অনিন্দ্য আড্ডা শিল্প-সাহিত্য

লোকসাহিত্যের বিস্মৃত মহাকাব্যিক নায়ক: নেত্রকোণার চন্দ্রকুমার দে; এক টাকার কর্মচারী থেকে বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদের সন্ধানী

মজিবুর রহমান শেখ মিন্টু

প্রকাশ : ২৩-১০-২০২৬ ইং | নিউজটি দেখেছেনঃ ৫০৮৭

লোকসাহিত্যের বিস্মৃত মহাকাব্যিক নায়ক: নেত্রকোণার চন্দ্রকুমার দে; এক টাকার কর্মচারী থেকে বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদের সন্ধানী

-শেখ অনিন্দ্য মিন্টু

বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেরা রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেননি, অথচ তাঁদের হাতেই রক্ষিত হয়েছে একটি জাতির সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য। তাঁরা ইতিহাসের নায়ক হয়েও ইতিহাসের মূল মঞ্চে জায়গা পাননি। তাঁদের শ্রমের ফসল অন্যের নামে খ্যাতি পেয়েছে, তাঁদের জীবনসংগ্রাম আড়ালে পড়ে থেকেছে, আর তাঁদের অবদানের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে বাংলা সাহিত্যের একেকটি গৌরবময় অধ্যায়।

চন্দ্রকুমার দে তেমনই এক বিস্মৃত মহাপ্রাণ। নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার আইথর গ্রামের এই দরিদ্র মানুষটি একসময় মাসে মাত্র এক টাকা বেতনে মুদি দোকানে কাজ করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, জীবনে ছিল দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা। অথচ তাঁর অনুসন্ধিৎসু চোখ ও সংবেদনশীল মন আবিষ্কার করেছিল বাংলার গ্রামীণ মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা এমন এক কাব্যভুবন, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বসাহিত্যের পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

আজ আমরা ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ বললে সাধারণত ড. দীনেশচন্দ্র সেনের নাম স্মরণ করি। কিন্তু সেই অমূল্য গীতিকাগুলোর বহু পঙ্‌ক্তি, কাহিনি ও সুরের সন্ধান যিনি গ্রামবাংলার মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন, তিনি চন্দ্রকুমার দে। দীনেশচন্দ্র সেন ছিলেন সেই সম্পদকে সম্পাদনা ও প্রকাশনার মাধ্যমে বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব; আর চন্দ্রকুমার ছিলেন মাঠপর্যায়ের সেই নিরলস সংগ্রাহক, যাঁর শ্রম ছাড়া এই সাহিত্যভান্ডারের বড় একটি অংশ হয়তো আজও অজানাই থেকে যেত। [তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া; মৈমনসিংহ গীতিকার মূল ভূমিকা]

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণা মহকুমার কেন্দুয়া উপজেলার আইথর গ্রামে চন্দ্রকুমার দের জন্ম। তাঁর পিতা রামকুমার দে। তাঁদের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল নেত্রকোণার রাঘবপুর গ্রামে।

তাঁর শৈশবের বিস্তারিত বিবরণ বিভিন্ন জীবনীতে কিছুটা ভিন্নভাবে এসেছে। তবে একটি বিষয়ে সূত্রগুলো একমত-অল্প বয়সেই তিনি দারিদ্র্য ও পারিবারিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন। প্রথাগত শিক্ষার সুযোগও ছিল সীমিত। গ্রাম্য পাঠশালার সামান্য শিক্ষা এবং নিজের চেষ্টায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়েই তাঁর জ্ঞানজগৎ বিস্তৃত হতে থাকে।

চন্দ্রকুমারের পারিবারিক পরিবেশ সম্পর্কে প্রচলিত জীবনীমূলক বিবরণে ফারসি ভাষাচর্চা ও প্রতিবেশী মুসলমান সমাজের সঙ্গে তাঁদের সুসম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের গ্রামীণ সমাজে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ভাষা, পেশা, প্রতিবেশী সম্পর্ক ও লোকসংস্কৃতির যে সম্মিলিত জীবনধারা ছিল, তা বোঝার জন্য এই প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় পারিবারিক বৃত্তান্তে নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নিজের আগ্রহ ও পর্যবেক্ষণশক্তিকে জ্ঞানের প্রধান অবলম্বন করে তোলার মধ্যে।

