প্রাচীন ডবাক রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের এক বিশেষ ভৌগোলিক ও ভূ-প্রাকৃতিক পরিমণ্ডলে। উত্তরে মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র নদ, পশ্চিমে মেঘালয় মালভূমির খাসিয়া ও জৈন্তিয়া পাহাড়, দক্ষিণে উত্তর কাছাড়ের বড়াইল পর্বতমালা এবং পূর্বে কার্বি আংলং (মিকির পাহাড়) ও ধনশিরি নদী-এই চার প্রাকৃতিক প্রাচীরের মধ্যবর্তী কপিলী (Kapili), যমুনা (Jamuna) এবং কলং (Kolong) নদীর উর্বর পাললিক উপত্যকাই ছিল ডবাক রাজ্যের মূল ভূখণ্ড (Core Area)। বর্তমান ভারতের আসাম রাজ্যের নগাঁও, হোজাই এবং মরিগাঁও জেলা জুড়ে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি মেঘালয় পাহাড়ের ‘বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চলে’ (Rain-shadow zone) অবস্থিত হওয়ায় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার অন্যান্য অংশের তুলনায় এখানে প্লাবনের প্রকোপ ছিল কম এবং মাটি ছিল শালি ধান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে এই উপত্যকায় লৌহ প্রযুক্তির বিস্তার ঘটে। স্থানীয় তিব্বতি-বর্মি (তিওয়া বা লালুং, ডিমাসা-কাছাড়ি) এবং অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনগোষ্ঠীগুলো জলাভূমি পরিষ্কার করে স্থায়ী কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলে। উদ্বৃত্ত কৃষি উৎপাদন এবং কপিলী ও ব্রহ্মপুত্র নদীপথের বাণিজ্যের ওপর ভর করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপজাতীয় কৌম সমাজগুলো (Chiefdoms) একীভূত হয়ে খ্রিস্টীয় তৃতীয়-চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যে একটি সুসংগঠিত রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে (Monarchical State) রূপ নেয়। রাজধানী বা প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্রের নামানুসারে এই রাজ্যটি ‘ডবাক’ (Davaka) নামে পরিচিত হয়-যা আজও আসামের হোজাই জেলার ‘ডবকা’ (Dabaka/Doboka) শহরের নামের মধ্য দিয়ে অবিকৃতভাবে টিকে আছে।
সর্বভারতীয় ইতিহাসে ডবাক রাজ্যের প্রথম প্রামাণ্য ও রাজকীয় উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যভাগে। গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের (শাসনকাল আনুমানিক ৩৩৫–৩৭৫ খ্রিস্টাব্দ) মহাসন্ধিবিগ্রহিক ও সভাকবি হরিষেণ রচিত ‘এলাহাবাদ স্তম্ভলিপি’ (Allahabad Pillar Inscription)-র ২২ নম্বর পংক্তিতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পূর্ব ও উত্তর সীমান্তের পাঁচটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সীমান্ত রাজ্যের (‘প্রত্যন্ত নৃপতি’) নাম খোদাই করা হয়েছে:
"সমতট-ডবাক-কামরূপ-নেপাল-কর্তৃপুরাদ্যৈঃ প্রত্যন্ত-নৃপতিভির্..."
