ্দ বৎসর ধরে।

হইছে কাঁচা রাঢ়ি ২ সবুর করি, রইছে এতকাল। আজকে বুঝি পুত্রা আইসা বাজাইছে জনজাল।

মাওইর একটি ছেলে ২ একটি মেয়ে, আগুন বরাবর। মেয়েটিকে দিছে বিয়ে জামাই মাতব্বর।

ছেলে পড়তে আছে ২ লেখতে আছে, আনন্দ হৃদয়। লেটার পাইয়া পাস করিছে মেট্রিক পরীক্ষায়।

নাম তার মানিক মিয়া ২ যাই বলিয়া, শুনেন সকলায়। কলেজেতে ভর্তির আশায় ঘুরিয়া বেড়ায়।

ভর্তির তারিখ হলে ২ যাবে চলে, থাকবে না আর বাড়ি। মায় বলে তুই বিহনে আমি যাব মরি।

এমনি মায়ে পুতে ২ দিনে রাতে, কান্দিয়া কাটায়। দেখেন কি তামশা পয়দা করিল খোদায়।

একদিন বিকালবেলা ২ ফুটবল খেলা, দেখিতে যাইয়া। খান সাহেবের পুত্রের সাথে দুস্তি বানাইয়া।

লইয়া আইছে বাড়ি ২ তাড়াতাড়ি, বসায় বারান্দায়। চিনির শরবত এনে দিলো মানিক মিয়ার মায়।

তার পর জিজ্ঞাস করে ২ ধীরে ধীরে, কোথায় বাড়ি ঘর। কী নাম তোমার মাতাপিতার কী নামটি তোমার।

ছেলে তাই শুনিয়া ২ হাসি দিয়া, বলছে মাওইর কাছে। মানিক আমার ক্লাস ফ্রেন্ড পড়ছি এক ক্লাসে।

ঐ যে পূর্ব পাড়ায় ২ মেম্বার মিয়ায়, আছমত শালী খান। (চলবে)

নেত্রকোনার ভাট কবিতা : লোকজ ঐতিহ্যের বিস্মৃত অধ্যায়

নেত্রকোনা জেলা এই লোকজ সাহিত্য-সংস্কৃতির আলোচনায় বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের ভাটি অঞ্চলের এই জনপদ দীর্ঘদিন ধরে লোকগান, পালাগান, বাউলগান, জারিগান, সারিগান, কবিগান এবং নানা ধরনের মৌখিক সাহিত্যচর্চার জন্য পরিচিত। হাওর, নদী, খাল-বিল, কৃষিনির্ভর জীবন এবং গ্রামীণ জনপদের বিচিত্র অভিজ্ঞতা এখানকার লোকসংস্কৃতিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। সেই সাংস্কৃতিক পরিবেশেই ভাট কবিতা মানুষের কাছে পৌঁছেছিল নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি নিয়ে।

নেত্রকোনার গ্রামীণ জনজীবনে হাট-বাজার ও মেলা ছিল শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এগুলো ছিল মানুষের মিলন, সংবাদ বিনিময়, আনন্দ-বিনোদন এবং সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র। ভাট কবিরা এসব জনসমাগমকে তাঁদের কবিতা পরিবেশনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। তাঁদের কবিতায় উঠে আসত স্থানীয় মানুষের পরিচিত ঘটনা, জনপদের স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, হাসি-কান্না এবং সময়ের নানা পরিবর্তন।

নেত্রকোনার ভাট কবিতার ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে কয়েকটি নাম বিশেষভাবে সামনে আসে।

প্রয়াত কবি ফজলু মিয়া: নেত্রকোনার কেন্দুয়া অঞ্চলের ভাট কবিতার ঐতিহ্যে তাঁর নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর শিষ্য লিটন মিয়ার মাধ্যমে তাঁর রচিত কবিতার পরিবেশনা ও স্মৃতি এখনো টিকে আছে। ‘ছায়ামতি দস্তরআলী’র কাহিনি তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি উল্লেখযোগ্য রচনা।

লিটন মিয়া: কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী ইউনিয়নের আমতলা গ্রামের এই কবি ও পরিবেশক প্রয়াত ফজলু মিয়ার শিষ্য। ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত ভাট কবিতার আসরে তিনি সুর ও ছন্দে ‘ছায়ামতি দস্তরআলী’র কাহিনি মুখস্থ পরিবেশন করেন। তাঁর পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের আকৃষ্ট করে।