জীবিকার তাগিদে কৈশোরেই চন্দ্রকুমার একটি মুদি দোকানে কাজ নেন। মাসিক বেতন মাত্র এক টাকা। তেল, নুন, চাল, ডাল আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের হিসাব মেলানোই ছিল তাঁর কাজ।

কিন্তু দোকানের নিয়মিত হিসাব-নিকাশে তাঁর মন বসত না। সাহিত্য, লোককাহিনি ও মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা পুরোনো আখ্যানের প্রতি ছিল তাঁর গভীর আকর্ষণ। দোকানের মালিক তাঁকে কাজের অনুপযুক্ত ও অমনোযোগী মনে করে চাকরি থেকে বিদায় দেন।

বাহ্যিকভাবে ঘটনাটি ছিল ব্যর্থতা। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এই ব্যর্থতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল তাঁর প্রকৃত পরিচয়ের সূচনা। যে মানুষটি পণ্যের হিসাবের খাতায় মন দিতে পারতেন না, তিনিই পরবর্তী সময়ে বাংলার লোকসাহিত্যের হারিয়ে যেতে বসা কাব্যসম্পদকে নিজের খাতায় ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতা দেখান।

এরপর তিনি স্থানীয় জমিদার তারকনাথ তালুকদারের অধীনে মাসে দুই টাকা বেতনে রাজস্ব আদায়ের কাজ পান। পরে গৌরীপুরের জমিদারিতে মাসিক আট টাকা বেতনে গোমস্তা হিসেবে কাজ করেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

এই পেশাগত জীবনই তাঁকে পৌঁছে দেয় এমন এক জগতে, যার মূল্য তিনি প্রথমে নিজেও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি।

চন্দ্রকুমার দের কাজ ছিল গ্রামে গ্রামে যাওয়া, জমিদারির খাজনা আদায় করা এবং হিসাব রাখা। কখনো তাঁকে হেঁটে, কখনো নৌকায় করে দূরবর্তী জনপদে যেতে হতো। এই যাতায়াত তাঁকে সাধারণ মানুষের খুব কাছে নিয়ে আসে।

তিনি দেখলেন, বাংলার সাহিত্য কেবল পুঁথি, রাজসভা কিংবা শিক্ষিত মানুষের লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষকের মাঠে, মাঝির নৌকায়, গ্রামের উঠানে, গায়েনের আসরে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গভীরে ছড়িয়ে আছে এক বিশাল কাব্যভুবন।

সেই ভুবনে প্রেম আছে, বিরহ আছে, সামাজিক বাধা আছে, ধর্মীয় বিশ্বাস আছে, শোষণ ও প্রতিবাদের ইঙ্গিত আছে। আছে নারী-পুরুষের সম্পর্ক, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, গ্রামীণ জীবনের আনন্দ-বেদনা এবং মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা।

লোকগায়েনেরা এসব পালাগান গাইতেন স্মৃতি ও পরিবেশনার মাধ্যমে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাহিনিগুলো এক কণ্ঠ থেকে আরেক কণ্ঠে প্রবাহিত হতো। লিখিত পাণ্ডুলিপির বাইরে এ ছিল এক জীবন্ত সাহিত্য-পরম্পরা।

চন্দ্রকুমার উপলব্ধি করেছিলেন, এই গানগুলো লিখে না রাখলে একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে। তাই রাজস্বের হিসাব রাখার খাতার পাশাপাশি তিনি খুললেন আরেকটি খাতা-লোকসাহিত্যের খাতা।

কৃষক, মাঝি ও গায়েনদের মুখে শোনা কাহিনি তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, পঙ্‌ক্তি ও ঘটনাক্রম স্মরণ রাখতেন এবং সেগুলো লিখে রাখার চেষ্টা করতেন। শুধু মুসলমান কৃষক ও গায়েনদের কাছ থেকেই দেড় শতাধিক পালাগান ও লোকগীতির সন্ধান পেয়েছিলেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এখানে তাঁর কৃতিত্ব কেবল গান সংগ্রহে নয়। মৌখিক ঐতিহ্যকে লিখিত রূপে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় ধৈর্য, স্মৃতিশক্তি, ভাষাবোধ, মানুষের সঙ্গে আস্থা গড়ে তোলার ক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন শ্রম। চন্দ্রকুমার দে এই কাজ করেছিলেন প্রায় সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে।

চন্দ্রকুমার দের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত মাসিক সাহিত্যপত্রিকা ‘সৌরভ’-এর মাধ্যমে। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন কেদারনাথ মজুমদার।