প্রশস্তির এই বিবরণ থেকে চতুর্থ শতাব্দীর ডবাক রাজ্য সম্পর্কে তিনটি ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়:
১. স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব: গুপ্ত যুগে ডবাক কোনোভাবেই পার্শ্ববর্তী কামরূপ (প্রাগজ্যোতিষপুর) রাজ্যের অধীনস্থ প্রদেশ ছিল না; বরং সমতট ও কামরূপের মতোই সমমর্যাদাসম্পন্ন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিল।
২. কূটনৈতিক বিচক্ষণতা: উত্তর ভারতের (আর্যাবর্ত) রাজাদের মতো সমুদ্রগুপ্ত ডবাক রাজ্যকে যুদ্ধে পরাজিত করে গ্রাস করতে পারেননি। ডবাকের রাজা কূটনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে গুপ্ত সম্রাটের সাথে তিনটি শর্তে মিত্রতা বজায় রেখেছিলেন-‘সর্ব-কর-দান’ (উপঢৌকন বা কর প্রদান), ‘আজ্ঞা-করণ’ (সাম্রাজ্যিক পররাষ্ট্রনীতি মান্য করা) এবং ‘প্রণাম-আগমন’ (রাজদরবারে দূত বা উপঢৌকন পাঠিয়ে সম্মান প্রদর্শন)। এর বিনিময়ে ডবাক তার অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব ও বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখেছিল।
৩. ভৌগোলিক অবস্থান: হরিষেণ দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা (সমতট-মেঘনা নদীর পূর্ব তীরবর্তী কুমিল্লা-নোয়াখালী-ত্রিপুরা অঞ্চল) থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে প্রথমে ডবাক এবং তারপর ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে কামরূপ (গুয়াহাটি অঞ্চল)-এর নাম উল্লেখ করেছেন। এই নিখুঁত ভৌগোলিক ক্রমটি প্রমাণ করে যে, ডবাক রাজ্যটি সমতট ও কামরূপের মধ্যবর্তী সেতুবন্ধন হিসেবে অবস্থান করত।
১৮৩৪ সালে এলাহাবাদ প্রশস্তির পাঠোদ্ধারের পর দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ডবাকের সঠিক অবস্থান নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলে। এই বিতর্কে চারটি প্রধান মতবাদ গড়ে উঠেছিল:
ঢাকা-সাভার ও মধুপুর-ব্রহ্মপুত্র তত্ত্ব: ১৮৮৮ সালে ব্রিটিশ লিপিতত্ত্ববিদ জে. এফ. ফ্লিট ধ্বনিতাত্ত্বিক সাদৃশ্যের ভিত্তিতে প্রস্তাব করেন যে, সংস্কৃত ‘ডবাক’ শব্দ থেকেই প্রাকৃত বিবর্তনের মাধ্যমে বাংলার ‘ঢাকা’ (Dacca/Dhaka) নামের উৎপত্তি হয়েছে। ১৯১২ সালে ঐতিহাসিক যতীন্দ্রমোহন রায় তাঁর ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে এই মতকে সমর্থন করে বলেন, সমতট (মেঘনার পূর্ব পাড়) এবং কামরূপের (উত্তর ময়মনসিংহ ও আসাম) মধ্যবর্তী অঞ্চল হিসেবে বুড়িগঙ্গা-ধলেশ্বরীর উত্তরাঞ্চল, প্রাচীন সাভার (সম্ভার), মধুপুর ও ভাওয়াল গড় এবং পুরাতন ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাই ছিল প্রাচীন ডবাক।
উত্তরবঙ্গ বা বরেন্দ্র তত্ত্ব: ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ (১৯০৪) ডবাককে উত্তরবঙ্গের বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী (করতোয়া অববাহিকা) বলে অনুমান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দামোদরপুর ও বৈগ্রামে গুপ্ত যুগের তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হওয়ায় প্রমাণিত হয় যে, উত্তরবঙ্গ সে সময় ‘পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি’ নামে সরাসরি গুপ্ত সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ ছিল, কোনো সীমান্তবর্তী করদ রাজ্য নয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আরাকান তত্ত্ব: কর্নেল গেরিনি ও ড. ডি. আর. ভান্ডারকর ডবাককে পার্বত্য চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা বা উত্তর বার্মার সাথে মেলাতে চেয়েছিলেন, যা ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে পরিত্যক্ত হয়।
