অনিন্দ্য আড্ডা ইতিহাস ও ঐতিহ্য

কালের সাক্ষী মধুপুর গড়: দশ লক্ষ বছরের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন, প্রাচীন নগরায়ণ ও লোকঐতিহ্যের এক প্রামাণ্য আখ্যান

মজিবুর রহমান শেখ মিন্টু

প্রকাশ : ৩১-১০-২০২৬ ইং | নিউজটি দেখেছেনঃ ৫০৯৫

বাংলাদেশের মধ্যভাগে অবস্থিত মধুপুর গড় (Madhupur Tract) কেবল একটি ভৌগোলিক বা বনজ অঞ্চল নয়; এটি বঙ্গীয় অববাহিকার (Bengal Basin) অন্যতম প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক সোপান, যার লালচে-বাদামি মৃত্তিকার স্তরে স্তরে প্রোথিত রয়েছে প্রায় দশ লক্ষ বছরের প্রাকৃতিক বিবর্তন, আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন নগরায়ণ এবং আবহমান বাংলার অগণিত লোককথা, জনশ্রুতি ও কিংবদন্তী। উত্তরে জামালপুর ও ময়মনসিংহের দক্ষিণ সীমানা থেকে শুরু করে টাঙ্গাইল ও গাজীপুর হয়ে দক্ষিণে ঢাকার কেরানীগঞ্জ এবং পূর্বে নরসিংদীর বেলাব-শিবপুর-রায়পুরা পর্যন্ত বিস্তৃত ৪,২৪৪ বর্গ কিলোমিটারের এই উঁচু ভূভাগটি বাংলাদেশের সমতল প্লাবনভূমির বুকে এক অনন্য ভূ-প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক দ্বীপ হিসেবে বিরাজমান। ভৌগোলিক ও প্রশাসনিকভাবে এই বিশাল চত্বরের উত্তরাংশ ‘মধুপুর গড়’ এবং দক্ষিণাংশ ‘ভাওয়ালের গড়’ নামে পরিচিত, যা প্লাবনভূমি থেকে গড়ে ১ থেকে ১০ মিটার (এবং পশ্চিম প্রান্তে ১০ থেকে ২০ মিটার) উঁচুতে অবস্থান করছে।


ভূতাত্ত্বিক উৎপত্তি ও টেকটোনিক বিবর্তন: গন্ডোয়ানা ফাটল থেকে প্লাইস্টোসিন সোপান গঠন

মধুপুর গড়ের উৎপত্তি অনুধাবন করতে হলে বঙ্গীয় অববাহিকার টেকটোনিক বিবর্তনের দিকে দৃষ্টিপাত করা অপরিহার্য। আজ থেকে প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লক্ষ বছর পূর্বে (136 Ma) গন্ডোয়ানা মহা-মহাদেশের ভারতীয় অংশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে ইন্দো-অস্ট্রেলীয় প্লেটের অংশ হিসেবে সমুদ্রবক্ষের সম্প্রসারণের (Sea-floor spreading) কারণে উত্তর দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে এবং ইউরেশীয় (পূর্ব এশীয়) প্লেটের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই মহাদেশীয় পাত-সংঘর্ষের ফলে উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা (সাবডাকশন জোন বরাবর) এবং পূর্বে আরাকান ইয়োমা পর্বতশ্রেণির (ট্রান্সফর্ম ফল্ট বরাবর) উত্থান ঘটে। পরবর্তীতে অলিগোসিন যুগে (আজ থেকে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ থেকে ২ কোটি ৬০ লক্ষ বছর পূর্বে) ভারতীয় পাতের উত্তর-পূর্বাংশে ফাটল সৃষ্টি হয়ে তা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে দেবে যায় এবং পরবর্তী ৩ কোটি ৭০ লক্ষ বছর ধরে পলি সঞ্চিত হয়ে প্রাচীন গন্ডোয়ানা শিলার ওপর বঙ্গীয় অববাহিকা গঠিত হয়। এই অববাহিকার দুই পাশে প্রাচীন শিলার দুটি উচ্চভূমি-পূর্বে মেঘালয় মালভূমি (গারো-খাসিয়া পাহাড়) এবং পশ্চিমে ছোটনাগপুর মালভূমি (রাজমহল পাহাড়)-উন্মুক্ত হয়ে আছে, যাদের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ অংশটি ‘গারো-রাজমহল গ্যাপ’ নামে পরিচিত।


সিওয়ালিক-পরবর্তী ভূ-আন্দোলনের ফলে প্রাচীন ইন্দো-ব্রহ্ম নদী ছিন্নভিন্ন হয়ে সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদে বিভক্ত হয় এবং গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নিজেদের প্রবাহ পরিবর্তন করে গারো-রাজমহল গ্যাপ দিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে নতুন প্রবাহপথ খুঁজে পায়। কোয়ার্টারনারি পর্যায়ের (Quaternary Period, যা গত ২৫ লক্ষ বছর বা ২.৫ মিলিয়ন বছর ধরে বিস্তৃত) প্লাইস্টোসিন যুগে (Pleistocene Epoch) হিমযুগীয় জলবায়ুগত পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামা ও প্রাচীন নদীসমূহের বাহিত পলি অবক্ষেপণের ফলে সমগ্র অববাহিকা জুড়ে এক বিশাল পলল সোপান গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এই প্লাইস্টোসিন অবক্ষেপের অধিকাংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বা ভূ-আলোড়নে দেবে গিয়ে নবীন হলোসিন (Holocene, গত ১০,০০০ বছর) পলির নিচে চাপা পড়লেও, এর দুটি বৃহৎ খণ্ড টেকটোনিক উত্থানের ফলে সমতল থেকে উপরে ভেসে থাকে-যার একটি উত্তরবঙ্গের ‘বরেন্দ্রভূমি’ (Barind Tract) এবং অপরটি মধ্যাঞ্চলের ‘মধুপুর গড়’ (Madhupur Tract)। ভূতাত্ত্বিক কালক্রমে মধুপুর কর্দম (Madhupur Clay) দ্বারা গঠিত এই অঞ্চলটি আজ থেকে আনুমানিক ০.৯৭ থেকে ০.৯০ মিলিয়ন বছর পূর্বে (নিম্ন থেকে মধ্য প্লাইস্টোসিন যুগে) বর্তমান রূপ লাভ করে।


মধুপুর চ্যুতি ও নিওটেকটোনিক ঝুঁকি

১৯৫৯ সালে ভূতত্ত্ববিদ জেমস পি. মরগান এবং উইলিয়াম জি. ম্যাকইনটায়ার (Morgan and McIntire, 1959) সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন যে, মধুপুর ও বরেন্দ্র অঞ্চল হলো টেকটোনিক প্রক্রিয়ায় উত্থিত প্লাইস্টোসিন পলল চত্বর এবং তারা মধুপুর গড়কে উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ-এই তিনটি উপ-অঞ্চলে বিভক্ত করেন। সাম্প্রতিক ভূ-গাঠনিক গবেষণায় (যেমন-রশিদ ও ইসলাম, ২০১৫; তৌহিদা ও অন্যান্য, ২০০৬) দেখা গেছে যে, আঞ্চলিক সংকোচন বল (Regional Compression) এবং ভূত্বকের প্রাচীন দুর্বল রেখা বা বেসমেন্ট ফল্টের (Basement Faults) বরাবর মধ্য-প্লাইস্টোসিন যুগে একটি ‘হর্স্ট ব্লক’ (Horst Block) হিসেবে মধুপুর গড়ের উত্থান ঘটেছে। এই উত্থিত ব্লকটি পশ্চিম দিকে খাড়াভাবে উত্থিত হয়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মৃদু ঢালু (Tilted to the east/southeast) হয়ে গেছে।


মধুপুর গড়ের পশ্চিম সীমানা বরাবর প্লাইস্টোসিন সোপান এবং যমুনা প্লাবনভূমির নবীন হলোসিন পলির সংযোগস্থলে ভূ-পৃষ্ঠের যে আকস্মিক ও রৈখিক উচ্চতা পরিবর্তন দেখা যায়, সেখানে একাধিক ‘এন-ইশেলন’ (En echelon বা সোপানাকার সমান্তরাল) চ্যুতি রেখা বিদ্যমান, যা সামগ্রিকভাবে ‘মধুপুর চ্যুতি’ (Madhupur Fault) নামে পরিচিত। জামালপুর থেকে শুরু হয়ে মধুপুর গড়ের পশ্চিম প্রান্ত ঘেঁষে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এই চ্যুতিটি বাংলাদেশের তিনটি প্রধান ভূমিকম্পন বলয়ের অন্যতম এবং একটি দীর্ঘ পুনরাবৃত্তিকালীন সক্রিয় আন্তঃপ্লেট চ্যুতি (Intra-plate active fault)। ডাউকি চ্যুতি (Dauki Fault) এবং ইন্দো-বার্মা প্লেট সীমান্তের গতির সাথে সম্পর্কযুক্ত এই চ্যুতিতে স্ট্রাইক-স্লিপ (Strike-slip) ও ডিপ-স্লিপ (Dip-slip) উভয় ধরনের বিচ্যুতি ও অ্যানিসোট্রপি (~১৫%, প্লাঞ্জ ২৪°, ট্রেন্ড ৭৯°) শনাক্ত করা হয়েছে। জিও-ইলেকট্রিক্যাল রেজিস্টিভিটি (Resistivity) জরিপে মধুপুর গড়ের পশ্চিম প্রান্তে মাটির নিচে প্লাইস্টোসিন স্তরের শীর্ষভাগে ২৫ মিটার পর্যন্ত উল্লম্ব চ্যুতি বা বসে যাওয়া ব্লক (Downdropped block) এবং ১৯৩ থেকে ২৩০ মিটার অবস্থানে ভূগর্ভস্থ বিচ্যুতি ও হলোসিন পলির অনল্যাপ (Onlap) দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মধুপুর চ্যুতিতে ৬.৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প সংঘটিত হলে ঢাকার প্রায় ৬৫ শতাংশ ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই চ্যুতি বলয়ে ৪.২ মাত্রার মৃদু ভূমিকম্পের প্রবণতার পাশাপাশি নিওটেকটোনিক দুর্বলতা ও ভূগর্ভস্থ ক্ষয়ের (Subsurface piping) প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন মধুপুরের মহিষমারা ইউনিয়নের বুকারবাইদ গ্রামে ২০ ফুট গভীর এবং প্রায় আধা মাইল দীর্ঘ একটি আকস্মিক ভূ-ফাটল সৃষ্টি হয়।