১৯১৩ সালে ‘সৌরভ’-এর ফাল্গুন সংখ্যায় চন্দ্রকুমার দের ‘মহিলা কবি চন্দ্রাবতী’ বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। চন্দ্রাবতী ছিলেন বাংলার প্রাচীন নারী কবিদের অন্যতম, যাঁর জীবন ও রচনাকে ঘিরে লোকসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য সংরক্ষিত ছিল।

চন্দ্রকুমারের প্রবন্ধটি পড়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বাংলা সাহিত্যের গবেষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর প্রতি আগ্রহী হন। প্রবন্ধের ভাষা, বিষয় নির্বাচন এবং গ্রামীণ সাহিত্য সম্পর্কে লেখকের জ্ঞান তাঁকে বিস্মিত করেছিল।

দীনেশচন্দ্র সেন ‘সৌরভ’-এর সম্পাদক কেদারনাথ মজুমদারের কাছে এই লেখকের পরিচয় জানতে চান। তখন তিনি জানতে পারেন, লেখক একজন দরিদ্র যুবক, যিনি খুব সামান্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছেন, কিন্তু নিজের প্রচেষ্টায় সাহিত্যচর্চা করেছেন।

এই ঘটনাটি বাংলা লোকসাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একজন শিক্ষিত গবেষক একটি আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ পড়ে এমন একজন সংগ্রাহকের সন্ধান পান, যাঁর কাছে ছিল বাংলার মৌখিক সাহিত্যভান্ডারের অমূল্য উপাদান।

চন্দ্রকুমারের প্রতিভা আবিষ্কারে কেদারনাথ মজুমদারের ভূমিকাও তাই স্মরণীয়। তিনি শুধু একজন লেখককে প্রকাশের সুযোগ দেননি; তাঁর মাধ্যমে গ্রামীণ লোকসাহিত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু তৈরি হয়েছিল।

চন্দ্রকুমারের জীবনসংগ্রামের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর কলকাতা যাত্রা।

দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে আগ্রহী হলেও দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও অনিশ্চিত জীবিকার কারণে সেই যোগাযোগ সহজে বাস্তবায়িত হয়নি। জীবনীমূলক বিবরণে তাঁর মানসিক অসুস্থতার কথাও উল্লেখ আছে। প্রায় দুই বছর পর তাঁর অবস্থার উন্নতি হলে কেদারনাথ মজুমদারের মধ্যস্থতায় দীনেশচন্দ্র সেনের সঙ্গে যোগাযোগের পথ আবার খুলে যায়।

১৯১৯ সালের অক্টোবর মাসে চন্দ্রকুমার কলকাতায় গিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে প্রচলিত জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর হাতে তখন যাতায়াতের খরচ জোগানোর মতো অর্থও ছিল না। শেষ পর্যন্ত স্ত্রীর সামান্য রুপার গহনা বিক্রি করে তিনি পথখরচ সংগ্রহ করেন।

একবার ভাবুন, একজন মানুষ নিজের জীবনের অনিশ্চয়তা, অভাব ও অসুস্থতার মধ্যেও গ্রামবাংলার গানগুলোকে বৃহত্তর জগতে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা আঁকড়ে ধরে কলকাতার পথে রওনা হয়েছেন। তাঁর কাছে তখন খ্যাতির নিশ্চয়তা ছিল না, ছিল না আর্থিক নিরাপত্তাও। ছিল শুধু নিজের সংগ্রহ করা সাহিত্যসম্পদের প্রতি গভীর বিশ্বাস।

এই সাক্ষাতের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে তাঁকে লোকগাথা সংগ্রাহক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মাসিক বেতন নির্ধারিত হয়েছিল সত্তর টাকা। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং দীনেশচন্দ্র সেনের উদ্যোগ এই নিয়োগের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এভাবে জীবিকার জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো এক দরিদ্র কর্মচারী প্রথমবারের মতো তাঁর সাহিত্যসংগ্রহের কাজকে পেশাগত ভিত্তি দিতে সক্ষম হন।

১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ প্রকাশিত হয়। এতে স্থান পায় পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত দশটি উল্লেখযোগ্য পালাগান। চন্দ্রকুমার দের সংগ্রহ করা গাথাগুলো এই সংকলনের মূল ভিত্তি গড়ে দেয়।

সংকলনের পরিচিত পালাগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • মহুয়া