আসামের কপিলী উপত্যকা ও ডবকা তত্ত্ব (সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত): বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে ঢাকা জাদুঘরের কিউরেটর ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী, আসামের ইতিহাসবিদ কনক লাল বড়ুয়া (১৯৩৩) এবং সাম্প্রতিক কালে ড. নিরোদ বড়ুয়া (২০১০) লিপিতাত্ত্বিক, চৈনিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেন যে, মধ্য আসামের কপিলী-যমুনা-কলং উপত্যকার বর্তমান নগাঁও ও হোজাই জেলার ‘ডবকা’ অঞ্চলই ছিল প্রাচীন ডবাক রাজ্যের কেন্দ্রস্থল।
ডবাক রাজ্যের রাজধানী মধ্য আসামের কপিলী উপত্যকায় অবস্থিত হলেও, যতীন্দ্রমোহন রায় যে মধুপুর গড় ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলের কথা বলেছিলেন, তা ডবাকের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। ডবাক ছিল একটি স্থলবেষ্টিত (Landlocked) উপত্যকা; বঙ্গোপসাগর ও বহির্বিশ্বের সাথে তার সামুদ্রিক বাণিজ্যের একমাত্র মহাপথ ছিল পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন খাত: ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের ভূমিকম্প ও নদীখাত পরিবর্তনের পূর্বে ব্রহ্মপুত্রের মূল প্রবাহটি আসামের গোয়ালপাড়া থেকে গারো পাহাড়ের পশ্চিম পাদদেশ ঘুরে জামালপুর ও শেরপুরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতো। এরপর নদটি মধুপুর গড়ের (Madhupur Tract) পূর্ব পাড় ঘেঁষে ময়মনসিংহ, ত্রিশাল, গফরগাঁও, কিশোরগঞ্জের ভৈরব-কুলিয়ারচর এবং নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর হয়ে সোনারগাঁওয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হতো। ডবাকের প্রধান নদী কপিলী কলং নদীর মাধ্যমে সরাসরি ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে। ফলে ডবাক রাজ্যের নৌবহর কপিলী থেকে যাত্রা করে ব্রহ্মপুত্রের মূল স্রোত ধরে সরাসরি ময়মনসিংহ ও মধুপুর গড়ের পূর্ব প্রান্ত ছুঁয়ে বঙ্গোপসাগরে যাতায়াত করত।
উয়ারী-বটেশ্বর, আসম রাজার গড় ও ধুপিরটেক বৌদ্ধ মন্দির: মধুপুর গড়ের পূর্ব প্রান্তে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীরে অবস্থিত আদি-ঐতিহাসিক নদীবন্দর উয়ারী-বটেশ্বর ছিল এই ব্রহ্মপুত্র-কপিলী বাণিজ্য পথের প্রধান প্রবেশদ্বার। উয়ারী-বটেশ্বরে প্রাপ্ত হাজার হাজার স্বল্পমূল্য পাথরের পুঁতি (কার্নেলিয়ান, অ্যাগেট, কোয়ার্টজ ও অ্যামেথিস্ট) তৈরির কাঁচামাল স্থানীয় পাললিক মাটিতে ছিল না; এগুলো মেঘালয় মালভূমি এবং ডবাকের কপিলী-মিকির পাহাড় অঞ্চল থেকেই ব্রহ্মপুত্র নদীপথে আমদানি করা হতো
তা ছাড়া, উয়ারী-বটেশ্বরের ৫.৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মাটির দুর্গপ্রাচীর ‘আসম রাজার গড়’ এবং সংলগ্ন কামরাবো ধুপিরটেকে আবিষ্কৃত সপ্তম শতাব্দীর বৌদ্ধ পদ্ম মন্দির (Lotus Temple)-এর স্থাপত্যশৈলীর সাথে ডবাকের যোগীজান ও কাওয়াইমারি প্রত্নস্থলের মন্দিরগুলোর গভীর সাদৃশ্য প্রমাণ করে যে, প্রাচীনকাল থেকেই আসামের ডবাক-কামরূপ বলয় এবং ময়মনসিংহ-মধুপুর-নরসিংদী অঞ্চল একই নদী-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গারো-খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাদদেশীয় পথ: নদীপথ ছাড়াও ডবকার কপিলী উপত্যকা থেকে জৈন্তিয়া পাহাড় অতিক্রম করে সিলেট (শ্রীহট্ট) এবং গারো পাহাড়ের দক্ষিণ পাদদেশ (সুসং দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, শেরপুরের গড় জরিপা ও কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি) হয়ে মধুপুর ও পূর্ববঙ্গে আসার স্থল-করিডোরটি প্রাচীন বণিক, তীর্থযাত্রী ও সৈন্যবাহিনী নিয়মিত ব্যবহার করত।