স্তরবিন্যাস, শিলাতত্ত্ব ও ভূগর্ভস্থ জলতত্ত্ব

মধুপুর গড়ের ভূতাত্ত্বিক স্তরবিন্যাস (Stratigraphy) মূলত অতিমাত্রায় বিচূর্ণিত (Weathered) ও জারিত (Oxidized) লালচে-বাদামি থেকে হলুদাভ ও ধূসর রঙের ‘মধুপুর কর্দম’ (Madhupur Clay) এবং এর নিচের বালুকাময় স্তর দ্বারা গঠিত। নিম্ন-প্লাইস্টোসিন যুগের মধুপুর কর্দম স্তরের পুরুত্ব অঞ্চলভেদে ৬ মিটার থেকে ৬০ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে, তবে গড় পুরুত্ব প্রায় ১০ মিটার। রেজিস্টিভিটি জরিপে দেখা যায়, মধুপুর গড়ের সর্বত্র উপরিভাগে কম রোধাঙ্কের (Low resistivity) বিচূর্ণিত কর্দম স্তর এবং তার ঠিক নিচেই অত্যন্ত উচ্চ রোধাঙ্কের (Very high resistivity) লিচড বেলেপাথর বা বালুর স্তর অবস্থান করছে। গভীর পাললিক কোর বিশ্লেষণ (Sediment Core Analysis) এবং স্ট্যান্ডার্ড পেনিট্রেশন টেস্ট (SPT) অনুযায়ী মধুপুর গড় ও তৎসংলগ্ন প্লাবনভূমির কোয়ার্টারনারি স্তরবিন্যাসকে প্রধান তিনটি ভূতাত্ত্বিক এককে ভাগ করা যায়।


প্রথমত, সর্বউপরের হলোসিন বালু ও কর্দম একক (Holocene Sand & Mud), যার বয়স দশ হাজার বছরের কম। প্লাবনভূমিতে এটি উপরিভাগ থেকে ১৫ থেকে ৩০ মিটার এবং যমুনা উপত্যকায় ৬০ থেকে ৯০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত। ধূসর হিউমিক কর্দম, পলি ও সূক্ষ্ম বালুর লেন্সে গঠিত এই স্তরে ফেল্ডস্পার ও কোয়ার্টজের প্রাধান্য রয়েছে। জলতাত্ত্বিক দিক থেকে এটি একটি বিজারক পরিবেশের জলাধার (Reducing aquifer), ফলে এ স্তরের ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রতি লিটারে ৫০ থেকে ১০০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত উচ্চমাত্রার আর্সেনিক দূষণ পরিলক্ষিত হয়।


দ্বিতীয়ত, এর নিচেই অবস্থান করছে মধ্যবর্তী কর্দম একক বা মধুপুর কর্দম (Middle Mud / Madhupur Clay), যা প্লাইস্টোসিন যুগে (পঞ্চাশ-চুয়ান্ন হাজার বছর থেকে ৯.৭ লক্ষ বছর পূর্বে) গঠিত। গড় অঞ্চলে এর পুরুত্ব ৬ থেকে ৬০ মিটার এবং পার্শ্ববর্তী প্লাবনভূমির নিচে ২৮.৫ থেকে ৩৮.৪ মিটার গভীরতায় এটি ৩ থেকে ২০ মিটার পুরু স্তর হিসেবে বিদ্যমান। সুসংহত পলি ও অতি-সংহত (Over-consolidated) লালচে-বাদামি কর্দমে গঠিত এই স্তরে উদ্ভিজ্জ অংশ, মাইকা ও ভিভিয়ানাইট ফ্লক (Vivianite flocs) পাওয়া যায়। প্রকৌশলগত বিচারে এর SPT N-মান ১০ থেকে ৫০ (সাধারণত ১৬ থেকে ২৫)-এর মধ্যে থাকে এবং এটি উপরের আর্সেনিক-দূষিত একুইফার থেকে নিচের নিরাপদ একুইফারকে পৃথককারী একটি অভেদ্য প্রাকৃতিক বর্ম হিসেবে কাজ করে।


তৃতীয়ত, ৩৮.৪ মিটারের নিচে অবস্থান করছে প্লায়ো-প্লাইস্টোসিন যুগের (দেড় লক্ষ বছরের অধিক প্রাচীন) নিম্ন বালু একক (Lower Sand Unit)। এর মধ্যে ৭৫ মিটারের নিচে রয়েছে ১৬ মিটার পুরু স্থূল বালু ও নুড়ি পাথরের স্তর, যা গুলনগর এলাকায় ভূপৃষ্ঠে উন্মুক্ত হয়ে আছে। ক্রস-ল্যামিনেটেড মাঝারি থেকে অতি স্থূল বালু, কোয়ার্টজ, বায়োটাইট, মাসকোভাইট ও ছোট নুড়ি পাথরে (Gravel) গঠিত এই স্তরটি অত্যন্ত ঘন ও সুসংহত (যার SPT N-মান ৫০-এর বেশি থেকে ১৬০ পর্যন্ত)। এটি একটি জারিত পরিবেশের জলাধার (Oxidizing aquifer) এবং সম্পূর্ণ আর্সেনিকমুক্ত (প্রতি লিটারে ১ মাইক্রোগ্রামেরও কম) সুপেয় পানির বিশাল আধার।


এই স্তরবিন্যাস থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্যগত আন্তঃসম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মধুপুর গড়ের ল্যাটেরাইটিক (Lateritic) ও অতি-সংহত কর্দম স্তরটি প্রকৃতিগতভাবে একটি অভেদ্য ভূতাত্ত্বিক বর্ম হিসেবে কাজ করে, যা উপরের হলোসিন স্তরের বিজারক পরিবেশের আর্সেনিকযুক্ত পানিকে নিচের প্লায়ো-প্লাইস্টোসিন বালু স্তরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ফলে মধুপুর গড় এবং এর প্রান্তভাগের গভীর নলকূপসমূহ আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানি সরবরাহ করলেও, উপরিভাগের কর্দম স্তরের কম প্রবেশ্যতার (Low permeability) কারণে বর্ষার পানি ভূগর্ভে সহজে অনুপ্রবেশ করতে না পেরে দ্রুত ভূপৃষ্ঠ দিয়ে গড়িয়ে চলে যায় এবং শুষ্ক মৌসুমে অগভীর স্তরে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। ভূতাত্ত্বিক এই বৈশিষ্ট্যটিই প্রাচীনকাল থেকে মধুপুর গড়ে বিশাল দিঘী খননের সংস্কৃতি এবং দিঘীতে পানি না ওঠা সংক্রান্ত অসংখ্য লোককাহিনির জন্ম দিয়েছে।


চালা ও বাইদ ভূ-প্রকৃতি এবং ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন

উত্তর-প্লাইস্টোসিন যুগে এই অঞ্চলে ব্যাপক বৃষ্টিপাত, ভূমিক্ষয় এবং ভূপৃষ্ঠের জলপ্রবাহের কারণে মধুপুর গড়ের অবিচ্ছিন্ন সোপানটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে একাধিক বিচ্ছিন্ন ও অর্ধ-বিচ্ছিন্ন সোপানে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। গড়ের উত্তরাঞ্চলে (মধুপুর, ঘাটাইল ও মুক্তাগাছা অংশে) মালভূমির মতো চ্যাপ্টা শীর্ষবিশিষ্ট উঁচু টিলা এবং তাদের মধ্যবর্তী সংকীর্ণ ও আঁকাবাঁকা উপত্যকার প্রাধান্য দেখা যায়। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলে (ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ অংশে) ভূমি তুলনামূলকভাবে সমতল, যা দীর্ঘকাল ধরে ধান চাষ ও নগরায়ণের উদ্দেশ্যে কৃত্রিমভাবে সমান করার ফলেও ত্বরান্বিত হয়েছে। স্থানীয় ভূ-প্রাকৃতিক পরিভাষায় মধুপুর গড়ের এই ক্ষয়জাত উঁচু লাল মাটির টিলা বা শৈলশিরাকে বলা হয় ‘চালা’ (Chala) এবং দুটি চালার মধ্যবর্তী নিচু ও সরু জলাভূমি বা উপত্যকাকে বলা হয় ‘বাইদ’ (Baid)। চালা জমিতে প্রাকৃতিক শালবন (গজারি বন) ও ফলের বাগান গড়ে উঠলেও বাইদ অঞ্চলগুলো বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে প্লাবিত হয় এবং শুষ্ক ও বোরো মৌসুমে ধান চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়।