  • মলুয়া

  • চন্দ্রাবতী

  • দস্যু কেনারামের পালা

  • কমলা

  • রূপবতী

  • কঙ্ক ও লীলা

  • দেওয়ানা মদিনা

  • দেওয়ান ভাবনা

  • ধোপার পাট

এই পালাগুলোর কাহিনিতে গ্রামীণ বাংলার জীবন ও মনস্তত্ত্বের গভীর পরিচয় পাওয়া যায়। ‘মহুয়া’তে প্রেম ও সামাজিক বাধার সংঘাত, ‘মলুয়া’য় দাম্পত্য ও বিপর্যয়ের বেদনাময় অভিজ্ঞতা, ‘দস্যু কেনারামের পালা’য় অপরাধ, অনুশোচনা ও নৈতিক পরিবর্তনের উপাদান এবং ‘চন্দ্রাবতী’তে নারীজীবন ও কাব্যিক ঐতিহ্যের এক বিশেষ পরিচয় ফুটে ওঠে।

এসব কাহিনির সাহিত্যিক গুরুত্ব শুধু তাদের কাব্যিক সৌন্দর্যে নয়। এগুলো থেকে জানা যায়, সাধারণ মানুষের সমাজে প্রেম, বিবাহ, পরিবার, ধর্ম, সম্পত্তি, সামাজিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা কীভাবে কল্পিত ও অনুভূত হতো।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: লোকগাথা সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে মৌখিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়। তাই কোনো একটি পালার একক রচয়িতা, রচনাকাল কিংবা মূল পাঠ নির্ধারণ সব সময় সহজ নয়। সংগ্রাহক, পরিবেশক, স্থানীয় গায়েন এবং সম্পাদক-প্রত্যেকের ভূমিকা এই সাহিত্যিক পরম্পরায় গুরুত্বপূর্ণ।

‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র ক্ষেত্রে চন্দ্রকুমার দের প্রধান অবদান হলো মাঠপর্যায়ে গানগুলোর সন্ধান, সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধকরণ। দীনেশচন্দ্র সেনের অবদান হলো সেগুলোকে সম্পাদনা, পরিচিতি ও প্রকাশনার মাধ্যমে বৃহত্তর সাহিত্যিক আলোচনার অংশ করে তোলা।

এই যৌথ প্রচেষ্টার ফলেই পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকা কাব্যসাহিত্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার থেকে দেশ-বিদেশের পাঠক ও গবেষকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়।

চন্দ্রকুমার দের অবদান ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র দশটি পালার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চল থেকে তিনি আরও বহু লোকগাথা সংগ্রহ করেছিলেন। এসব সংগ্রহের উল্লেখযোগ্য অংশ পরবর্তী সময়ে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ সংকলনে প্রকাশিত হয়।

এই ধারার পরিচিত পালাগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ভেলুয়া সুন্দরী’, ‘মইষাল বন্ধু’, ‘কমলা রাণী’, ‘দেওয়ান ঈশা খাঁ’, ‘আয়না বিবি’, ‘শিলাদেবী’, ‘অন্ধ বন্ধু’ ও ‘গোপিনী কীর্তন’সহ আরও নানা আখ্যান।

‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’কে একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, চন্দ্রকুমারের কাজ কোনো বিচ্ছিন্ন সাহিত্যসংগ্রহ ছিল না। এটি ছিল একটি বিস্তৃত ভূখণ্ডের লোকস্মৃতি, কাব্যিক ভাষা, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে লিখিত রূপে সংরক্ষণের উদ্যোগ।

তাঁর সংগৃহীত সব উপাদান অবশ্য প্রকাশিত হয়নি। কিছু পাণ্ডুলিপি ও কাগজপত্র পরবর্তী সময়ে হারিয়ে গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর সংগ্রহের সম্পূর্ণ পরিমাণ এবং অপ্রকাশিত উপাদানের প্রকৃত সাহিত্যিক মূল্য আজও পুরোপুরি নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

এই অসম্পূর্ণতাই আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার প্রশ্ন তুলে ধরে: চন্দ্রকুমার দে যে বিপুল মৌখিক সাহিত্যভান্ডারের সন্ধান দিয়েছিলেন, তার কতটুকু আমরা শেষ পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পেরেছি?