নূরুল ইসলাম: কেন্দুয়ার ভাট কবিতা বিষয়ক সাহিত্য আসরে তাঁকে ভাট কবিতার লেখক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে তিনি ভাট কবিতার ইতিহাস, বিষয়বস্তু ও পরিবেশনার ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করেন।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, নেত্রকোনার সব লোককবি বা লোকসংগীত শিল্পীকে ভাট কবি বলা যাবে না। যেমন উকিল মুন্সি ও জালাল উদ্দীন খাঁ এ অঞ্চলের বিখ্যাত লোককবি হলেও তাঁদের পরিচিতি মূলত লোকগানের রচয়িতা হিসেবে। ভাট কবিতার পৃথক পরিচয় ও সাহিত্যরীতি রয়েছে।

কেন্দুয়ায় ভাট কবিতার পুনর্জাগরণের উদ্যোগ

ভাট কবিতার ঐতিহ্য যে একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি, তার একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত একটি সাহিত্য আসরে।

কেন্দুয়ার সাহিত্য সংগঠন ‘চর্চা সাহিত্য আড্ডা’ এই আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লোকসংগীত শিল্পী কুদ্দুস বয়াতী। আলোচনায় অংশ নেন ভাট কবিতার লেখক নূরুল ইসলাম, পালা নাট্যকার ও লোকসাহিত্য গবেষক রাখাল বিশ্বাস, কবি ও লোকসাহিত্য গবেষক আবুল বাসার তালুকদারসহ স্থানীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

অনুষ্ঠানে প্রয়াত কবি ফজলু মিয়ার শিষ্য লিটন মিয়া তাঁর গুরু-সম্পর্কিত ‘ছায়ামতি দস্তরআলী’র কাহিনি পাঠ করে শোনান। আলোচনায় উঠে আসে, ভাট কবিতা একসময় গ্রামীণ মানুষের আনন্দ-বিনোদন, ইতিহাস জানা এবং সমকালীন ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল।

এই আয়োজন শুধু একটি সাহিত্যসভা ছিল না; বরং হারিয়ে যেতে বসা একটি লোকজ ঐতিহ্যকে নতুন করে পরিচিত করার প্রয়াস।

নেত্রকোনার লোকসাহিত্য নিয়ে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে হামিদুর রহমানের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর ‘নেত্রকোনার লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থে এ অঞ্চলের বিভিন্ন লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। এ ছাড়া নেত্রকোনার লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে প্রকাশিত গবেষণামূলক গ্রন্থগুলোতে কবিগান, ঘাটুগান, বাউলচর্চা, ভাটিয়ালি, সারি, জারি, গাইনের গীত, ধামাইল, মেয়েলি গীত, লোকছড়া ও প্রবাদ-প্রবচনের আলোচনা রয়েছে।

তবে নেত্রকোনার ভাট কবিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, তাঁদের রচিত কবিতার নাম, পাণ্ডুলিপি এবং পরিবেশনার ইতিহাস এখনো যথেষ্ট অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে ভাট কবিতার ঐতিহ্য?

আধুনিক বিনোদনব্যবস্থা, টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের সাংস্কৃতিক অভ্যাসেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো হাটে-বাজারে কবিতা শোনার পরিবেশ নেই। ভাট কবিদের অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন। তাঁদের রচিত অসংখ্য কবিতা কোনো পাণ্ডুলিপিতে সংরক্ষিত হয়নি।

যেসব কবিতা মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল, সেগুলোর বড় অংশই হয়তো চিরতরে হারিয়ে গেছে।

এখানেই সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। একজন ভাট কবির মৃত্যু মানে শুধু একজন কবির প্রস্থান নয়; তাঁর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে একটি জনপদের বহু বছরের ইতিহাস, সামাজিক স্মৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা এবং সময়ের সাক্ষ্য বহনকারী অসংখ্য কবিতা।

সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ

ভাট কবিতার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে এখনই প্রয়োজন নেত্রকোনাসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভাট কবিদের পরিচয় অনুসন্ধান, তাঁদের রচনা সংগ্রহ এবং পরিবেশনার ইতিহাস সংরক্ষণ করা।

প্রবীণ কবি, তাঁদের পরিবারের সদস্য, শিষ্য, শ্রোতা ও স্থানীয় সংস্কৃতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। পুরোনো পাণ্ডুলিপি, হাতে লেখা খাতা, ছাপানো কবিতার কাগজ কিংবা স্মৃতিনির্ভর রচনাগুলো উদ্ধার করে সংকলন প্রকাশ করা জরুরি।

পাশাপাশি অডিও-ভিডিও ধারণের মাধ্যমে তাঁদের কণ্ঠ ও পরিবেশনাশৈলী ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

জেলা শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে ভাট কবিতা উৎসব, কবিতা পাঠের আসর ও গবেষণামূলক আলোচনা আয়োজন করতে পারে। বিশেষ করে নেত্রকোনার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সামনে এই লোকজ সাহিত্যধারা তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ নতুন প্রজন্মের কাছে কোনো ঐতিহ্য পরিচিত না হলে একসময় সেটি কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