মরফোমেট্রিক ও দূর অনুধাবন (Remote Sensing & GIS) বিশ্লেষণে দেখা যায়, মধুপুর গড়ের জলনির্গম প্রণালী মূলত বৃক্ষাকার (Dendritic drainage pattern) এবং এটি ৪৯টি উপ-অববাহিকায় বিভক্ত। এর মূল নিষ্কাশন অববাহিকার আয়তন ৩,৬৭৭ বর্গ কিমি (বিস্তৃত অববাহিকা প্রায় ৮,২০০ বর্গ কিমি, গড় উপ-অববাহিকা ১৬৮ বর্গ কিমি এবং পরিসীমা ৩৮০ কিমি), যার অভ্যন্তরে বিভিন্ন ক্রমের মোট ৯,০২৫টি ক্ষুদ্র জলধারা ও ছড়া প্রবাহিত হয়েছে। অববাহিকাটির গড় দ্বিভাজন অনুপাত (Mean bifurcation ratio) ২.৫৪, যা নির্দেশ করে যে এখানকার জলনির্গম ব্যবস্থায় শিলাতাত্ত্বিক সমরূপতা ও ভূ-গাঠনিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে একটি ভারসাম্য রয়েছে। এর ফর্ম ফ্যাক্টর (Form factor) অত্যন্ত কম (০.০৫) এবং বৃত্তাকার অনুপাত (Circularity ratio) ০.৩২, যা প্রমাণ করে অববাহিকাটি লম্বাটে প্রকৃতির এবং বৃষ্টির পানি খুব দ্রুত নিষ্কাশিত হয়ে যায়। এছাড়া জলনির্গম ঘনত্ব (Drainage density) গড়ে ০.৮৬ কিমি/বর্গ কিমি (যা স্থানভেদে ০.০১ থেকে ৬৯.৪৮ কিমি/বর্গ কিমি পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়), জলধারা কম্পাঙ্ক (Stream frequency) ৫.১০১টি/বর্গ কিমি, অববাহিকা রিলিফ ৩৯ মিটার, রিলিফ অনুপাত ০.১৫৬ এবং রাগেডনেস নাম্বার (Ruggedness number) ৩৩.৫৪। বংশী, বানার, শীতলক্ষ্যা (রেনেলের মানচিত্রে Luckia), ঝিনাই, লাঙ্গুলিয়া, এলংজানী, লৌহজং ও ধলেশ্বরী নদী এই গড় অঞ্চল ও এর পাদদেশকে বিধৌত করেছে।


মধুপুর গড়ের টেকটোনিক উত্থানের সবচেয়ে যুগান্তকারী প্রভাব পড়েছে বঙ্গীয় বদ্বীপের নদী ব্যবস্থার ওপর। মধুপুর গড় মূলত ব্রহ্মপুত্র নদের দুটি প্রবাহপথের মধ্যবর্তী একটি উঁচু কোয়ার্টারনারি আন্তঃনদী ভূভাগ (Interfluve) হিসেবে অবস্থান করছে। শেষ হিমযুগের চরম পর্যায়ে (Last Glacial Maximum) সমুদ্রপৃষ্ঠ নিচে নেমে গেলে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদী মধুপুর গড়ের পশ্চিম প্রান্তে একটি গভীর উপত্যকা খোদাই করেছিল, যা বর্তমানে ৬০ থেকে ৯০ মিটার পুরু হলোসিন পলিতে পূর্ণ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম সার্ভেয়ার জেনারেল মেজর জেমস রেনেল ১৭৬৪ থেকে ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে যে বিখ্যাত ‘বেঙ্গল অ্যাটলাস’ (Bengal Atlas, 1779/1781) প্রকাশ করেন (বিশেষত প্লেট নং XVIII: "The Burrampooter, From the head of the Luckia or Banner River to Assam"), তাতে স্পষ্ট দেখা যায় যে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগেও ব্রহ্মপুত্র নদের মূল প্রবাহটি মধুপুর গড়ের পূর্ব পাশ দিয়ে বাহাদুরাবাদ থেকে জামালপুর ও ময়মনসিংহ (নাসিরাবাদ) হয়ে নরসিংদীর বেলাব ও সোনারগাঁয়ের পাশ দিয়ে ভৈরবে মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হতো। সে সময় মধুপুর গড়ের পশ্চিমে বর্তমান যমুনা বা জনাই নদী ছিল একটি অতি সংকীর্ণ খালমাত্র। কিন্তু মধুপুর গড়ের ক্রমাগত টেকটোনিক উত্থান, জলপাইগুড়ি থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত যমুনা চ্যুতি রেখা বরাবর ভূমির অবনমন (Compensatory sinkage), ১৭৮২ সালে ময়মনসিংহ অঞ্চলে সংঘটিত প্রচণ্ড ভূমিকম্প এবং ১৭৮৭ সালের মহাপ্লাবনের যৌথ প্রভাবে ব্রহ্মপুত্র নদ মধুপুর গড়কে পাশ কাটিয়ে শত মাইল পশ্চিমে যমুনা খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। গতিপথ পরিবর্তনের পূর্বে প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের গড় প্রশস্ততা ছিল ৮.৫ কিলোমিটার, যা মূল প্রবাহ হারানোর পর সংকুচিত হয়ে বর্তমানে মাত্র ০.৪৫ কিলোমিটারে (বা গড়ে ২০০ মিটারে) এসে ঠেকেছে এবং এর প্রবাহ মৌসুমি ধারায় পরিণত হয়েছে (১৯৮৮ সালের বন্যায় যার সর্বোচ্চ প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছিল ৪২,৯০০ কিউসেক)। বিপরীতে, ১৮৩০ সালের উইলকক্সের (Wilcox) মানচিত্রে যে যমুনা নদীকে একক খাতের সর্পিল নদী (গড় প্রশস্ততা ৬.২৪ কিমি) হিসেবে দেখা গিয়েছিল, তা ১৯১৪ সালে ৫.৫৫ কিমি প্রশস্ততা বজায় রেখে পশ্চিম দিকে সরতে থাকে এবং ১৯১৪ থেকে ১৯৫৩ সালের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রশস্ত হয়ে এক বিশাল বিনুনি নদীতে (Braided river) রূপান্তরিত হয়। এমনকি ১৮৯৭ সালের মহাভূমিকম্পের সময় ময়মনসিংহের দেওয়ানগঞ্জ ও শেরপুর অঞ্চলের বহু দূরবর্তী গ্রামে মাটির নিচ থেকে রুপালি বালু ফেটে বের হয়ে আসে, যা প্রমাণ করে যে এই সমগ্র অঞ্চল একসময় ব্রহ্মপুত্রের মূল খাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল।


প্রাচীন ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিবর্তন: উয়ারী-বটেশ্বর থেকে আধুনিক কালপর্ব

মৃত্তিকাবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকদের মতে, গারো পাহাড়ের সোমেশ্বরী নদীর তীর থেকে শুরু করে মধুপুর ও ভাওয়াল গড় পর্যন্ত বিস্তৃত লাল মাটির শৈলশিরাটিই বাংলাদেশের প্রাচীনতম স্থলভাগ। টাঙ্গাইল ও তৎসংলগ্ন সমতল পলিমাটি অঞ্চলে খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্বের কোনো মানববসতির প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, কারণ তখন সমতলের অধিকাংশ স্থানই ছিল আদি ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার অগভীর জলাভূমি বা সাগরের অংশ। সপ্তম শতাব্দীতে (৬২৯–৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে, বিশেষত ৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে) চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং যখন এই অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন, তখন তিনি আলাপসিং পরগনার দক্ষিণাঞ্চলকে (যার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত ছিল গড়বাড়ি, বালিয়ানপুর, ইন্দ্রজানি, দেওপাড়া ও চাম্বলতলার পাহাড়) সারা বছর জলমগ্ন দেখেছিলেন এবং কেবল মধুপুর-ভাওয়ালের বনাঞ্চলই শৈলশিরার উচ্চতা নিয়ে জলরাশির ওপরে টিকে ছিল। এমনকি ষোড়শ শতাব্দীতে পাঠান বীর ঈসা খাঁর আমলেও মধুপুর গড় ব্যতীত পার্শ্ববর্তী বাথুলী, ময়থা, মহেড়া, শালদু, কাশিল ও গজারিয়া বিলগুলো গভীর জলমগ্ন থাকত এবং ঐতিহাসিক অধ্যাপক মুফাখখারুল ইসলামের বর্ণনা অনুযায়ী, মাত্র দুইশ বছর আগেও মধুপুর গড়ের পশ্চিম প্রান্ত থেকে গুদারা নাও ছেড়ে ২০–২৫ মাইল ডুবা অঞ্চল পার হয়ে সিরাজগঞ্জের ঘাটে নোঙর ফেলতে হতো। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই বন্যা-মুক্ত লাল মাটির উঁচু সোপানে গড়ে উঠেছিল পূর্ববঙ্গের প্রাচীনতম মানববসতি ও নগর সভ্যতা।