চন্দ্রকুমার দে নিজের অবদান সম্পর্কে ছিলেন আশ্চর্য রকম বিনয়ী। তাঁর নামে প্রচলিত একটি বক্তব্যে তিনি দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনাকর্মকে তাজমহল নির্মাণের সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে সেই নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ইট জোগানো শ্রমিক হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য গভীর। তিনি বুঝতেন, সংগ্রহ করা এবং সম্পাদনা করে প্রকাশ করা এক কাজ নয়। লোকগাথা সংগ্রহের পর সেগুলোকে পাঠযোগ্য করে তোলা, তুলনামূলক বিচার করা এবং সাহিত্যিক আলোচনায় প্রতিষ্ঠা করার জন্য আলাদা জ্ঞান ও পরিশ্রম প্রয়োজন।

কিন্তু বিনয় মানে আত্মপরিচয় বিসর্জন নয়। ১৯২৯ সালের দিকে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত সারস্বত সাহিত্য সম্মিলনে তাঁর আত্মমর্যাদাপূর্ণ বক্তব্যের যে উদ্ধৃতি প্রচলিত, তা আজও প্রাসঙ্গিক:

“আমি ময়মনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক। আমি হীন নহি-উপেক্ষিত নহি-ইহার চাইতে গর্ব গৌরব করিবার জিনিস আমার কিছুই নাই।”

এই কথার মধ্যে একজন সংগ্রাহকের পেশাগত পরিচয়, শ্রমের স্বীকৃতি এবং সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার ঘোষণা একাকার হয়ে আছে।

চন্দ্রকুমার দে যেন বলতে চেয়েছিলেন, সম্পাদকের খ্যাতি যেমন স্বীকৃতির যোগ্য, তেমনি মাঠে ঘুরে, মানুষের মুখে মুখে থাকা গান শুনে, তা লিখে রাখার শ্রমও ইতিহাসের স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।

চন্দ্রকুমার দেকে শুধু একজন পালাগান সংগ্রাহক হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের পরিধি ছোট করে দেখা হয়। তাঁর কাজের অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।

প্রথমত, তিনি মৌখিক সাহিত্যকে লিখিত নথিতে রূপান্তরিত করেছেন। স্মৃতি ও পরিবেশনানির্ভর একটি সাহিত্যধারা লিখিত রূপ পাওয়ায় তার দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সম্ভব হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তিনি গ্রামীণ মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে বৃহত্তর সাহিত্যিক আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। তাঁর সংগ্রহ দেখিয়েছে, সাহিত্যিক প্রতিভা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত বা শহরকেন্দ্রিক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

তৃতীয়ত, তাঁর কাজ বাংলার সামাজিক ইতিহাসের উপাদান সংরক্ষণ করেছে। লোকগাথায় পাওয়া যায় গ্রামীণ অর্থনীতি, পারিবারিক সম্পর্ক, নারীজীবন, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ও মানুষের মানসিক জগতের নানা চিহ্ন।

চতুর্থত, তিনি লোকসাহিত্য গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। পরবর্তী গবেষকেরা এসব গাথার ভাষা, ছন্দ, আখ্যানরীতি, পরিবেশনা, আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করার সুযোগ পেয়েছেন।

এখানে তাঁর কৃতিত্বকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হলে দীনেশচন্দ্র সেন, কেদারনাথ মজুমদার, স্থানীয় গায়েন এবং অন্যান্য সংগ্রাহকের অবদানকেও স্বীকার করতে হবে। বাংলা লোকসাহিত্যের এই অর্জন ছিল বহু মানুষের শ্রমের সম্মিলিত ফল। কিন্তু চন্দ্রকুমার দের মাঠপর্যায়ের সংগ্রহ ছিল সেই অর্জনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

চন্দ্রকুমার দে ১৯৪৬ সালে ময়মনসিংহ শহরে মৃত্যুবরণ করেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি শহরের নওমহল-চক শেহরা এলাকায় বসবাস করতেন। জীবনীমূলক সূত্রে তাঁর মৃত্যুর স্থান হিসেবে ময়মনসিংহের এস কে হাসপাতালের উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর শেষকৃত্য ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী কেওয়াটখালী শ্মশানঘাটে সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রচলিত বিবরণে জানা যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে সেখানে একটি ছাতার আকৃতির স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেটি ধ্বংস করে দেয় বলে স্থানীয় ইতিহাসবিষয়ক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