গোলাঘাট-নগাঁও সীমান্তে প্রাপ্ত খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রারম্ভের ‘নগাজারি-খনিকারগাঁও প্রস্তরলিপি’ (যা সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাচীনতম সংস্কৃত শিলালিপি) এবং পরবর্তী তাম্রশাসনগুলো থেকে ডবাক রাজ্যের উন্নত প্রশাসনিক কাঠামোর চিত্র পাওয়া যায়:
সংস্কৃতায়ন ও রাজতন্ত্র: উপজাতীয় কৌম সমাজ থেকে উদ্ভূত হলেও ডবাকের রাজারা চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যেই গাঙ্গেয় ভারতের ধ্রুপদী রাজতান্ত্রিক রীতি, সংস্কৃত ভাষা এবং পূর্ব-ভারতীয় গুপ্ত ব্রাহ্মী লিপি গ্রহণ করেছিলেন।
প্রশাসনিক বিভাগ ও ‘বিষয়ামাত্য’: শাসনকার্যের সুবিধার জন্য রাজ্যটি একাধিক প্রদেশ বা জেলায় বিভক্ত ছিল, যাকে বলা হতো ‘বিষয়’ (Visaya) (যেমন: দিগডোল বিষয়)। বিষয়ের প্রধান প্রশাসক ও রাজস্ব কর্মকর্তাকে বলা হতো ‘বিষয়ামাত্য’ (Visayamatya)। রাজদরবারে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান পরিচালনার জন্য ছিলেন রাজ-‘পুরোহিত’।
ভূমি জরিপ ও ‘অগ্রহার’ প্রথা: ডবাক রাজ্যে নিখুঁত ভূমি জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। নগাজারি-খনিকারগাঁও লিপিতে দেখা যায়, রাজারা জঙ্গল ও পতিত জমি আবাদযোগ্য করার লক্ষ্যে বিশিষ্ট ব্রাহ্মণদের নিষ্কর ভূমি বা ‘অগ্রহার’ দান করতেন। জমির প্রাকৃতিক সীমানা হিসেবে ‘দামর’ (জলাশয় বা বিল) এবং রৈখিক পরিমাপের একক হিসেবে ‘ধনু’ (১ ধনু = ৪ হস্ত বা প্রায় ৬ ফুট) ব্যবহারের প্রাচীনতম লিপিতাত্ত্বিক প্রমাণ এই ডবাক রাজ্যেই পাওয়া যায়।
পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধে ডবাক রাজ্য তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তির শীর্ষবিন্দুতে আরোহণ করে। এই সময়ের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়টি লিপিবদ্ধ রয়েছে চীনের লিউ সং (Liu Song) রাজবংশের সরকারি ইতিহাসগ্রন্থ ‘শ্বুং-শ্বু’ (Song Shu)-এর ৯৭তম অধ্যায়ে।
‘কিয়া-পি-লি’ ও রাজা চন্দ্রবল্লভ: চৈনিক নথিতে কপিলী নদী উপত্যকার ডবাক রাজ্যকে ‘কিয়া-পি-লি’ (Kia-pi-li / Kapili) নামে অভিহিত করা হয়েছে। ৪২৮ খ্রিস্টাব্দে (সং সম্রাটের ইউয়ান-চিয়া শাসনামলের পঞ্চম বর্ষে) ডবাকের মহারাজা ইউয়েহ-আই (Yueh-ai)-চৈনিক ভাষায় যার অর্থ ‘চন্দ্রের প্রিয়’, অর্থাৎ মূল সংস্কৃত নাম ‘চন্দ্রবল্লভ’ (Chandravallabha) বা ‘চন্দ্রপ্রিয়’-চীনের তৎকালীন রাজধানী নানজিংয়ে সম্রাট ওয়েন (Emperor Wen)-এর রাজদরবারে এক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক দূতাবাস প্রেরণ করেন।
রাজকীয় পত্র ও উপঢৌকন: রাজা চন্দ্রবল্লভের প্রধান দূত তাও-পো-সু (দেববসু) দুর্গম পাহাড় ও নদীপথ পাড়ি দিয়ে চীনের সম্রাটের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি হস্তান্তর করেন। চিঠিতে বৌদ্ধ দর্শনের আদর্শ এবং দুই দেশের মৈত্রীর কথা উল্লেখ করে উপঢৌকন হিসেবে একটি হীরক অঙ্গুরীয় (Diamond Ring), সোনার বালা, বিরল প্রজাতির লাল ও সাদা তোতাপাখি এবং সূক্ষ্ম বস্ত্র প্রেরণ করা হয়।