মধুপুর গড়ের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী প্লাইস্টোসিন মধুপুর কর্দম সোপানের ওপর (বর্তমান নরসিংদী জেলার বেলাব ও শিবপুর উপজেলায়) আবিষ্কৃত হয়েছে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন দুর্গ-নগরী ‘উয়ারী-বটেশ্বর’। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম থেকে ষষ্ঠ শতকে গড়ে ওঠা এই নগরীটিকে প্রাচীনকালে বিশ্বজুড়ে পরিচিত বাণিজ্যকেন্দ্র ‘সোনাগড়া’ (Sounagoura) হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ১৯৩০ ও ১৯৩৩ সালে স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ হানিফ পাঠান প্রথম উয়ারী গ্রামে মাটি খননকালে প্রাপ্ত একটি পাত্রে জমানো ভারত উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা (Punch-marked silver coins) থেকে ২০–৩০টি মুদ্রা সংগ্রহ করে সুধী সমাজের নজরে আনেন। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র হাবিবুল্লাহ পাঠান ১৯৫৫ সালে বটেশ্বর গ্রামে শ্রমিকদের ফেলে যাওয়া ত্রিকোণাকার ও একমুখ চোখা ভারী লৌহপিণ্ড এবং ১৯৫৬ সালে উয়ারী গ্রামে মাটি খননকালে প্রায় চার হাজার ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রার একটি ভাণ্ডার উদ্ধার করেন। ২০০০ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত ধারাবাহিক উৎখননে এখানে প্রাচীন ইটের স্থাপত্য, প্রশস্ত রাস্তা, পার্শ্বগলি, দুর্গ-প্রাচীর, নদীবন্দর, স্বল্পমূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি, পাথরের বাটখারা এবং পোড়ামাটির ফলক আবিষ্কৃত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে সুদূর রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত এই জনপদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল।


উয়ারী-বটেশ্বরের আশেপাশে রাঙ্গারটেক, সোনাতলা, কেন্দুয়া, মরজাল, টঙ্গীরাজার বাড়ি, মন্দিরভিটা, জানখারটেক, টঙ্গীরটেক ও ধুপিরটেকসহ প্রায় পঞ্চাশটি প্রাচীন প্রত্নস্থল ও ইট-পাথরে পরিপূর্ণ ঢিবি শনাক্ত করা হয়েছে। ১৮৮৫ সালে শিবপুরের আশ্রাফপুর গ্রামে দুটি তাম্রশাসন ও একটি ব্রোঞ্জ চৈত্য আবিষ্কৃত হয়, যার পাঠোদ্ধার সম্পন্ন হয় ১৯০৫ সালে। উক্ত তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে সমতটের বৌদ্ধ রাজা দেব খড়্গ (Devakhadga) মধুপুর গড় অঞ্চলে চারটি বৌদ্ধ বিহার ও বিহারিকা নির্মাণের জন্য ভূমি দান করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের দশম ধাপে শিবপুরের জানখারটেকে ইটের স্থাপত্য এবং ধুপিরটেকে একটি অনন্য ‘বৌদ্ধ পদ্মমন্দির’ (Lotus Temple)-এর ৪ বর্গমিটার আয়তনের গর্ভগৃহ ও দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ইট বিছানো বেদী আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে প্রাপ্ত অক্ষত লাল পদ্মটির (সংস্কৃত ‘কমল’) আটটি পাপড়ি বৌদ্ধ ধর্মের ‘অষ্টমার্গ’ (সৎ বাক্য, সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ জীবন, সৎ সংকল্প, সৎ চেষ্টা, সম্যক দৃষ্টি ও সম্যক সমাধি) এবং প্রেম, সহানুভূতি ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে মধুপুর গড়ে প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার প্রসারের সাক্ষ্য বহন করে।


কামরূপ রাজ্য, পাল শাসন ও মহারাজ ভগদত্তের ঐতিহাসিক স্বরূপ

প্রাচীনকালে মধুপুর গড় ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চল প্রাগ্‌জ্যোতিষপুর বা আসামের কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যদিও ঐতিহাসিক হ্যামিল্টন ও ব্লকম্যানের আলোচনায় এর কিছু অংশ বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেও বিতর্ক রয়েছে। রামায়ণ ও মহাভারতের যুগে প্রাগ্‌জ্যোতিষপুরের রাজধানী ছিল বর্তমান গৌহাটি এবং মহাভারতের পৌরাণিক কাল থেকে প্রাক-ঐতিহাসিক পর্ব পর্যন্ত সেখানে ভগদত্ত বংশ রাজত্ব করে; পরবর্তীতে মহাভারতের যুগের বহু শতাব্দী পর খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে (আনুমানিক ৩৫০–৩৭৪ খ্রিস্টাব্দে) নরক বা বর্মণ বংশীয় পুষ্যবর্মা এবং সপ্তম শতকে হিউয়েন সাংয়ের সময়ে রাজা ভাস্করবর্মা ও পরবর্তীতে শালস্তম্ভ বংশীয় রাজাগণ কামরূপ শাসন করেন।


খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে বাংলায় যখন পাল রাজবংশের শাসন চলছিল, তখন মধুপুর ও ভাওয়াল গড়ের অরণ্যবেষ্টিত উচ্চভূমিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাল নৃপতিদের স্বাধীন বা অর্ধ-স্বাধীন রাজ্য গড়ে ওঠে। ভাওয়ালের বনের গভীরে রাজা শিশুপালের বিশাল রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ এবং মধুপুরের পশ্চিমাংশে পাল রাজা ভগদত্তের রাজ্য বিস্তৃত ছিল। কেদারনাথ মজুমদারসহ বিশিষ্ট ঐতিহাসিকগণ স্পষ্ট করেছেন যে, মধুপুর গড়ের এই রাজা ভগদত্ত এবং মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাগ্‌জ্যোতিষপুর-অধিপতি ভগদত্ত এক ব্যক্তি নন; বরং মধুপুরের ভগদত্ত ছিলেন দশম-একাদশ শতাব্দীর একজন স্থানীয় পাল বংশীয় শাসক। মধুপুরের শালবনের অভ্যন্তরে আজও রাজা ভগদত্তের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তাঁর রাজবাড়ির গৃহভগ্নাবশেষ, প্রাচীন পুকুর, বারতীর্থ দীঘি, দেবালয় এবং মদন গোপালের বাড়ি অবশিষ্ট রয়েছে। এছাড়া ৯৮৮ থেকে ১০৭৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় মহীপালের শাসনামলে উত্তরবঙ্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে রাজা মহীপাল চন্দনবাটী নামক স্থানে রাজধানী স্থাপন করেন এবং এই পাল শাসনামলেই ঘাটাইলের পাহাড়ি অঞ্চলে রাজা সাগর পাল ও তাঁর পুত্র বনরাজ পাল বিশাল দিঘীসমূহ খনন করেন বলে ইতিহাস ও জনশ্রুতিতে উল্লেখ পাওয়া যায়।


সেন শাসন, আদিবাসী রাজ্যসমূহ এবং সুলতানি ও মুঘল আমল

দ্বাদশ শতাব্দীতে সেন বংশের উত্থানের পর বীরসেন বা আদিশূরের প্রপৌত্র রাজা বিজয়সেন বিক্রমপুরে (বর্তমান রামপাল) রাজধানী স্থাপন করে সমতট ও দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি মদ্র, কলিঙ্গ, কামরূপ ও ময়মনসিংহ অঞ্চল জয় করেন। এর ফলে মধুপুর গড়ের ক্ষুদ্র পাল রাজ্যগুলো সেন সাম্রাজ্যের অধীনে বিলীন হয়ে যায় এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে সোনারগাঁর পতন পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ সেনদের অধীনে থাকে। আনন্দভট্ট রচিত ‘বল্লালচরিত’ গ্রন্থ ও স্থানীয় ইতিহাসের বিবরণ অনুযায়ী, রাজা বল্লালসেন কৌলীন্য প্রথা প্রবর্তন করে নিজ বর্ণের বাইরে এক ডোম নারীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং প্রজাদের সেই নারীর অন্ন গ্রহণে বাধ্য করেন। এই সামাজিক ও ধর্মীয় নিপীড়নের প্রতিবাদে বহু ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য এবং বিদ্রোহী নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠী মূল লোকালয় ত্যাগ করে পূর্ব ময়মনসিংহ, কামরূপ এবং বন-জঙ্গল ও হাওরাঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে (যেমন—অনন্ত দত্ত ও তাঁর গুরু শ্রীকণ্ঠ দ্বিজ কামরূপে এসে পূর্ব ময়মনসিংহের প্রথম ভদ্র উপনিবেশ স্থাপন করেন)। এছাড়া দেলদুয়ারের দক্ষিণে হিঙ্গানগর গ্রামকে অনেকে রাজা কংস নারায়ণের রাজধানী হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন।


ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সেন শাসনের অবসান ও বারো ভূঁইয়াদের উত্থানের মধ্যবর্তী সময়ে মধুপুর গড় ও পূর্ব ময়মনসিংহের প্রান্তীয় বনাঞ্চলে গারো, কোচ ও হাজং প্রভৃতি আদিবাসী শাসকদের অধীনে মধুপুর, কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি, নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মদনপুর ও সুসঙ্গ, সদরের বোকাইনগর এবং শেরপুরের গড়জড়িপায় বেশ কিছু ক্ষুদ্র রাজ্য গড়ে ওঠে। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে মধুপুর অঞ্চলটি খেন্ রাজবংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (শাসনকাল ১৪৯৪–১৫১৯ খ্রি.) কামতা রাজ্য জয় করলে মধুপুর গড় মুসলিম শাসনের অধীনে আসে এবং তাঁর পুত্র সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ এই অঞ্চল শাসন করেন, যখন এটি ‘নাসিরাবাদ’ (বর্তমান ময়মনসিংহ) প্রশাসনিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হয়। অন্যদিকে মোঘল আমলে মোমেন শাহ নামে একজন সাধকের নামানুসারে ময়মনসিংহ পরগনা ও ‘মোমেনশাহী’ নামের উৎপত্তি ঘটে।