তাঁর আইথরের বাড়ির স্মৃতিও আজ আর আগের অবস্থায় নেই। দেশভাগের পর তাঁর পালিত সন্তানদের ভারতে চলে যাওয়ার সময় বাড়িটি বিক্রি হয়ে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে বাড়ির নতুন মালিকদের পরিবারের সদস্যরা সেখানে চন্দ্রকুমারের রেখে যাওয়া পুরোনো কাগজপত্র, বই ও পাণ্ডুলিপি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। সেগুলোর কিছু ফেলে দেওয়া হয়েছিল, কিছু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এই তথ্য সত্য হলে, এটি কেবল একজন সাহিত্যসংগ্রাহকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন হারানোর ঘটনা নয়; বরং একটি অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সম্ভাব্য উৎস নষ্ট হয়ে যাওয়ারও বেদনাদায়ক উদাহরণ।

তাঁর জন্মভিটার সামনে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ম্যুরাল নির্মাণ স্মৃতি সংরক্ষণের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু একটি ম্যুরাল দিয়ে চন্দ্রকুমারের পূর্ণাঙ্গ উত্তরাধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন তাঁর জীবন ও কর্মের নির্ভরযোগ্য জীবনী, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সংগ্রহের তালিকা, পাণ্ডুলিপির ডিজিটাল সংরক্ষণ, গবেষণাগ্রন্থ এবং স্থানীয় লোকসাহিত্য সংগ্রাহকদের অবদানের প্রামাণ্য ইতিহাস।

চন্দ্রকুমার দের জীবন আমাদের একটি মৌলিক সত্য শেখায়-একটি জাতির সাংস্কৃতিক সম্পদ কেবল রাজা, জমিদার, কবি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের হাতে তৈরি হয় না। সেই সম্পদের বড় অংশ গড়ে ওঠে সাধারণ মানুষের জীবন, স্মৃতি, ভাষা ও সৃষ্টিশীলতার ভেতর দিয়ে।

যে কৃষক মাঠে কাজ করতে করতে গান গেয়েছেন, যে মাঝি নৌকার বৈঠা চালাতে চালাতে কাহিনি শুনিয়েছেন, যে গায়েন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে পালাগান পরিবেশন করেছেন-তাঁরাও এই সাহিত্যঐতিহ্যের স্রষ্টা ও বাহক। চন্দ্রকুমার দে তাঁদের কণ্ঠের সাহিত্যকে অবহেলার অন্ধকার থেকে তুলে এনে সংরক্ষণের পথ তৈরি করেছিলেন।

তিনি নিজে বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর পর্যবেক্ষণশক্তি, অধ্যবসায় ও সাহিত্যবোধ প্রমাণ করে, গবেষণার জন্য শুধু ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন অনুসন্ধিৎসা, নিষ্ঠা এবং মানুষের অভিজ্ঞতাকে সম্মান করার ক্ষমতা।

আজ যখন আমরা ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’, ‘চন্দ্রাবতী’ কিংবা ‘দস্যু কেনারামের পালা’ নিয়ে আলোচনা করি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত-এসব কাহিনি শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে জন্ম নেয়নি। এগুলো বহু প্রজন্মের মানুষের কণ্ঠে বেঁচে ছিল। সেই কণ্ঠের কাছে পৌঁছেছিলেন চন্দ্রকুমার দে; শুনেছিলেন, লিখেছিলেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

তাঁর জীবনের ট্র্যাজেডি হলো, যে মানুষটি অন্যের মুখে মুখে বেঁচে থাকা সাহিত্যকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, তাঁর নিজের পাণ্ডুলিপি ও স্মৃতিচিহ্নের বড় অংশই পরবর্তী সময়ে হারিয়ে গেছে বলে জানা যায়।

তাঁর জীবনের গৌরব হলো, দারিদ্র্য তাঁকে থামাতে পারেনি, সীমিত শিক্ষা তাঁকে নিরুৎসাহিত করতে পারেনি, আর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের অভাব তাঁর অনুসন্ধিৎসাকে নিঃশেষ করতে পারেনি।

এক টাকার মুদি দোকানের কর্মচারী থেকে বাংলার লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদের সন্ধানী-চন্দ্রকুমার দের জীবন তাই শুধু একজন ব্যক্তির উত্থানের ইতিহাস নয়; এটি সাধারণ মানুষের সৃষ্টিশীলতা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং স্বীকৃতির অধিকারের ইতিহাস।

তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু অতীতকে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং বাংলার গ্রামীণ মানুষের কণ্ঠে বেঁচে থাকা সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণের অঙ্গীকার করা।