দক্ষিণ-পশ্চিম সিল্ক রুট ও ভূ-অর্থনীতি: ডবাকের রাজার এই চীন মিশনের মূলে ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ। প্রাচীনকালে ভারত থেকে আসাম ও উত্তর মিয়ানমার (ভামো, চিন্দউইন ও ইরাবতী উপত্যকা) হয়ে দক্ষিণ চীনের ইউনান প্রদেশে যাওয়ার যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথটি (Southwest Silk Road) সচল ছিল, তার সবচেয়ে নিরাপদ গিরিপথটি ডবাকের কপিলী-যমুনা ও ধনশিরি উপত্যকা (ডিমাপুর-গোলঘাট করিডোর) দিয়ে অতিক্রম করেছিল। নবম শতাব্দীর নগাঁও তাম্রশাসনে ডবাক অঞ্চলে ‘বৃহতালি’ নামক যে প্রশস্ত রাজপথের উল্লেখ রয়েছে, তা ছিল এই চীন-মিয়ানমার-ভারত সংযোগকারী মহাসড়কেরই অংশ। একদিকে কামরূপের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ মোকাবিলা করা এবং অন্যদিকে চীনের সাথে সরাসরি রেশম ও রত্ন বাণিজ্য সুরক্ষিত করাই ছিল রাজা চন্দ্রবল্লভের এই কূটনৈতিক তৎপরতার প্রধান উদ্দেশ্য।
কপিলী উপত্যকার উর্বর শস্যভাণ্ডার এবং চীন-মিয়ানমার ও ব্রহ্মপুত্র-বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পার্শ্ববর্তী পরাক্রমশালী কামরূপ রাজ্যের (বর্মণ রাজবংশ) সাথে ডবাকের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।
প্রাথমিক সীমান্ত সংঘর্ষ (৫ম শতাব্দী): ঐতিহাসিক পি. সি. চৌধুরী ও বি. এন. পুরীর মতে, ৪২৮ খ্রিস্টাব্দের চীন মিশনের কিছুকাল পরেই কামরূপের রাজা কল্যাণবর্মণ (আনু. ৪২২–৪৪৬ খ্রি.) ডবাকের উত্তর সীমান্তে আক্রমণ চালান (যার পরোক্ষ ইঙ্গিত সপ্তম শতাব্দীর ডুবি তাম্রশাসনে পাওয়া যায়)। তবে তখনও ডবাকের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়নি।
ভূতিবর্মণের চূড়ান্ত বিজয় ও বরগঙ্গা শিলালিপি (৬ষ্ঠ শতাব্দী): খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথমার্ধে উত্তর ভারতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে কামরূপের সম্রাট মহাবভূতবর্মণ বা ভূতিবর্মণ (শাসনকাল আনু. ৫১৮–৫৪২ খ্রিস্টাব্দ) সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন। তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পাদন করেন এবং বিশাল বাহিনী নিয়ে ডবাক রাজ্য জয় করে চূড়ান্তভাবে একে কামরূপ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
ডবাকের প্রাণকেন্দ্র হোজাইয়ের নিকটবর্তী ‘বরগঙ্গা শিলালিপি’ এর অকাট্য প্রমাণ। এই শিলালিপিতে খোদাই করা আছে যে, মহারাজা ভূতিবর্মণের রাজত্বকালে তাঁর নিযুক্ত প্রাদেশিক গভর্নর বা ‘বিষয়ামাত্য’ অবন্তীবর্মণ সেখানে একটি আশ্রম নির্মাণ করেছিলেন। অর্থাৎ, ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগে স্বাধীন ডবাক রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে কামরূপ সাম্রাজ্যের একটি প্রশাসনিক প্রদেশে বা ‘বিষয়ে’ পরিণত হয়। ডবাক বিজয়ের ফলেই কামরূপের সীমানা কপিলী উপত্যকা ছাড়িয়ে দক্ষিণে সিলেট (শ্রীহট্ট) ও সমতট সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, যার ফলশ্রুতিতে ভূতিবর্মণ এবং পরবর্তীতে সপ্তম শতাব্দীতে কুমার ভাস্করবর্মণ সিলেটের পঞ্চখণ্ডে (নিধনপুর তাম্রশাসন) ব্রাহ্মণদের বিশাল ভূমিদান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ যখন কামরূপ ভ্রমণ করেন, তখন ডবাক স্বতন্ত্র কোনো রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর কামরূপের অংশ হিসেবেই পরিগণিত হতো।
রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারালেও প্রাক-মধ্যযুগ ও মধ্যযুগে (শালস্তম্ভ ও পাল রাজবংশের আমলে) ডবকা ও কপিলী উপত্যকা একটি সমৃদ্ধ সামরিক, বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল।
১৩৬২ খ্রিস্টাব্দের সুলতানি অভিযান ও গাছতলা স্তম্ভলিপি: চতুর্দশ শতাব্দীতে বাংলার ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান সিকান্দার শাহের শাসনামলে (১২৮৪ শকাব্দ বা ১৩৬২ খ্রিস্টাব্দে) বাংলার সুলতানি সেনাবাহিনী পূর্ববঙ্গ (সোনারগাঁও ও ময়মনসিংহ-সিলেট অঞ্চল) থেকে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীপথে কামরূপে অভিযান পরিচালনা করে এবং ডবকার নিকটবর্তী গাছতলা পর্যন্ত অগ্রসর হয়। কামরূপী ভাষায় খোদাই করা ‘গাছতলা স্তম্ভলিপি’ থেকে জানা যায়, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে (এপ্রিল-মে) ৩৬,০০০ সৈন্যের এক বিশাল ‘যবন’ (সুলতানি) বাহিনী ডবাক অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু প্রাক-বর্ষার মৌসুমে কপিলী ও যমুনা নদীতে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও প্রবল প্লাবন দেখা দিলে স্থানীয় নৌবহর (‘জলসেনা’) কৌশলী আক্রমণ চালিয়ে সুলতানি বাহিনীকে পরাস্ত করে এবং তারা ‘পঞ্চগ্রাম’ অঞ্চলের দিকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
কোচ-কাছাড়ি-অহোম সংঘাত ও মধুপুর-ময়মনসিংহে অভিবাসন: চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে প্রাচীন কামরূপ-ডবাক রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে পড়লে কপিলী উপত্যকায় প্রথমে ডিমাসা-কাছাড়ি রাজ্য (যাদের স্মৃতি ত্রিপুরার ‘শ্রীরাজমালা’ গ্রন্থে ‘ত্রিবেগ’ বা ডবকা অঞ্চল হিসেবে সংরক্ষিত আছে) এবং পরে কোচ ও অহোম শক্তির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়। ১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দে অহোম রাজা চুহুংমুং এবং পরে কোচ সেনাপতি চিলা রায়ের অভিযানের ফলে কপিলী ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে বিপুল সংখ্যক কোচ, হাজং, রাজবংশী, মেচ এবং মান্দি (গারো) জনগোষ্ঠী পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকা ধরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অভিবাসন করে। তারা বর্তমান বাংলাদেশের গারো পাহাড়ের পাদদেশ (সুসং দুর্গাপুর), শেরপুরের গড় জরিপা, ময়মনসিংহের বোকাইনগর, কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি ও এগারসিন্দুর এবং টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহের মধুপুর গড়ে স্থায়ী বসতি ও সামন্ত রাজ্য গড়ে তোলে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষে ভাটি অঞ্চলের অধিপতি ঈশা খাঁ কর্তৃক জঙ্গলবাড়ির কোচ রাজা লক্ষ্মণ হাজরাকে পরাজিত করার ঘটনাটি ছিল আসাম-ডবাক-কামরূপ বলয় থেকে মধুপুর-ব্রহ্মপুত্র অঞ্চলে বিস্তৃত সেই প্রাচীন রাজনৈতিক ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ অধ্যায়।
আসামের নগাঁও ও হোজাই জেলার কপিলী ও যমুনা নদীর তীরে প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে ডবাক সভ্যতার এক বিশাল প্রত্নতাত্ত্বিক ভাণ্ডার আবিষ্কৃত হয়েছে। ডবকা, রাজবাড়ি-যোগীজান (Rajbari-Jogijan), দেওস্থান (Devasthan), কাওয়াইমারি (Kawaimari), মিকির-আতি, গাছতলা (Gachtal), চাংচৌকি, শঙ্খধ্বনি এবং ধনশিরি উপত্যকার বরপাথার-দুবরনি প্রত্নস্থলগুলোতে খ্রিস্টীয় পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত অসংখ্য স্থাপত্য ও ভাস্কর্য নিদর্শন পাওয়া গেছে।