সুলতানি আমলে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ জনকল্যাণ ও ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বিখ্যাত সুফি সাধক আলী শাহানশাহ্ বাবা আদম কাশ্মিরী (রহ.)-কে বিশাল ‘আতিয়া পরগনা’ দান করেন (আরবি ‘আতা’ বা দানকৃত শব্দ থেকেই ‘আতিয়া’ নামের উৎপত্তি)। সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজলের বিবরণ অনুযায়ী, তখনকার টাঙ্গাইল ও মধুপুর প্রান্তীয় অঞ্চলটি আতিয়া, বড়বাজু, কাগমারী ও পুখুরিয়া পরগনার সমন্বয়ে গঠিত ছিল। পরবর্তীতে ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে (১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে) বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রধান মসনদ-ই-আলা ঈসা খাঁর আমলে এবং মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাবা আদম কাশ্মিরীর আদর্শিক উত্তরসূরি এবং আফগান অধিপতি সুলায়মান খান কররানির পুত্র বায়েজিদ খান পন্নীর বংশধর সাঈদ খান পন্নী আতিয়া পরগনার বন্দোবস্ত লাভ করেন। তিনি ১৬০৮–১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে (১০১৮–১০১৯ হিজরি) বাবা আদম কাশ্মিরীর মাজারের সন্নিকটে সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যরীতির অপূর্ব সমন্বয়ে বিখ্যাত আতিয়া জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সুবেদার ইসলাম খাঁ হযরত শাহ জামানকে আতিয়া পরগনার শাসক নিযুক্ত করলে তিনি ধলেশ্বরীর তীরে পোড়াবাড়ি নদীবন্দর গড়ে তোলেন। সাঈদ খান পন্নীর বংশধররাই পরবর্তীতে করটিয়ার প্রতাপশালী পন্নী জমিদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, অন্যদিকে মধুপুর ও ধনবাড়ী অঞ্চলে ধনবাড়ীর নবাব পরিবারের (সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী প্রমুখ) এবং আশেপাশের অঞ্চলে মহেড়া, পাকুটিয়া ও দেলদুয়ারের জমিদারদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।


ঔপনিবেশিক জরিপ, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ও মহান মুক্তিযুদ্ধ

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার ক্ষমতা দখল করলে মধুপুর গড়ের দুর্ভেদ্য শালবন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রধান দুর্গে পরিণত হয়। ১৭৬০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মহানায়ক ফকির মজনু শাহ (যাঁর কাছে ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে নবাব মীর কাসিমও সাহায্য চেয়েছিলেন) বগুড়ার মহাস্থানগড় এবং ময়মনসিংহের মধুপুর জঙ্গলকে কেন্দ্র করে তাঁর বিশাল গেরিলা নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন, যেখানে সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরাণীর দলও সক্রিয় ছিল। ১৭৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কোম্পানির সার্ভেয়ার জেমস রেনেল জরিপ কাজ পরিচালনাকালে ফকির মজনু শাহের অনুসারীদের হাতে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং ঢাকায় চিকিৎসা শেষে ১৭৭১ সালে স্বয়ং ফকির বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এক সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ১৭৮১ সালে ফকির মজনু শাহ মধুপুর জঙ্গলে নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৭৮২ সালে মধুপুর অঞ্চলের পুখুরিয়া নামক স্থানে ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে বিদ্রোহীদের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যার পর মজনু শাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে মধুপুরের গহীন অরণ্যে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে ১৭৮৯ সালে গারো পাহাড়ের পাদদেশে জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোম্পানি হস্তক্ষেপ করে এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলের গারো ও হাজং অধ্যুষিত প্রান্তরে ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে ‘পাগলপন্থী’ বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ করে।


প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কোম্পানি সরকার ১৭৮৭ সালের ১ মে (১১৯৪ বঙ্গাব্দ) ময়মনসিংহ কালেক্টরেট প্রতিষ্ঠা করে; শুরুতে বেগুনবাড়ীকে সদর দপ্তর হিসেবে বেছে নেওয়া হলেও আকস্মিক বন্যায় তা বিধ্বস্ত হওয়ায় নাসিরাবাদে সদর দপ্তর স্থানান্তরিত হয়। ময়মনসিংহ জেলা স্থাপনের পর বর্তমান টাঙ্গাইল অঞ্চলের কাগমারী ও পুখুরিয়া পরগনায় তহসিল কাচারি স্থাপিত হয় (যা ১৮১৩ সালে বন্ধ হয়)। ১৮৪৫–১৮৭৭ সালের থাকবস্ত জরিপ (বিশেষত ১৮৫২–৫৩ সালের ময়মনসিংহ থাকবস্ত) এবং ১৮৪৬–১৮৭৮ সালের রাজস্ব জরিপের (১৮৫৩–৫৭ সালের ময়মনসিংহ রেভিনিউ সার্ভে) পর ১৮৬৯ সালে পারদিঘুলিয়া মৌজায় টানআইল থানা ও আতিয়া, পিংনা ও মধুপুর নিয়ে টাঙ্গাইল মহকুমা গঠিত হয় (যার প্রথম মহকুমা প্রশাসক ছিলেন ব্রহ্মনাথ সেন এবং আতিয়া পরগনায় ছিল ৭৭৯.৬৯ বর্গমাইল জুড়ে ১৪৭টি মহাল ও জাফরশাহী পরগনায় ২৩২.৬৩ বর্গমাইল জুড়ে ১০টি মহাল)। ১৮৯৮ সালে মধুপুরে পূর্ণাঙ্গ থানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯০৮–১৯১৯ সালে প্রথমে এইচ. এ. র‍্যামসবোথাম (H. A. Ramsbotham) ও পরবর্তীতে এফ. এ. সাকসের (F. A. Sachse) নেতৃত্বে পরিচালিত হয় ঐতিহাসিক ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (CS) ও সেটেলমেন্ট অভিযান। ১৯১৭ সালে ধনবাড়ীতে মহকুমা স্থাপনের জন্য ৫৫.৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও খেলাফত আন্দোলনের প্রভাবে তা স্থগিত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মহকুমা পূর্ব পাকিস্তানের ১৯তম জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে মধুপুর টাঙ্গাইল জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতোমধ্যে ১৯৫০ সালের জমিদারি উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে ১৯৫১ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে ১৯৫৫ সালে সরকার মধুপুর বনাঞ্চলকে ‘সংরক্ষিত বন’ (Reserved Forest), ১৯৬০ সালে ‘মধুপুর উদ্যান’ এবং ১৯৮২ সালে ‘মধুপুর জাতীয় উদ্যান’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৮৩ সালে মধুপুর থানাকে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।


১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মধুপুর ও ভাওয়াল গড়ের ভৌগোলিক গঠন ও শালবন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রাকৃতিক দুর্গ হিসেবে কাজ করে। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী মধুপুর দখল করলে ১৪ এপ্রিল থেকেই মুক্তিবাহিনীর সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয় এবং মধুপুরের যুদ্ধে একজন পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনসহ ৫ জন সেনা নিহত হয়। মধুপুর গড়ের দক্ষিণ অংশ, ভাওয়াল গড়, ঢাকা সদর উত্তর, ভালুকা, কালিহাতীর পূর্ব ও কিশোরগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সেনা মেজর আফসার উদ্দিন আহমেদ ১৭ এপ্রিল মাত্র ৭ জন যোদ্ধা নিয়ে (যাঁদের অন্যতম ছিলেন মধুপুর গড়ের গারো আদিবাসী যোদ্ধা শ্রী অনিল চন্দ্র সাংমা ও মোঃ ছমির উদ্দিন মিয়া) ঐতিহাসিক ‘আফসার বাহিনী’ গঠন করেন এবং কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে গড় অঞ্চলে দুর্বার গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর মধুপুর হানাদারমুক্ত হয়।


সামগ্রিক ঐতিহাসিক কালপর্বের ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে দেখা যায়, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম-ষষ্ঠ শতকের আদি ঐতিহাসিক যুগে প্রাচীন সোনাগড়া জনপদ ও উয়ারী-বটেশ্বরের দুর্গ-নগরী থেকে শুরু করে সপ্তম শতকে রাজা দেব খড়্গের বৌদ্ধ বিহার ও ধুপিরটেকের পদ্মমন্দির, দশম-একাদশ শতকে রাজা ভগদত্ত ও সাগর পালের কীর্তি, দ্বাদশ-চতুর্দশ শতকে সেন শাসন ও গারো-কোচ রাজ্যসমূহ, পঞ্চদশ-সপ্তদশ শতকে সুলতানি ও মুঘল শাসনে বাবা আদম কাশ্মিরী ও সাঈদ খান পন্নীর আতিয়া মসজিদ নির্মাণ এবং অষ্টাদশ শতকে মজনু শাহের বিদ্রোহ থেকে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ-প্রতিটি ঐতিহাসিক বাঁকেই মধুপুর গড় বাংলার রাজনীতির অন্যতম ভরকেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।