ভাট কবিতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাহিত্য সৃষ্টির জন্য সবসময় রাজদরবার, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যাঙ্গনের প্রয়োজন হয় না। সাধারণ মানুষের জীবন থেকেও জন্ম নিতে পারে অসাধারণ সাহিত্য। একজন গ্রামীণ কবি তাঁর চারপাশের সমাজকে দেখেছেন, অনুভব করেছেন এবং নিজের মতো করে ছন্দে ছন্দে তা মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতায় হয়তো ছিল না জটিল শব্দের বাহুল্য কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যের অলংকার; কিন্তু ছিল মানুষের জীবনের সত্য, সময়ের ভাষা এবং মাটির গভীর টান।

আজ যখন আমরা আমাদের লোকজ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলি, তখন ভাট কবি ও তাঁদের কবিতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ একটি জনপদের প্রকৃত ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, শাসক কিংবা ক্ষমতাবানদের কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেই ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহন করে সাধারণ মানুষের গান, কবিতা, গল্প ও স্মৃতি।

হয়তো কোনো একদিন আবার নেত্রকোনার হাটে-বাজারে ভাট কবির কণ্ঠে ছন্দের ঝংকার শোনা যাবে। আবার কোনো কবি মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে সময়ের কথা শোনাবেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ করবেন, জীবনের গল্প বলবেন। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নের প্রথম শর্ত হলো হারিয়ে যাওয়া কবিদের খুঁজে বের করা এবং তাঁদের সৃষ্টিকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা।

যে জনপদ তার লোককবিকে ভুলে যায়, সে জনপদ ধীরে ধীরে নিজেরই ইতিহাসের একটি অংশ হারিয়ে ফেলে। ভাট কবিদের ফিরিয়ে আনা মানে শুধু একটি কবিতার ধারা পুনরুজ্জীবিত করা নয়; বরং গ্রামবাংলার বিস্মৃত কণ্ঠস্বর, মানুষের স্মৃতি এবং মাটির সঙ্গে মিশে থাকা সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন করে আবিষ্কার করা।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক পাঠ

১. সুমনকুমার দাশ, ‘হাটুরে কবিতার সংগ্রাহক’, প্রথম আলো। জালাল খান ইউসুফী, তাঁর পুঁথি সংগ্রহ এবং হাটুরে কবিতার ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন।

২. ‘হাটুরে কবিতার বিলুপ্ত ভুবন’, রাইজিংবিডি। ভাট কবিতার উৎপত্তি, নামকরণ, ঐতিহাসিক পুঁথি ও বিভিন্ন অঞ্চলের কবিদের পরিচয়।

৩. ‘ভাট কবিতায় শৈশবের ঘ্রাণ’, দ্য অফনিউজ। হাটুরে কবিদের তালিকা, তাঁদের রচনা ও লোকজ পরিবেশনার বিবরণ।

৪. সজলকান্তি সরকার, ‘হাওর কাহন, একটি ভাট কবিতা’, প্রতিপক্ষ, ২৯ অক্টোবর ২০২৪। আধুনিক ভাট কবিতার একটি পূর্ণাঙ্গ নমুনা।

৫. ‘কেন্দুয়ায় ভাট কবিতার আসর’, কালের কণ্ঠ, ৪ অক্টোবর ২০২৫। ফজলু মিয়া, লিটন মিয়া ও কেন্দুয়ার ভাট কবিতার সাহিত্য আসরের বিবরণ।

৬. ‘কেন্দুয়ায় বিলুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতির ভাট কবিতা বিষয়ক সাহিত্য আসর’, দৈনিক জননেত্র, ৪ অক্টোবর ২০২৫।

৭. হামিদুর রহমান, ‘নেত্রকোনার লোকসংস্কৃতি’। নেত্রকোনার লোকজ ঐতিহ্যবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ।

৮. ‘নেত্রকোনার লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি’, গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ সংকলন, আবিষ্কার প্রকাশনী।

অনলাইন সূত্র:

  • প্রথম আলো: https://www.prothomalo.com/bangladesh/7gdhbjk8i9

  • রাইজিংবিডি: https://www.risingbd.com/opinion/news/602319

  • দ্য অফনিউজ: https://www.theoffnews.com/2019/12/blog-post_74.html

  • প্রতিপক্ষ: https://protipokkho.com/vaatkobita-haorkahon-sajalkanti/

  • কালের কণ্ঠ: https://www.kalerkantho.com/online/country-news/2025/10/04/1586616

  • দৈনিক জননেত্র: https://dainikjananetra.com/2025/10/04/কেন্দুয়ায়-বিলুপ্তপ্রায়/