‘পঞ্চায়তন’ রীতির প্রস্তর মন্দির স্থাপত্য: ডবাকের স্থাপত্য মূলত উত্তর ভারতের ধ্রুপদী ‘নাগর’ (Nagara) বা শিখর রীতিতে নির্মিত। এখানকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ‘পঞ্চায়তন’ (Panchayatana) মন্দির বিন্যাস-যেখানে একটি উঁচু পাথরের মঞ্চের (Plinth) কেন্দ্রে প্রধান দেবতার মূল গর্ভগৃহ এবং চার কোণে চারটি সহায়ক উপ-মন্দির নির্মাণ করা হতো। রাজবাড়ি-যোগীজান প্রত্নস্থলে একই চত্বরে ৯টি পাথরের মন্দিরের ভিত্তি এবং মিকির-আতিতে এক সারিতে ৭টি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় ডবাকের স্থপতিরা গ্রানাইট ও বেলেপাথরের বিশাল খণ্ডগুলোকে জোড়া দেওয়ার জন্য চুন-সুরকির পরিবর্তে ‘ড্রাই মেসনরি’ কৌশল এবং লোহার ক্ল্যাম্প বা ডাওয়েল (Iron dowels) ব্যবহার করতেন। মন্দিরের প্রবেশদ্বারের নিচে দ্বারপাল হিসেবে মকরবাহনা গঙ্গা ও কূর্মবাহনা যমুনা এবং উপরের লিন্টেলে (Lintel) খোদাই করা ‘কল্পবৃক্ষ’ বা ‘কল্পলতা’ মোটিফ ডবাক শিল্পরীতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
শৈব, শাক্ত, সৌর ও বৌদ্ধ ধর্মের মিলনক্ষেত্র: ডবাক রাজ্যে ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সহিষ্ণুতার চর্চা ছিল অত্যন্ত গভীর:
শৈব ও শাক্ত ধারা: যোগীজান ও গাছতলায় অসংখ্য বিশালাকার শিবলিঙ্গ, নৃত্যরত গণেশ এবং অত্যন্ত নান্দনিক উমা-মহেশ্বর আলিঙ্গন মূর্তি পাওয়া গেছে। শাক্ত ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে দেওস্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা এবং অস্থিচর্মসার ভীষণা চামুণ্ডা মূর্তি।
বৈষ্ণব ও সৌর ধারা: চতুর্ভুজ বাসুদেব-বিষ্ণু মূর্তির পাশাপাশি চৌধুরীপাড়া ও দেওস্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে সপ্তাশ্বরথে দণ্ডায়মান প্রাচীন সূর্য মূর্তি এবং মন্দিরের লিন্টেলে খোদাই করা নবগ্রহ প্যানেল।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য: ৪২৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা চন্দ্রবল্লভের চীন মিশনের চিঠিতেই বৌদ্ধধর্মের প্রতি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ মেলে। প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে যোগীজান ও কাওয়াইমারিতে ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় উপবিষ্ট বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বের পোড়ামাটির ফলক (Terracotta plaques) এবং ব্রোঞ্জ মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা সমতটের ময়নামতি এবং মধুপুর গড়ের ধুপিরটেক বৌদ্ধ মন্দিরের সাথে ডবাকের সরাসরি ধর্মীয় যোগাযোগের সাক্ষ্য দেয়।
নাথ যোগী ঐতিহ্য ও ‘কদলী রাজ্য’ কিংবদন্তি: খ্রিস্টীয় নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে ডবাক ও কপিলী উপত্যকা তান্ত্রিক বজ্রযান এবং হঠযোগী নাথ সম্প্রদায়ের (আদি সিদ্ধাচার্য মৎস্যেন্দ্রনাথ ও গোরক্ষনাথের অনুসারীদের) প্রধান সাধনক্ষেত্রে পরিণত হয়-যার প্রত্যক্ষ স্মৃতি বহন করছে ‘যোগীজান’ (যোগীদের খাল বা আশ্রম) প্রত্নস্থলটি। মধ্যযুগীয় বাংলা নাথ সাহিত্যে (যেমন ‘গোরক্ষবিজয়’ ও ‘মীনচেতন’) বর্ণিত নারীপ্রধান ও তান্ত্রিক ‘কদলী রাজ্য’ (Kadali Kingdom)-যেখানে গুরু মৎস্যেন্দ্রনাথ ষোলো শত নারীর মায়ায় যোগসাধনা বিস্মৃত হয়েছিলেন এবং শিষ্য গোরক্ষনাথ তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন-ঐতিহাসিক নলিনীকান্ত ভট্টশালী ও বাণীকান্ত কাকতির মতে বর্তমান নগাঁও জেলার কপিলী উপত্যকা সংলগ্ন ‘কন্দল’ (Kandal) মৌজা, কদলীতলা এবং মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া-জৈন্তিয়া ও তিওয়া জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত প্রাচীন ডবাক অঞ্চলেরই সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক রূপায়ণ।