নামকরণের ইতিহাস, জনশ্রুতি, লোককথা ও কিংবদন্তীর বিশ্লেষণ

মধুপুর গড়ের ভূ-প্রকৃতি ও অরণ্যচারী জীবনধারা এখানকার মানুষের মনোজগতে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য কাহিনি, জনশ্রুতি ও ট্র্যাজিক কিংবদন্তীর। নৃবিজ্ঞান ও ফোকলোরের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই জনশ্রুতিগুলো মোটেও বিচ্ছিন্ন কোনো কল্পকাহিনি নয়; বরং এ অঞ্চলের লাল মাটির ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, পানির দুষ্প্রাপ্যতা, দুর্ভেদ্য শালবন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামেরই সাংস্কৃতিক প্রতিফলন।


স্থাননামের ব্যুৎপত্তি ও আঞ্চলিক লোকপ্রবাদ

‘মধুপুর’ নামকরণের পেছনে সবচেয়ে প্রবল ও সর্বজনবিদিত জনশ্রুতিটি সরাসরি এখানকার প্রাচীন অরণ্য-অর্থনীতির সাথে যুক্ত। অতীতে এই সমগ্র গড় অঞ্চলটি ছিল শাল, গজারি, বহেড়া, হরীতকী, ছাতিম, কুর্চি ও অর্জুন বৃক্ষের নিবিড় জঙ্গলে আবৃত। এই গহীন অরণ্যে বুনো মৌমাছিরা অসংখ্য মৌচাক তৈরি করত এবং স্থানীয় মৌয়ালরা বন থেকে বিপুল পরিমাণ খাঁটি মধু ও মোম সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন। প্রচুর মধু পাওয়ার কারণেই কালক্রমে এই জনপদের নাম হয়ে ওঠে ‘মধুপুর’।


অন্য একটি ঐতিহাসিক মতানুসারে, পাল আমলে রাজা ভগদত্তের নির্মিত ‘মদন গোপালের বাড়ি’ ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যের সূত্র ধরেও অঞ্চলটির নামকরণ সমৃদ্ধ হয়েছে। একইভাবে মধুপুর গড়ের শেষ প্রান্তে অবস্থিত ‘ধনবাড়ী’ উপজেলার নামকরণ হয়েছে ধনাই সাধু নামক এক অলৌকিক সাধকের নামানুসারে, এবং ‘দেলদুয়ার’ নামের উৎপত্তি হয়েছে জঙ্গলচারী আধ্যাত্মিক সাধক দিলদার পাগলার নাম থেকে অথবা ফারসি ‘দিল-দুয়ার’ (মনের দরজা) শব্দবন্ধ থেকে। আবার গড়ের পশ্চিম পাদদেশে অবস্থিত ‘বাসাইল’ উপজেলার নামকরণের পেছনে পাহাড়ি ঢল ও আদি ব্রহ্মপুত্রের পলিতে গঠিত উর্বর ভূমিতে প্রাচীনকাল থেকে উৎপাদিত ‘শালি’ বা ‘শাইল’ ধানের সংযোগ রয়েছে বলে প্রবীণদের জনশ্রুতিতে উল্লেখ পাওয়া যায়।


টাঙ্গাইল ও মধুপুর গড় অঞ্চলের বসতি বিন্যাস ও ভূমিরূপ নিয়েও চমৎকার লোকজ ব্যুৎপত্তি প্রচলিত রয়েছে। অতীতে গড়ের পাদদেশে বন্য জন্তু ও বর্ষার প্লাবন থেকে বাঁচার জন্য স্থানীয় অনার্য ও আদিবাসী মানুষ মাটির ওপর বাঁশ পুঁতে উঁচু ঘর তৈরি করত; তিব্বতি-বর্মি ও স্থানীয় দেশি শব্দে উঁচু মাচাকে বলা হতো ‘টং’ (Tong) এবং অনার্য ভাষায় বাসস্থানকে বলা হতো ‘ইল’ (Il)-এই ‘টং-ইল’ বা উঁচু ভূমির ‘টান-আইল’ থেকেই ‘টাঙ্গাইল’ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া আকুরটাকুর ও শাহবালিয়া মৌজার মধ্যবর্তী এলাকায় নীলকর টেংগু সাহেবের নীলকুঠি, ঘোড়ায় টানা ‘টাঙ্গা’ গাড়ির প্রচলন, হযরত শাহ জামাল (রহ.)-এর সাথে মাদ্রাজ থেকে আগত জেলেদের সর্দার ‘টাংগা’, কিংবা সন্তোষ জমিদারি থেকে রাজস্ব আদায় করে ফেরার পথে ঠগীদের হাতে নিহত এক ইংরেজ সাহেবকে লৌহজং নদীর পূর্ব পাড়ে টাঙিয়ে রাখার জনশ্রুতিও লোকমুখে প্রচলিত। এমনকি এই অঞ্চলের বারোটি উপজেলার নামকরণ নিয়ে একটি প্রবাদপ্রতিম লোকছড়া প্রচলিত রয়েছে: "জেলায় এক দুয়ার দেলদুয়ার, এক হাতী কালিহাতী, এক বাড়ী ধনবাড়ী। তিন আইল টাঙ্গাইল, ঘাটাইল, বাসাইল। ৬ পুর গোপালপুর, মধুপুর, ভূঞাপুর, নাগরপুর, মির্জাপুর ও সখিপুর"। আবার ভাষাতাত্ত্বিক ড. সুকুমার সেনের স্থাননাম তত্ত্বের আলোকে এই অঞ্চলের গ্রামনামের বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নদী ও খালের স্মৃতিবাহী নামের সাথে ‘খালী’ বা ‘গাঙ্গ’ (যেমন-মধুখালী, ভূতখালী, পেঁচাখালী, গাঙ্গাইর), পলি জমে তৈরি উচ্চভূমির সাথে ‘ডাঙ্গা’ বা ‘চর’ (যেমন-চাপাইডাঙ্গা, তুলসীডাঙ্গা, কৈডাঙ্গা) এবং জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদকৃত ভূমির সাথে ‘দিয়া’, ‘দহ’, ‘চক’ বা ‘কাটি’ যুক্ত হয়েছে। মধুপুর গড়ের পশ্চিম পাদদেশে ধনবাড়ীর মুশুদ্দী ইউনিয়নের ‘পঁচাপটোল’ গ্রামের পঁচা মণ্ডল ও পঁচু শেখের মধ্যে মারামারির স্থান ‘পঁচাবিল’, ‘পঁচাখাল’ নাকি ‘পঁচাকুড়ি’—এই নিয়ে ১৯৪৮ সালের ৬ জুন ময়মনসিংহ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উকিল পাঁচু বাবুর জেরার মাধ্যমে বিবাদী পঁচু শেখের খালাস পাওয়ার ঘটনাটি আজও স্থান-নাম বিভ্রান্তির এক প্রবাদপ্রতিম লোকগল্প হিসেবে টিকে আছে।


সাগরদিঘী, বইন্যা দিঘী ও রানির আত্মবিসর্জনের ট্র্যাজিক কিংবদন্তী

মধুপুর গড়ের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ও শক্তিশালী কিংবদন্তীটি গড়ে উঠেছে ঘাটাইল উপজেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার পূর্বে পাহাড়ি লাল মাটির জনপদ ‘সাগরদিঘী’-কে কেন্দ্র করে, যার প্রাচীন নাম ছিল লোহানী। ভূতাত্ত্বিক অংশে যেমনটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, মধুপুর কর্দম স্তরের পানি ধারণক্ষমতা ও প্রবেশ্যতা কম হওয়ায় এবং ভূপৃষ্ঠের ঢাল বেশি থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত গড়িয়ে চলে যেত, ফলে শুষ্ক মৌসুমে গড় অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার দেখা দিত।


জনশ্রুতি ও ইতিহাস অনুসারে, পাল শাসনামলে রাজা সাগর পাল তাঁর প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করার জন্য ৩৬ থেকে ৪০ একর জমির ওপর এক বিশাল দিঘী খননের উদ্যোগ নেন। প্রায় ২,০০০ শ্রমিক দীর্ঘ ২ বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিঘীটি খনন সম্পন্ন করে। কিন্তু পর্যাপ্ত গভীরতায় পৌঁছানো সত্ত্বেও (অর্থাৎ অভেদ্য মধুপুর কর্দম স্তর সম্পূর্ণ ভেদ করতে না পারায়) রহস্যজনকভাবে দিঘীর তলদেশে এক বিন্দু পানিও ওঠেনি। হতাশ ও চিন্তিত রাজা সাগর পাল এক রাতে স্বপ্নাদেশ পান যে, যদি তাঁর প্রিয়তমা রানি স্বয়ং ওই শুষ্ক দিঘীর তলদেশে অবতরণ করেন, তবেই দিঘীতে পানি উঠবে। প্রজাদের সুখের কথা চিন্তা করে মহীয়সী রানি দিঘীতে নামার সিদ্ধান্ত নেন। নির্ধারিত দিনে হাজার হাজার কৌতূহলী প্রজার সামনে রানি শুষ্ক দিঘীতে নামেন এবং কিছুদূর যাওয়ামাত্রই পাতাল (নিম্নস্থ প্লায়ো-প্লাইস্টোসিন আর্টেসীয় বালু স্তর) ভেদ করে প্রবল বেগে স্বচ্ছ ও শীতল জলধারা ওপরে উঠতে শুরু করে। চোখের পলকে রানির সমস্ত শরীর পানিতে তলিয়ে যায় এবং রাজার শত চেষ্টা সত্ত্বেও রানিকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। প্রজাদের তৃষ্ণা মেটাতে রানির এই আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় সাগর রাজার দিঘী এবং তাঁর নামেই জনপদটির নাম হয় ‘সাগরদিঘী’ (যদিও কারো কারো মতে রাজা মহীপালের নাম থেকেও এর সূচনা হতে পারে)। দিঘীটির প্রশস্ত পশ্চিম পাড়ে আজও প্রাচীন ইটের টুকরো ও রাজবাড়ির ভিত্তির ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এ অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ আজও বিশ্বাস করেন যে, রাতের আঁধারে সাগরদিঘীর পাড়ে রানির আত্মা ঘুরে বেড়ায় এবং তাঁর আত্মাকে শান্ত রাখতে পাড়ে পূজা-অর্চনা ও মানত করা হয়।


সাগরদিঘীর পাশেই রয়েছে পাল যুগের আরও দুটি কিংবদন্তীময় জলাশয়-‘বইন্যা দিঘী’ এবং ‘কোদাল ধোয়া পুকুর’। লোককথা অনুযায়ী, রাজা সাগর পালের পুত্র বনরাজ পাল পিতার কৃতিত্বকে টেক্কা দেওয়ার জন্য সাগরদিঘীর চেয়েও বিশাল ‘বইন্যা দিঘী’ খনন করান। আর এই বিশাল দিঘীগুলো খনন শেষে হাজার হাজার শ্রমিক তাদের কোদালের মাটি ধোয়ার জন্য উত্তর পাশে যে স্থানে জড়ো হয়েছিল, সেখানে কেবল কোদাল ধোয়ার ফলেই আরেকটি দিঘীর সৃষ্টি হয়, যা আজও ‘কোদাল ধোয়া পুকুর’ নামে পরিচিত। একই ধরনের দিঘী খনন, কোদাল ধোয়া পুকুর ও বিসর্জনের কিংবদন্তী মধুপুর গড়ের ‘ইছাদিঘী’ গ্রামেও প্রচলিত রয়েছে, যেখানে শতবর্ষী গ্রামবাসীদের স্মৃতিতে এক ফুট অন্তর অন্তর কাটা বড় চাইয়ের মতো প্রাচীন ইটের স্থাপনা এবং কিশোরগঞ্জের কস্তুলের যুদ্ধে মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে ঈসা খাঁর পশ্চাদপসরণ ও তালিপাবাদ অভিযানের পথরেখার ঐতিহাসিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।


গুপ্ত বৃন্দাবন, তমালতলা ও পৌরাণিক ভূগোল

মধুপুর গড়ের অরণ্য কেবল ঐতিহাসিক দুর্গই ছিল না, বরং মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব ও শাক্ত পদাবলীর এক পবিত্র তীর্থভূমি হিসেবেও লোকমানসে স্থান করে নিয়েছে। ঘাটাইল সদর থেকে ২৬ কিলোমিটার পূর্বে ধলাপাড়া ইউনিয়নের ঘন বনাঞ্চলে অবস্থিত ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লোকবিশ্বাস অনুসারে, প্রাচীনকালে বায়ান্ন খাদার এই নিবিড় অরণ্যে একটি সুপ্রাচীন তমাল গাছের নিচে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধা গোপিনীদের নিয়ে লীলা ও সময় অতিবাহিত করতেন। লোকবিশ্বাস মতে, এখানকার প্রাচীন পুকুর ও প্রবাহিত ঝরনাধারার পাশে আজও যে বিরাট পাথরের স্তূপ জেগে আছে, সেখানে কৃষ্ণ বিরহে রাধার আকুতি প্রতিধ্বনিত হয়। তমাল গাছটিকে কেন্দ্র করে এখানে কাঠের যুগল রাধা-কৃষ্ণ মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতি বছর বার্ষিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, সংলগ্ন মন্দির এলাকা থেকে গুপ্ত বংশীয় বেশ কিছু প্রাচীন নিদর্শন ও মূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে এবং অনেক গবেষকের মতে, গুপ্ত যুগের নিদর্শন পাওয়ার কারণেই ১৫৭৭ সালে ‘বৃন্দাবন’ নামের এই স্থানটির নামকরণ করা হয় ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’।


এছাড়া মধুপুর গড় ও তৎসংলগ্ন জনপদে মনসামঙ্গলের বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দর এবং লক্ষ্মীন্দরের পিতা চাঁদ সওদাগরের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাম, গড় গোবিন্দপুর, কালিদাস গ্রামে কালিদাস পণ্ডিতের পুকুর, কালিয়া, মহানন্দপুর, কীর্তনখোলা, প্রতিমা বংশী, দাড়িয়াপুর ও শহর গোপীনাথপুর প্রভৃতি স্থান পৌরাণিক লোকগাথার জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে। অন্যদিকে মধুপুরের বারতীর্থ দীঘি ও আশ্রমকে ঘিরে রাজা ভগদত্তের মাতৃভক্তি ও তীর্থস্থাপনের জনশ্রুতি আজও বার্ষিক মেলা ও পূজায় স্মরণ করা হয়।


মান্দি জনগোষ্ঠীর শালবন মিথ, জীবনদর্শন ও অস্তিত্বের সংগ্রাম

মধুপুর গড়ের আত্মার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এখানকার আদি বাসিন্দা মান্দি (গারো) এবং কোচ ও হাজং জনগোষ্ঠীর জীবন ও লোকসংস্কৃতি। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত এফ. এ. সাকসের ময়মনসিংহ জেলা গেজেটিয়ারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলায় ৩৮,০০০ গারো, ৩২,০০০ কোচ, ২৬,০০০ হাদি এবং ২৫,০০০ হাজং জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। মান্দিদের মাতৃভাষা ‘আচিক’ (Achik) বা মান্দি ভাষা। মান্দিদের প্রাচীন লোকশ্রুতি অনুসারে, বহু শতাব্দী পূর্বে তিব্বত অঞ্চল থেকে হিমালয় পাড়ি দিয়ে ভারতবর্ষে প্রবেশের এবং বসতি স্থাপনের জন্য এলাকা বাছাইয়ের চরম প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মধ্যে তারা তাদের ভাষার লিখিত বর্ণমালা চিরতরে হারিয়ে ফেলে।


মধুপুর গড়ের মান্দি আদিবাসীরা শালবনকে কেবল কাঠ বা ভূমির উৎস মনে করে না; তাদের লোকবিশ্বাসে শালবন হলো তাদের ‘জননীভূমি’ এবং অরণ্যটি ‘বনের রক্ষাকারী দেবী’র আশীর্বাদপুষ্ট। তাদের ঐতিহ্যবাহী নবান্ন ও শস্যোৎসব ‘ওয়ানগালা’ (Wangala) মধুপুর গড়ের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে রাষ্ট্রীয় বননীতি, ভূমি থেকে উচ্ছেদ, বাণিজ্যিক আনারস ও রাবার চাষ (বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম রাবার চাষ শুরু হয় মধুপুর ও চট্টগ্রাম থেকে এবং মধুপুরে বসে দেশের বৃহত্তম পাইকারি আনারসের বাজার) এই প্রাকৃতিক শালবন ও মান্দিদের জীবনধারাকে চরম সংকটে ফেলেছে।


মধুপুরের চুনিয়া গ্রামের প্রবাদপ্রতিম মান্দি দার্শনিক ও নেতা জনিক নকরেক (যিনি দেড়শ বছর পরমায়ু লাভ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে) ১৯৬২ সালেই ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলেন-"আমরা মধুপুর গড়ের আদিবাসী জনগণ"। ২০০০-এর দশকের শুরুতে বন বিভাগ মধুপুর জাতীয় উদ্যানে প্রাচীর দিয়ে ‘ইকোপার্ক’ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করলে ভূমি ও জীবনচক্র হারানোর আতঙ্কে মান্দি ও কোচ জনগোষ্ঠী তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি ইকোপার্ক বিরোধী মিছিলে বনরক্ষীদের গুলিতে ২৮ বছর বয়সী গারো যুবক পিরেন স্নাল ঘটনাস্থলেই শহীদ হন এবং গিতিদা রেমাসহ বহু আদিবাসী নারী-পুরুষ আহত হন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে আদিবাসী নেতা চলেশ রিচিল নিহত হন। পিরেন স্নাল ও চলেশ রিচিলের আত্মত্যাগ আজ মধুপুর গড়ের মান্দি লোকগাথায় ভূমি ও অরণ্য রক্ষার আধুনিক কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে।


গহীন অরণ্যের বন্যপ্রাণী, ডাকাত ও বিদ্রোহীদের লোকগাথা

আজকের ক্ষয়িষ্ণু মধুপুর বন দেখে দেড়শ-দুইশ বছর আগের মধুপুর জঙ্গলের ভয়ংকর ও রোমাঞ্চকর রূপ কল্পনা করা কঠিন। সপ্তদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক দলিল (যেমন-১৬৫০ সালে ময়মনসিংহের সাহাদের রেকর্ড, ১৮৬৮ সালে রেনল্ডস, ১৮৭৫ সালে ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার এবং ১৯১৭ সালে এফ. এ. সাকসের ময়মনসিংহ জেলা গেজেটিয়ার) থেকে জানা যায়, মধুপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জঙ্গলে কেবল বাঘ, চিতাবাঘ, ভালুক, বন্য শূকর, হাতি বা অজগরই ছিল না, বরং সেখানে বিচরণ করত প্রাগৈতিহাসিক একশৃঙ্গ গন্ডার (One-horned Rhinoceros)। বর্তমান মধুপুর জাতীয় উদ্যানেও ১৭৬ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ১৯০ প্রজাতির প্রাণী (যার মধ্যে হরিণ প্রজনন কেন্দ্র, বানর, হনুমান, মেছোবাঘ, বনরুই, শিয়াল ও গেছো ব্যাঙ অন্যতম) টিকে আছে।