প্রাচীন ডবাক রাজ্যের ইতিহাস কেবল আসামের একটি আঞ্চলিক উপত্যকার ইতিবৃত্ত নয়; বরং এটি প্রাচীন ভারতবর্ষ, বঙ্গ-সমতট এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের মধ্যকার এক বিস্মৃত ভূ-রাজনৈতিক সেতুবন্ধন। চতুর্থ শতাব্দীতে সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তিতে যে সার্বভৌম ডবাক রাজ্যের গৌরবময় উপস্থিতি দেখা যায়, পঞ্চম শতাব্দীতে মহারাজা চন্দ্রবল্লভের চীন কূটনীতির মাধ্যমে তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সগৌরবে আত্মপ্রকাশ করে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে কামরূপ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে রাজনৈতিক নামটি আড়ালে চলে গেলেও, কপিলী ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের মহাপথ ধরে মধুপুর গড়, ময়মনসিংহ ও উয়ারী-বটেশ্বরের সাথে এর যে অবিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক, নৃতাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক প্রবাহ তৈরি হয়েছিল, তা পূর্ব ভারত ও বাংলার সভ্যতা নির্মাণে চিরস্থায়ী অবদান রেখে গেছে।
১. Fleet, J. F. (1888). Corpus Inscriptionum Indicarum, Vol. III: Inscriptions of the Early Gupta Kings and Their Successors (Allahabad Pillar Inscription, Line 22). Calcutta, pp. 1–17. ২. Sharma, Mukunda Madhava (1978). Inscriptions of Ancient Assam (Nagajari-Khanikargaon Inscription, Barganga Inscription of Bhutivarman, Nagaon Copperplate & Gachtal Pillar Inscription). Gauhati University. ৩. Shen Yue (488 CE). Song Shu (Book of Liu Song), Chapter 97 (Account of Kia-pi-li and King Yueh-ai's embassy in 428 CE); analyzed by Paul Pelliot (1904) in BEFEO, Vol. 4, and P. C. Bagchi (1950) in India and China. ৪. Boruah, Nirode (2010). Historical Geography of Early Assam. Guwahati: DVS Publishers, Chapter 4: "The Kingdom of Davaka", pp. 88–118. ৫. Barua, Kanak Lal (1933). Early History of Kamarupa. Shillong, pp. 42–48. ৬. Bhattasali, Nalini Kanta (1935). "Location of the Kingdom of Davaka." The Indian Historical Quarterly (IHQ), Vol. XI, pp. 1–16. ৭. Sarma, Mohini Kumar (2014). Archaeology of the Kapili and the Jamuna Valleys of Assam. Guwahati: Purbanchal Prakash. ৮. রায়, যতীন্দ্রমোহন (১৯১২). ঢাকার ইতিহাস (প্রথম খণ্ড)। কলকাতা, পৃষ্ঠা ৪৬–৬২। ৯. সেন, কালীপ্রসন্ন (সম্পাদিত) (১৯২৬). শ্রীরাজমালা (প্রথম লহর)। আগরতলা: রাজমালা কার্যালয়। ১০. রহমান, সুফি মোস্তাফিজুর (সম্পাদিত) (২০০৭). উয়ারী-বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে। ঢাকা: ঐতিহ্য। ১১. শরীফ, আহমদ (সম্পাদিত) (১৯৭৯). গোরক্ষবিজয়। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।