ব্রিটিশ আমলে ভাওয়াল ও মধুপুর গড়ের মধ্যবর্তী ভালুকা ও সখীপুর অঞ্চলটি এতই দুর্গম ও যোগাযোগবিহীন ছিল যে, শহরে যেতে হলে ৫০ থেকে ৬০ মাইল লাল মাটির পাহাড়ি বন পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হতো। বন্যপ্রাণী, রোগব্যাধি ও ডাকাতের ভয়ে সরকারি কর্মকর্তারা এই অঞ্চলকে ‘শাস্তিযোগ্য এলাকা’ (Punishment Posting) হিসেবে গণ্য করতেন এবং এখানে না আসার জন্য তদবির করাতেন। এই দুর্গমতার সুযোগেই মধুপুর জঙ্গল হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহী ও ডাকাতদের অভয়ারণ্য, যেখানে ডাকাত তাড়াতে পুলিশকে বছরের পর বছর জঙ্গল পাহারা দিতে হতো। ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী যাদেরকে ‘আইনহীন ডাকাত’ (Lawless bandits) বা এফ. এ. সাকসের ভাষায় ‘হিন্দুস্তানের যাযাবর’ (Gypsies of Hindustan) বলে নথিপত্রভুক্ত করেছে, গ্রামীণ জনমানসের লোকগাথা, জারিগান ও পালাগানে তারাই চিত্রিত হয়েছেন ব্রিটিশ ও জমিদারবিরোধী অকুতোভয় যোদ্ধা হিসেবে। পাশাপাশি দীনেশচন্দ্র সেন সংকলিত এবং কেদারনাথ মজুমদারের প্রচেষ্টায় সমৃদ্ধ ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’-র মহুয়া, মলুয়া, চন্দ্রাবতী, দেওয়ানা মদিনা এবং ঈসা খাঁ ও সখিনা-সোনাভানের বীরত্বগাথা মধুপুর গড় ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের অরণ্য-নদীবেষ্টিত সমাজের নারীর স্বাধীনচেতা মনোভাব, প্রেম ও ট্র্যাজেডিকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে অমর করে রেখেছে।


উপসংহার ও সমন্বিত পর্যবেক্ষণ

মধুপুর গড়ের উৎপত্তি, ভূতাত্ত্বিক গঠন, প্রাচীন ইতিহাস এবং লোকঐতিহ্যের সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, এই অঞ্চলের ভৌত ভূগোল এবং মানবিক সংস্কৃতি একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্য কার্যকারণ সূত্রে আবদ্ধ। প্লাইস্টোসিন যুগে গঠিত এবং টেকটোনিক প্রক্রিয়ায় উত্থিত এই লাল মাটির হর্স্ট ব্লকটি একদিকে যেমন ১৭৮২–১৭৮৭ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন করিয়ে বাংলার নদী-ভূগোলকে চিরতরে বদলে দিয়েছে, অন্যদিকে এর বন্যা-মুক্ত উঁচু ‘চালা’ ভূমি আড়াই হাজার বছর পূর্বে উয়ারী-বটেশ্বরের মতো প্রাচীন নগর সভ্যতা এবং সপ্তম শতাব্দীর বৌদ্ধ পদ্মমন্দির ও দশম শতাব্দীর পাল রাজাদের আশ্রয় দিয়েছে। একইভাবে, মধুপুর কর্দম স্তরের নিম্ন প্রবেশ্যতা ও শুষ্ক মৌসুমের জলসংকটই প্রজাদের তৃষ্ণা নিবারণে সাগরদিঘীর রানির আত্মবিসর্জনের মতো কালজয়ী কিংবদন্তীর জন্ম দিয়েছে। আজ যখন অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড়, পোল্ট্রি লেয়ারের বর্জ্যে সাগরদিঘীর মতো ঐতিহাসিক জলাশয়গুলোর দূষণ এবং মধুপুর চ্যুতি রেখার ভূমিকম্পন ঝুঁকি এই প্রাচীন বাস্তুতন্ত্র ও মান্দি আদিবাসীদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে, তখন মধুপুর গড়কে কেবল একটি ভূমিখণ্ড হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা অপরিহার্য।


তথ্যসূত্র (References)

১. ভূ-তত্ত্ব, মধুপুর গড় ও ব্রহ্মপুত্র নদের বিবর্তন (Geology & River Morphology)


  1. Tectonics of Madhupur Tract, and its Influence on the Cenozoic Sediments and Jamuna River Avulsion – https://www.researchgate.net/publication/349494257_Tectonics_of_Madhupur_Tract_and_its_Influence_on_the_Cenozoic_Sediments_and_Jamuna_River_Avulsion


  2. A Review on the Quaternary Characteristics of Pleistocene Tracts of Bangladesh – https://www.researchgate.net/publication/32199138_A_Review_on_the_Quaternary_Characteristics_of_Pleistocene_Tracts_of_Bangladesh


  3. Remote Sensing and GIS-Based Evaluation of Morphometric Parameters of Madhupur Tract Basin – https://www.researchgate.net/publication/389111901_Remote_Sensing_and_GIS-Based_Evaluation_of_Morphometric_Parameters_of_Madhupur_Tract_Basin


  4. Using River Restoration Model to Control Riverbank Erosion in the Old Brahmaputra River of Bengal Basin, Bangladesh – https://www.researchgate.net/publication/375966250_Using_River_Restoration_Model_to_Control_Riverbank_Erosion_in_the_Old_Brahmaputra_River_of_Bengal_Basin_Bangladesh


  5. Old Brahmaputra River - Banglapedia – https://en.banglapedia.org/index.php/Old_Brahmaputra_River


  6. মধুপুর চ্যুতি - উইকিপিডিয়া – https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AE%E0%A6%A7%E0%A7%81%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%B0_%E0%A6%9A%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A4%E0%A6%BF


২. প্রাচীন ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও ঐতিহাসিক মানচিত্র (History, Archaeology & Cartography) 7. Mymensingh District Gazetteers (F. A. Sachse, 1917) – https://ia801403.us.archive.org/21/items/in.ernet.dli.2015.39434/2015.39434.Mymensingh-District-Gazetteers_text.pdf 8. ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ (কেদারনাথ মজুমদার) – https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/5/5f/%E0%A6%AE%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A6%B9%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8_%E0%A6%93_%E0%A6%AE%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%82%E0%A6%B9%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A6%A3.pdf 9. The Journals of Major James Rennell, First Surveyor-General of India – https://archive.org/download/journalsofmajorj00renn/journalsofmajorj00renn.pdf 10. The Burrampooter, From the head of the Luckia or Banner River (James Rennell's Map) – https://www.davidrumsey.com/luna/servlet/detail/RUMSEY~8~1~367837~90135096:The-Burrampooter,-From-the-head-of- 11. Possibilities of Using Remote Sensing in Archaeological Research – https://juniperpublishers.com/gjaa/GJAA.MS.ID.555720.php 12. ব্রহ্মপুত্র, জাপোনিকা ধান ও পূর্ববঙ্গীয় জনপদের পুনঃপাঠ - বণিক বার্তা – https://www.bonikbarta.com/silk-route/324/vHBroZ8m1Idlq9Qn 13. বৌদ্ধ পদ্মমন্দিরের গর্ভগৃহ ও ইটের স্থাপত্য আবিষ্কার - কিশোরগঞ্জ ডট কম – https://www.kishorgonj.com/%E0%A6%AC%E0%A7%8C%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A6-%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%97%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AD%E0%A6%97/ 14. ঘাটাইলে পাল যুগের খননকৃত সাগরদিঘী ও প্রাচীন নিদর্শন – https://theekusheybarta.com/%E0%A6%98%E0%A6%BE%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B2-%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%96%E0%A6%A8%E0%A6%A8%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A6%A4/ 15. গুপ্ত বৃন্দাবন (প্রাচীন স্থাপত্য ও ইতিহাস) - উইকিপিডিয়া – https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%A4_%E0%A6%AC%E0%A7%83%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A8


৩. মধুপুর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জনজাতি, বন ও ঐতিহাসিক পটভূমি (Ethnography & Regional Context) 16. Report on the Boundary Demarcation of the Garo Hills in Mymensingh District (1920) – https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/5/55/Report_on_the_Boundary_Demarcation_of_the_Garo_Hills_in_Mymensingh_District_%281920%29.pdf 17. Land, Life, and Emotional Landscapes at the Margins of Bangladesh (Amsterdam University Press) – https://www.econstor.eu/bitstream/10419/281239/1/Amsterdam-University-Press_9789463721752.pdf 18. Deconstructing Colonial Myths of Movement and Migration in the Garo Hills – https://rupkatha.com/V12/n2/v12n204.pdf 19. প্রাচীন আটিয়া মহকুমা থেকে আজকের টাঙ্গাইল - দৈনিক ইত্তেফাক – https://www.ittefaq.com.bd/496706/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%9A%E0%A7%80%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A6%AE%E0%A6%BE-%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%9C%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%B2 20. মধুপুর উপজেলা ও ধনবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্য (সরকারি পোর্টাল) – https://dhanbari.tangail.gov.bd/pages/static-pages/6995b33935ce18e1c0797558